দুনিয়ার অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে ফলমূল এমন নিয়ামত, যা মানুষের জীবনকে আনন্দময়, স্নিগ্ধ ও সুন্দর করে তোলে। এসব ফলমূল দুনিয়ার সুখভোগ, আখিরাতের নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আমি আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তা পৃথিবীতে সংরক্ষণ করি। আর আমি চাইলে তা অপসারণ করতেও অবশ্যই সক্ষম। তারপর সেই পানির মাধ্যমে আমি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙুরের বাগান। সেখানে তোমাদের জন্য আছে প্রচুর ফল-ফলাদি, যা থেকে তোমরা আহার করো। আর সৃষ্টি করি সিনাই পর্বত থেকে উৎপন্ন এক বৃক্ষ, যা তেল ও ভোজনকারীদের জন্য তরকারিস্বরূপ উপাদান উৎপন্ন করে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১৮-২০)
দুনিয়ায় নানা স্বাদ, রং ও আকৃতির ফল দেখা যায়। শুধু এগুলোর দিকে তাকালেই মন মুগ্ধ হয়ে যায়। লাল, গোলাপি, সবুজ, গাঢ় লাল, হলুদ কিংবা হালকা গোলাপি! কত বিচিত্র রঙের সমাহার! অথচ আকাশের বৃষ্টি একই, মাটি একই, পানিও একই; কিন্তু সেই একই উপাদান থেকে উৎপন্ন ফলের রূপ, রং ও স্বাদ কতই না বৈচিত্র্যময়!
অনেক সময় গাছের পাতা ও বাহ্যিক আকৃতি এক রকম হলেও তাদের ফলের আকৃতি, স্বাদ, প্রকৃতি, রং ও সুগন্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। আবার কখনো ফলের আকৃতি প্রায় একই হলেও কারো স্বাদ মিষ্টি, কারো টক, আবার কারো তিক্ত।
কিছু ফল কাঁটায় ঘেরা থাকে, অথচ তার ভেতরের স্বাদ হয় অপূর্ব মধুর। প্রতিটি ফলেরই একটি আবরণ রয়েছে, যা তার রস, সতেজতা ও কোমলতা রক্ষা করে।
একই নামের ফলও কখনো ডিম্বাকার, কখনো গোলাকার হয়। আবার একই ফলের রংও ভিন্ন হতে পারে। কিছু ফল গাছের অনেক উঁচুতে ধরে, যা সংগ্রহ করতে কষ্ট হয়; আবার কিছু ফল এত নিচুতে থাকে যে সহজেই তুলে নেওয়া যায়।
কিছু ফল গাছে ধরে, কিছু লতায়, কিছু মাটির ওপর জন্মায়, আবার কিছু মাটির নিচে। কোথাও ফল গুচ্ছাকারে জন্মায়, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিছু ফল ভারী, কিছু হালকা। কিছু ফল তাজা খাওয়া হয়, আবার শুকিয়েও খাওয়া হয়।
কিছু ফল শুধু মরুভূমিতে জন্মায়, কিছু শুধু শীতপ্রধান দেশে, আবার কিছু শুধুই উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে। বছরের প্রতিটি ঋতুতেই নির্দিষ্ট কিছু ফল জন্মায়, যা অন্য সময় পাওয়া যায় না। কিছু ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, আবার কিছু খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ও আমাদের গবাদি পশুর জন্য ভোগের উপকরণ। যেমন—মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ও তোমাদের গবাদি পশুর উপভোগের জন্য।’
(সুরা : আন-নাজিআত, আয়াত : ৩৩)
আল্লাহর এই অপার নিয়ামতের গভীরতা উপলব্ধি করতে তাঁর এই বাণী নিয়ে চিন্তা করুন : ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। অতঃপর তার মাধ্যমে আমি সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি। সেখান থেকে সবুজ অঙ্কুর বের করেছি, যার থেকে স্তরে স্তরে শস্যদানা উৎপন্ন হয়। আর খেজুরগাছের মোচা থেকে ঝুলে থাকে নিকটবর্তী গুচ্ছ। আরো আছে আঙুরের বাগান, জলপাই ও ডালিম—যাদের কিছু একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, আবার কিছু ভিন্ন। তোমরা লক্ষ করো তাদের ফলের দিকে, যখন তা ধরে এবং যখন তা পরিপক্ব হয়। নিশ্চয়ই এতে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৯৯)
আরো এক জায়গায় আল্লাহ বলেন : ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মাচায় ওঠানো বাগান এবং মাচাবিহীন বাগান, খেজুরগাছ, বিভিন্ন স্বাদের শস্য, জলপাই ও ডালিম, যাদের কিছু একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, আবার কিছু ভিন্ন। যখন এগুলো ফল দেয় তখন তা থেকে খাও এবং ফসল কাটার দিন তার হক আদায় করো। আর অপচয় করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ১৪১)
দুনিয়ার ফলের সঙ্গে জান্নাতের ফলের তুলনা
জান্নাতের ফল কখনো মৌসুমের অপেক্ষায় থাকবে না। যখনই কেউ চাইবে, তখনই তা উপস্থিত হবে।
আল্লাহ বলেন, ‘এবং তারা নিজেদের পছন্দমতো ফল বেছে নেবে।’ (সুরা : আল-ওয়াকিয়াহ, আয়াত : ২০)
জান্নাতের ফল চিরস্থায়ী, অবিরাম এবং অফুরন্ত। কখনো ফুরিয়ে যাবে না, কখনো নিষিদ্ধও হবে না।
জান্নাতবাসীরা কখনো ফলের অভাব, শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করবে না। তারা যখনই যা ইচ্ছা করবে, সেই ফল তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জান্নাতের সেই চিরস্থায়ী নিয়ামত ও অফুরন্ত ফলের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।