ইসলামী ধর্ম বিশ্বাসে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বের নাম খিজির (আ.)। মুসলমানদের ভেতর যাঁর পরিচয়, অবস্থান ও জীবনকাল নিয়ে নানা বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও কৌতূহলের যেন শেষ নেই। যেমন—খিজির (আ.) কে ছিলেন? তিনি নবী না ওলি? তিনি কি এখনো জীবিত আছেন? জীবিত থাকলে তিনি কোথায় থাকেন? অনেক বুজুর্গ ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি করেন, এসব দাবি সত্য? তিনি কেন আত্মপ্রকাশে আসেন না, যেন মানুষ তাঁর জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে পারে? কোরআন ও হাদিসের আলোকে এসব প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো—
বিশুদ্ধ মত হলো খিজির (আ.) কোনো নবী ছিলেন না, তিনি আল্লাহর একজন নেককার বান্দা বা ওলি ছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর এই নেক বান্দার বর্ণনা এসেছে। সুরা কাহফের বর্ণনা অনুসারে আল্লাহ খিজির (আ.)-কে বিশেষ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও দূরদর্শিতার কারণে এমন অনেক জিনিস অনুধান করতেন পারতেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য সাধ্যাতীত। আল্লাহর নবী মুসা (আ.) জ্ঞান আহরণের জন্য খিজির (আ.)-এর সঙ্গী হন। কিন্তু তিনি শর্তানুসারে ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি। ফলে তাঁরা উভয়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। (বিস্তারিত দেখুন : সুরা কাহফ, আয়াত ৬৫-৭৮)
খিজির (আ.)-এর ব্যাপারে একটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো তিনি এখনো জীবিত আছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবেন। তাঁর ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের ঘটনাও প্রচলিত আছে। যেমন—তাঁর সঙ্গে অমুক ব্যক্তির সাক্ষাৎ হয়েছে, তিনি অমুক ব্যক্তিকে খিরকা প্রদান করেছেন, তিনি অমুককে বর দিয়েছেন ইত্যাদি। এসব দাবির পক্ষে কোরআন-হাদিস তো দূরের কথা, গ্রহণযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক সূত্রও পাওয়া যায় না। উম্মতের মুহাক্কিক (গবেষক ও অনুসন্ধানী) আলেমরা একমত খিজির (আ.) জীবিত নেই। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) তাঁর ‘আল মানারুল মুনিফ ফিল হাদিসিস সহিহ ওয়াদ-দয়িফ’ বইয়ে ভিত্তিহীন হাদিসের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি জাল হাদিসের পরিচয় অংশে বলেছেন, যেসব হাদিসে খিজির (আ.)-এর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তার সব মিথ্যা ও বানোয়াট। তাঁর জীবিত থাকার ব্যাপারে একটিও বিশুদ্ধ হাদিস নেই। তেমনি একটি বানোয়াট হাদিস হলো ‘একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তাঁর পেছনে কথার শব্দ শুনলেন। মানুষ তাকিয়ে দেখলেন তিনি খিজির (আ.)।’
ইবরাহিম হারবি (রহ.)-কে খিজির (আ.)-এর জীবিত থাকার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল—তিনি কি এখনো আছেন? তিনি বলেন, মানুষের ভেতর এই বিশ্বাস শয়তানই ছড়িয়েছে। ইমাম বুখারি (রহ.)-কে খিজির ও ইলিয়াস (আ.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁরা দুজন কি জীবিত? তিনি বলেন, সেটা কিভাবে সম্ভব? অথচ নবী (সা.) বলেছেন, ‘এক শ বছর পর এখন যারা পৃথিবীতে আছে তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকে না।’
(বুখারি ও মুসলিম)
অসংখ্য আলেম খিজির (আ.)-এর ব্যাপারে একই উত্তর দিয়েছেন। তাঁরা দলিল হিসেবে কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পেশ করেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তোমার আগেও কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। তুমি মারা গেলে তারা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে?’
(সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৩৪)
আর এটা যখন প্রমাণিত হলো খিজির (আ.) জীবিত নেই, তাই তাঁর অবস্থানস্থল, কাজগুলো ও আত্মপ্রকাশ বিষয়ক প্রশ্নও অর্থহীন। তবে এটা সত্য যে আল্লাহ খিজির (আ.)-কে প্রভূত জ্ঞান দান করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর তারা সাক্ষাৎ পেল আমার বান্দাদের মধ্যে একজনের, যাকে আমি আমার কাছ থেকে অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং আমার কাছ থেকে শিক্ষা দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৬৫)
আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।