প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। বরাবরের মতোই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাজেটের তীব্র সমালোচনা করছে। সরকারি দল বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে বলেছে, এই বাজেট বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাজেটের লক্ষ্যপূরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির মূল সুবিধাগুলো সীমিত কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী মহলের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। ফলে সমাজের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও উন্নয়নের মূলধারার বাইরে থেকে গেছে। বর্তমান সরকার সেই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমরা অর্থনীতিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেড় দশকের বেশি সংগ্রামের পর সবার একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছি। সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা অনেক। সেসবের প্রতিফলন ঘটাতে আমরা চেষ্টা করেছি সবার সঙ্গে কথা বলতে ও মতামত নিতে।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কম্পানিকে (বাপেক্স) আরো সক্রিয় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাপেক্সের সফলতার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়াতে আরো পাঁচটি রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির মতে, বাজেটের দর্শন ও নীতিগত উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও এর অধিকাংশ লক্ষ্য এমন একটি অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট প্রাক্কলনের ভিত্তিটাই ঠিক না। বাজেটে প্রবৃদ্ধি, সম্পদ আহরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ, রপ্তানি ও আমদানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ভিত্তি হিসেবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এমন একটি চিত্র ধরা হয়েছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। বাজেটে শিল্পায়ন, আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প সুরক্ষা, রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শুধু কর-শুল্ক সুবিধা দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, আইন-শৃঙ্খলা ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসবে না।’
অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ থাকলেও আগামী অর্থবছরে তা ৯.৪ শতাংশ হবে বলে বাজেটে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে তা করতে হবে। আমরা আশা করি, বাজেট বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে।

