‘ঢাকা প্রকাশ’ ঢাকার প্রথম বাংলা সংবাদপত্র। ঢাকার ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীদের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হলেও মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটির চরিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে। আর এ কারণেই বোধ হয় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকা পত্রিকাও ছিল এই ‘ঢাকা প্রকাশ’ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশে ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর মতো এত দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে আর কোন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। উনিশ শতকের ষাট দশকে প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকাটি টিকে ছিল প্রায় একশো বছর—এ শতকের ষাট দশক পর্যন্ত। এ ছাড়া গ্রাহক সংখ্যাকে যদি আমরা জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হিসেবে ধরি তা’হলেও দেখব ‘ঢাকা প্রকাশ’ ছিল ঐ সময়ের একটি জনপ্রিয় সংবাদপত্র। পত্রিকা প্রকাশের পরে এর প্রচার সংখ্যা ছিল আড়াইশো এবং নব্বই দশকে হিন্দু পুনরুত্থানবাদীদের আন্দোলনের সময় এর প্রচার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল পাঁচ হাজারে। সরকারও গুরুত্ব দিতেন ‘ঢাকা প্রকাশ’-কে। উনিশ শতকে ‘রিপোর্ট অন নেটিভ পেপার্স’-এ, পূর্ববঙ্গের পত্র-পত্রিকার মধ্যে প্রায় ক্ষেত্রেই ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সংবাদ বা মতামত সংকলিত হতো। ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সঙ্গে জড়িত ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’-এর নাম। ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ ছিল ঢাকার প্রথম বাংলা মুদ্রণ যন্ত্র। বস্তুত এ মুদ্রণ যন্ত্রটি ঢাকার চিন্তারাজ্যে বিপ্লবের সূচনা করেছিল। কারণ, ‘বাঙ্গালা’ যন্ত্র থেকে শুধু ‘ঢাকা প্রকাশ’ই নয়, অন্যান্য বইপত্রও মুদ্রিত হতে থাকে এবং এতে উৎসাহিত হয়ে কয়েক বছরের মধ্যে আরো কয়েকজন ঢাকায় স্থাপন করেছিলেন মুদ্রণ যন্ত্র। শুরু করেছিলেন পত্র-পত্রিকার প্রকাশ। ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কে বা কারা? এ সম্পর্কে আমরা যা জানতে পারি তা হলো—‘ঢাকা জিলার সদর উপরিভাগান্তর্গত তেতুলঝোড়া গ্রামবাসী স্বনামখ্যাত ডিপুটী ম্যাজিস্ট্রেট বাবু ব্রজসুন্দর মিত্র, ধামরাই গ্রামবাসী বিদ্যালয়সমূহের ডিপুটী ইন্সপেক্টর ও পরবর্তী ডিপুটী ম্যাজিস্ট্রেট বাবু দীনবন্ধু মৌলিক, এবং বিক্রমপুরান্তর্গত রাঢ়িখাল গ্রামবাসী বিজ্ঞানাচার্য্য স্যার জগদীশচন্দ্রের পিতা ডিপুটী ম্যাজিস্ট্রেট বাবু ভগবানচন্দ্র বসু ও তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র বসু, মালখা নগরবাসী ডিপুটী ম্যাজিস্ট্রেট বাবু রামকুমার বসু প্রমুখ-এর ‘উদ্যোগ ও যন্ত্রের ফলেই বিগত ১২৬৬ সনে ইং ১৮৬৯ খৃস্টাব্দে তৎকালে প্রচলিত একটী মুদ্রণ যন্ত্র (চিলা প্রেস) ও অক্ষরাদি আনীত হইয়া ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ নামে ঢাকা নগরীর বাবুর বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়।’ উপর্যুক্ত সবাই ছিলেন ব্রাহ্মমতে বিশ্বাসী। নিজেদের মতামত বা বিশ্বাস প্রচারের কারণে হয়ত তারা ভেবেছিলেন নিয়মিত কিছু প্রকাশ করার। ‘১২৬৭ সনের শেষার্ধে নীলকরের অত্যাচার সম্বন্ধে পরিচালক ও পৃষ্ঠপোষকগণের মধ্যে মতভেদ হওয়াতে ‘মাসিক মনোরঞ্জিকা’ উঠিয়া যায় এবং ‘উহার পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালকগণ একখানি সাপ্তাহিকপত্র প্রকাশ কৃতসঙ্কল্প হন এবং তাহারই ফলে বিগত ১২৬৭ সালের ২৪শে ফাল্গুন বৃহস্পতিবার ‘ঢাকা প্রকাশ’ জন্ম গ্রহণ করে।’ ‘ঢাকা প্রকাশ’ প্রকাশনার ব্যাপারে পরিচালকের যে ব্রাহ্মমত প্রকাশের ব্যাপারটি উৎসাহিত করেছিল এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। প্রথম কয়েক বছরের ‘ঢাকা প্রকাশ’ দেখলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর এ ভূমিকার বিরোধিতা করার জন্য গোঁড়া হিন্দুরাও পত্রিকা প্রকাশে বাধ্য হয়েছিলেন। এ ছাড়া, কলকাতার ‘সোম প্রকাশ’ও প্রভাবিত করেছিল পরিচালকদের। ‘ঢাকা প্রকাশ’ নামকরণ থেকে এর পরিচালনা, রচনা পদ্ধতিতেও এ প্রভাব স্পষ্ট। প্রথমে, ‘ঢাকা প্রকাশ’ প্রতি সপ্তাহে ‘গুরু বারে’ অর্থাৎ বৃহস্পতিবারে প্রকাশিত হতো। সাপ্তাহিকটির প্রথম পৃষ্ঠার ওপরে—‘ঢাকা প্রকাশ’ এবং তার নিচে ছোট টাইপে লেখা থাকতো ‘সাপ্তাহিক’ শব্দটি। প্রথম বছর পত্রিকা রয়েল আকারে দু’ফর্মা বা আট পৃষ্ঠার ছিল। ডাক মাশুল সমেত বার্ষিক মূল্য পাঁচ টাকা। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার বাঁ দিকে থাকতো বিজ্ঞাপন। ডান দিকে মাঝে মাঝে থাকতো সম্পাদকীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কোন খবর বা বিশেষ কোন বিষয়ের ওপর পত্রিকার নিজস্ব মতামত। এরপর ছিল ‘সম্বাদাবলী’ [বা সংবাদাবলী]। এই বিভাগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে বা নিজেদের সংগৃহীত সংবাদ ছাপা হতো। এ ছাড়া নিয়মিত ছাপা হতো চিঠিপত্র। সমকালীন সামাজিক ইতিহাসের জন্য এই বিভাগটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর পরিচালকগণের মধ্যে ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ঈশ্বরচন্দ্র বসু, চন্দ্রকান্ত বসু প্রমুখ। এবং সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। সেই থেকে ঢাকা প্রকাশের সম্পাদক/মালিকানা অনেকবার বদল হয়েছে কিন্তু এর প্রকাশ ছিল অব্যাহত এবং কালক্রমে পূর্ববঙ্গে প্রধান পত্রিকা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল ‘ঢাকা প্রকাশ’। তবে, প্রথমদিকে, বিদ্যালয়সমূহের ডিপুটী ইন্সপেক্টর দীনবন্ধু মৌলিক মহাশয়ের পদোচিত প্রতিষ্ঠার বলেই যে তখন ঢাকা প্রকাশের সমধিক প্রচার সম্ভব হইয়াছিল এরূপ অনুমান একেবারে অসঙ্গত নহে।’ উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের পত্রিকায় প্রায় ক্ষেত্রেই সম্পাদকের নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হতো না। ফলে, কখন কে পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তা নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর বেলায়ও সে কথা প্রযোজ্য। তবে পূর্ণচন্দ্রের প্রবন্ধের সাহায্যে আমরা ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সম্পাদকদের নাম জানতে পারি। যেমন, প্রথম সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কথাই ধরা যাক। পত্রিকার চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত পত্রিকায় তাঁর নামই দেখা যায়। কিন্তু ব্রজেন্দ্রনাথ লিখেছেন—“সম্পাদকের দায়িত্ব মজুমদার মহাশয়ের উপর ছিলনা। ‘ঢাকা প্রকাশের’ চতুর্থ বৎসর ২২ সংখ্যা পর্যন্ত তাঁহার নাম ‘প্রকাশক’ রূপেই পাওয়া যায়। যিনি সম্পাদক ছিলেন তিনি ‘ঢাকা প্রকাশের’ দ্বিতীয় বর্ষের শেষাশেষি কর্ম্মচ্যূত হন।” ‘সোম প্রকাশ’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু আবার এও দেখা গেছে পত্রিকা হেড কম্পোজিটরের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হচ্ছে। তবে, অন্যান্য সূত্র অনুযায়ী, প্রথম চার বছর কৃষ্ণচন্দ্রই ছিলেন সম্পাদক। চতুর্থ বছরে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ঢাকার আরেকটি সংবাদপত্র ‘বিজ্ঞাপনী’তে পঞ্চাশ টাকা বেতনে। কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের পর ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সম্পাদক হয়েছিলেন দীননাথ সেন। খ্যাতির মধ্যগগনে তখনও তিনি পৌঁছান নি বটে, কিন্তু একজন ব্রাহ্মকর্মী হিসেবে ঢাকা শহরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বেশ প্রভাবশালী। চতুর্থ বর্ষের ২৩ থেকে ৩৬ সংখ্যা পর্যন্ত তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। তাঁর সময় ‘ঢাকা প্রকাশ’ বৃহস্পতিবারের বদলে শুক্রবারে প্রকাশিত হতে থাকে এবং পঞ্চম বর্ষ থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে রোববার থেকে। দীননাথের পর ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেছিলেন ঢাকার আরেকজন ব্রাহ্মকর্মী গোবিন্দ প্রসাদ রায় [মাঝখানে জগন্নাথ অগ্নিহোত্রীর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়েছিলো পত্রিকা]। পত্রিকার মালিকানাও হাতবদল হয়েছিলো তখন। গোবিন্দ প্রসাদ প্রথমে ছিলেন ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর বেতনভোগী কর্মচারী। পত্রিকা পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করলে তিনিই এর স্বত্ব কিনে নিয়েছিলেন। [খুব সম্ভব বাঙ্গালা যন্ত্রসহ] মহারাণী ভিক্টোরিয়া যখন ‘ভারতেশ্বরী’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন তখন এ উপলক্ষে দিল্লীতে যে দরবার [উৎসব] হয়েছিলো তাতে পূর্ববঙ্গের একমাত্র পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। কিছুদিন পত্রিকা চালাবার পর গোবিন্দ প্রসাদ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং তখন পত্রিকার সম্পাদনা ভার গ্রহণ করেছিলেন ঢাকা ব্রাহ্ম বিদ্যালয়ের শিক্ষক অনাথ বন্ধু মৌলিক। দু’বছর সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। তারপর গোবিন্দ প্রসাদ সুস্থ হয়ে আবার সম্পাদনা ভার গ্রহণ করেছিলেন এবং সহকারী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন পণ্ডিত বৈকুণ্ঠচন্দ্র নাথকে। ১২৮৯ সনে গোবিন্দ প্রসাদের মৃত্যু হলে, ‘ঢাকা প্রকাশ’ ও ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তাঁর জামাতা যাদবচন্দ্র সেন। দু’বছর চালিয়েছিলেন তিনি পত্রিকা। কিন্তু প্রতিযোগিতায় না পেরে তিনি “মানিকগঞ্জের অধীনে চারিপাড়া গ্রামবাসী তালুকদার বাবু গুরুগঙ্গা আইচ চৌধুরীর” কাছে প্রেস ও ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর স্বত্ব বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ১২৯১ সালে তিন হাজার চারশ পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে গুরুগঙ্গা ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ ও ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর স্বত্ব ক্রয় করেছিলেন। ১২৯২ সনের পূজার পর তিনি পঞ্চাশ টাকা বেতনে পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করেছিলেন পূর্ববঙ্গের তৎকালীন খ্যাতনামা কবি দিনেশচরণ বসুকে। এ সময় পত্রিকার কার্য্যালয় স্থানান্তরিত হয়েছিলো বাবু বাজার থেকে ইসলামপুরে ১৬ নং বাড়িতে। তবে, দিনেশচরণ সম্পাদক ছিলেন মাত্র দু’মাস। এরপর ব্যক্তিগত কারণে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন এবং তখন স্বয়ং গুরুগঙ্গা নিজে ভার গ্রহণ করেছিলেন পত্রিকার। এবং এ সময়ই বদল ঘটে পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গীর। কারণ গুরুগঙ্গা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। ১২৯৩ সনের আষাঢ় মাসে তিনি ঘোষণা করেছিলেন— “এইভাবে কার্য্যারম্ভ করার পর যাদব ও বৈকুণ্ঠ প্রভৃতি সুবুদ্ধিগণ আমার দুর্নাম রটাইয়া ঢাকা প্রকাশের হিতৈষী দলকে শত্রু করিয়া তুলিলেন। বৈকুণ্ঠবাবু শশীবাবুর সাহায্যে ঢাকা গেজেটের সৃষ্টি করিয়া ঢাকা প্রকাশের সমস্ত গ্রাহককে প্রায় বিনামূল্যে যোগাইতে ও তাহাতে আমাকে অশিক্ষিত বলিয়া ঘোষণা করিতে লাগিলেন। ঢাকা প্রকাশের বিরুদ্ধে যেরূপ ষড়যন্ত্র হইয়াছিল, মানুষের ক্ষমতার সেরূপ ষড়যন্ত্র হইতে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু ঢাকা প্রকাশ দ্বারা বিশেষ কার্য্য সাধনের জন্যই যেন স্বয়ং বিধাতা আমা দ্বারা এই দুঃসময়ে ঢাকা প্রকাশকে রক্ষা করিয়াছিলেন।” চৈত্র ১২৯১ থেকে জ্যৈষ্ঠ ১৩০৮—এ ষোল বছর ঢাকা প্রকাশ সম্পাদনা করেছিলেন গুরুগঙ্গা আইচ। শেষের দিকে, ঢাকা প্রকাশের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করেছিলেন ঢাকা পৌরসভার সচিব সার্কিস, ঢাকা শহরের প্রভাবশালী নাগরিক রূপলাল সাহা ও ‘শাহিন মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী’। গুরুগঙ্গা প্রথম দুটি মামলা আপোষে মিটিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষটি মেটাতে পারেন নি এবং সে মামলায় তাঁর এক মাসের জেল হয়েছিলো। এসব ও আর্থিক কারণে ১৩০৮ সালে তিনি পত্রিকার স্বত্ব বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ১৩০৮ সালের আষাঢ় মাসে “বিক্রমপুরের ব্রাহ্মণ খাঁ নিবাসী শ্রীযুক্ত মুকুন্দ বিহারী চক্রবর্তী বি.এ. এবং স্বাধীন ত্রিপুরার পরলোক প্রস্থিত মহারাজ নীরদচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রণা সচিব বাবু রাধারমণ ঘোষ বি.এ.” ঢাকা প্রকাশের স্বত্ব ক্রয় করেছিলেন। পত্রিকার পটভূমিকা হিসেবে পর্ণেন্দু চক্রবর্তী একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। একবার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকার অফিসে গেছেন রাধারমণ। সেখানে কথা প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন—“তুমি যাহাই বল না কেন, যেখান হইতে এই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও পড়িবার যোগ্য একখানি সংবাদপত্র প্রকাশিত হইতে পারে নাই, সেদেশের শিক্ষা-দীক্ষার গৌরব করা যাইতে পারে না।” এ কথায় আহত হয়েছিলেন রাধারমণ। এর পরই তিনি স্বত্ব ক্রয় করেছিলেন পত্রিকার। তাঁদের সময়ও ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর নীতি তেমন পরিবর্ত্তিত হয় নি। ‘ঢাকা প্রকাশ’ পূর্ব্ববৎ সনাতন ধর্ম্মের সেবাতেই নিযুক্ত ছিল এবং “রাজনৈতিক বিষয়ে মধ্যম পন্থাই অনুসরণ করিয়া আসিতেছে। এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্প্রীতি সংস্থাপনে চেষ্টা করিতেছে। এ নিমিত্ত বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের সময় তাঁকে নানাবিধ বিপদের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল।” পত্রিকা কেনার কিছুদিন পর মুকুন্দ বাবুই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজে। ১৩০৯ থেকে পত্রিকার আকার বদলে গিয়েছিলো—ডাবল ক্রাউন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর মুকুন্দ বাবুর সহকারী হিসেবে যারা যুক্ত ছিলেন পত্রিকার সঙ্গে তারা হলেন পণ্ডিত রাজকুমার চক্রবর্তী, পণ্ডিত প্রিয়নাথ বিদ্যাভূষণ, নিশিকান্ত ঘোষ, গিরিজাকান্ত ঘোষ, উমেশচন্দ্র বসু, হরিহর গঙ্গোপাধ্যায়, মধুসূদন চৌধুরী এবং পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে, ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর সর্বশেষ সংখ্যাটির তারিখ ১২.৪.১৯৫৯। সম্পাদক আবদুর রশীদ খান। প্রকাশিত হতো ৫৯/৩ কিতাব মঞ্জিল, ইসলামপুর থেকে। অবশ্য, এর আগে থেকেই পত্রিকাটিতে নিলামের ইস্তেহারই অধিকাংশ জায়গা করে নিয়েছিলো। তাতে মনে হয়, চল্লিশ দশক থেকেই ঢাকা প্রকাশ জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিলো এবং সম্মুখীন হচ্ছিলো প্রতিযোগিতার এবং এ জন্যই পত্রিকাটি পরিণত হয়েছিলো শেষ পর্যায়ে পত্রিকা থেকে নিলাম ইস্তেহারে। লেখক : ইতিহাসবিদ ও লেখক