সুন্দরবনের কোলঘেঁষা প্রাকৃতিক সবুজের লীলাভূমি পিরোজপুর। বলেশ্বর, কালিগঙ্গা, দামোদর, সন্ধ্যা নদী বিধৌত এই জেলার একদিকে মিঠা পানি, অন্যদিকে লবণাক্ত পানির সহাবস্থান। এতটা বৈচিত্র্য নেই অবশ্য ক্রীড়াঙ্গনে। ফুটবল লিগ মাঠেই গড়ায়নি টানা ১৮ বছর! একটা সময় ১০ বছরে ক্রিকেট লিগ হয়েছিল মাত্র একবার। অন্য খেলাগুলোর অবস্থাও ফুটবল আর ক্রিকেটের মতোই। তবে আশার কথা, সম্প্রতি কিছুটা সাফল্য পেয়েছে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গন। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বে এখন গোলাম মাওলা নকিব। ২০০৭ সালে ক্ষমতায় এসে ক্রিকেট লিগ নিয়মিত করছেন তিনি। এমনকি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১৮ বছর পর ফুটবল লিগ আয়োজনেরও। আপাতত ছয়টি ক্লাব নিয়ে প্রথম বিভাগ লিগটা করার পরিকল্পনার কথা জানালেন গোলাম মাওলা নকিব, 'নিজেদের টাকায় ক্লাবগুলোর সব খরচা দিয়ে লিগটা করতে চাই আমরা। এ জন্য বাফুফে থেকেও পেয়েছি কিছু টাকা। কম দল নিয়ে লিগের সমালোচনা হয়তো করবেন অনেকে। তবে আমাদের যুক্তি, একবার খেলাটা মাঠে গড়ালে পরের বার বড় পরিসরেই করা যাবে লিগটা।' ২০০৭ থেকে নিয়মিত ক্রিকেট করার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজন করছে কাবাডি, টেবিল টেনিস ও দাবা। বাংলাদেশের খুদে বিস্ময় ফাহাদ রহমান এই জেলারই হওয়ায় খেলেন স্থানীয় দাবা লিগে। তবে মাত্র কয়েকটা খেলার আড়ালে পিরোজপুরে অন্য খেলাগুলোর চাপা পড়ে যাওয়াটা মানতে পারছেন না কেউই। জেলা ক্রীড়া সংস্থার ১০ বছরের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা আলমের অভিযোগ, 'আমার সময়ে আর যাই হোক বিভিন্ন খেলার প্রশিক্ষণ ও প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি হতো নিয়মিতই। এখন তো এসবের বালাই নেই। তাই পেছাতে পেছাতে একেবারে পেছনের সারিতে আমরা।' জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে লৌহগোলক নিক্ষেপে তিনবার সোনা জেতা আনসার আলী সিকদার কারো নাম না নিয়ে জানালেন, '১৮ বছর আগে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অ্যাডভোকেট এম এ মান্নান। নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে সরে যেতে হয় তাঁকে। এর পরই কপাল পোড়ে পিরোজপুরের ক্রীড়াঙ্গনের। মান্নান সাহেবের সময় নিয়মিতই হতো সব খেলার লিগ। এরপর রাজনীতির লোকেরা ক্রীড়া সংস্থায় আসার পর স্থবির হয়ে পড়ে সব কিছু।' অভিযোগটা মানলেন না বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা নকিব। উল্টো নুরুল হুদা আলমেরই দোষ ধরিয়ে দিলেন তিনি, 'দেখুন আমরা ক্ষমতায় আসার পর অন্তত ক্রিকেটটা তো নিয়মিত করতে পারছি। তা ছাড়া কাবাডি, ভলিবল এমনকি ফুটবলেও বিভাগীয় পর্যায়ে আমাদের সময়ে গর্ব করার মতো অর্জন আছে। খেলা না হলে এই অর্জনগুলো এলো কিভাবে? শ্রদ্ধা নিয়েই নুরুল হুদা ভাইয়ের আমলের একটা কথা তুলে ধরছি। তাঁর ১০ বছরের আমলে ক্রিকেট লিগ হয়েছে মাত্র একবার।' খোঁজ নিয়ে জানা গেল স্থানীয়ভাবে লিগ না হলেও কাবাডি, ফুটবল আর ভলিবলে গত পাঁচ বছরে কিছু সাফল্য পেয়েছে পিরোজপুর। আঞ্চলিক পর্যায়ে ফুটবল আর কাবাডিতে দুবার ও ভলিবলে শিরোপা জিতেছে একবার। অনূর্ধ্ব-১৮ আর প্রমীলা ক্রিকেটের আঞ্চলিক ফাইনালেও গিয়েছিল একবার। ভলিবলে বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাটা আসে ২০১২ সালে। ২০০৯ সালের পর ২০১০ সালেও পিরোজপুর জেলা কাবাডি দল জেতে আঞ্চলিক শিরোপা। ফুটবলের আঞ্চলিক দুটো শিরোপা আসে ২০০৯ ও ২০১৪ সালে। বিভাগীয় কমিশনার গোল্ডকাপ নামের টুর্নামেন্টটার শিরোপা জেতে তারা। তার পরও জেলা ক্রীড়া সংস্থা বা জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে লিগ হয় না কেন? জবাবটা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মাওলা নকিব দিলেন এভাবে, 'পৃষ্ঠপোষকতার অভাব প্রকট এই জেলায়। সংগঠকদের ঢিলেমিও একটা কারণ। তবে সবচেয়ে বড় কারণটা মনে হয় ক্লাবগুলোর অনীহা। এই তিনটি কারণকেই দায়ী করব ফুটবল আর ক্রীড়াঙ্গনের পিছিয়ে যাওয়ার।' দায়টা তাঁর ওপরও পরে কেননা জেলার ক্রীড়াঙ্গনের বড় দুটো পদে আছেন তিনিই। তাই হয়তো পিরোজপুর ক্রিকেট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান ক্রিকেট লিগ চ্যাম্পিয়ন শেরে বাংলা ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি আজমল হুদা নিঝুম টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ তুললেন নকিবের নামে, 'আমার জানামতে, প্রতিটি জেলাই ক্রিকেট লিগের চ্যাম্পিয়নদের ৪০ হাজার টাকা আর রানার্সআপ দলকে দেয় ২০ হাজার টাকা। আমাদের এখানে টাকার বদলে ট্রফি দিয়ে দায় সারেন নকিব ভাই। তাহলে লিগ করার জন্য বোর্ড থেকে যে টাকা পান আর স্পনসর হিসেবে মেয়র সাহেব যে এক লাখ টাকা দেন এটা যায় কোথায়? আমাদের দাবির মুখে গতবার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তিন হাজার টাকা দিয়েছে জেলা ক্রীড়া সংস্থা। অথচ মোটামুটি মানের দল গড়তেও ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা খরচ হয় আমার।' তবে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নকিব, 'কত টাকাই আমরা পাই বলুন? জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে যে টাকাটা দেয়, এর বড় অংশই খরচ হয়ে যায় বেতন, বিদ্যুৎ বিল আর প্রশাসনিক কাজে। প্যাভিলিয়ন ভাড়া থেকে পাই সামান্য কিছু। এর পরও নানাভাবে চেষ্টা করছি বিভিন্ন খেলা চালানোর। তাতে দেনা হয়ে গেছে দুই লাখ টাকা!' অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেট দল ২০০৭-০৮ ও ২০১৩-১৪ মৌসুমে পৌঁছেছিল বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক ফাইনালে। প্রমীলা ক্রিকেট দল রানার্সআপ হয় ২০১১-১২ মৌসুমে। এই কৃতিত্বটা নিতেই পারেন বিসিবির নিয়োগ দেওয়া কোচ লিমন দে সঞ্জিত। তিনি অবশ্য সন্তুষ্টিই জানালেন জেলা ক্রীড়া সংস্থা নিয়ে, 'আমি বিসিবির কোচ, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কেউ না। তবে খেলোয়াড়দের ব্যাট, বলসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোনো অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েনি। তারা প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ নিয়মিত করার পাশাপাশি দুবার করেছিল টি-টোয়েন্টি লিগও।' পিরোজপুর জেলার নামকরণ নিয়ে একটা গল্প আছে। নাজিরপুর উপজেলার শাঁখারিকাঠির হেলালউদ্দিন নিজেকে দাবি করেন মোগল বংশের শেষ বংশধর। তাঁর মতে, বাংলার সুবেদার শাহ সুজা পরাজিত হয়েছিলেন আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার কাছে। পরাজয়ের পর পালিয়ে আসেন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে। নলছিটি উপজেলার সুগন্ধা নদীর তীরে কেল্লা তৈরি করে কিছু দিন ছিলেন শাহ সুজা। এখানেও আক্রমণের শিকার হয়ে তিনি পালিয়ে যান আরকানে। তবে দুই মেয়েসহ নিহত হন সেখানে। শাহ সুজা পালিয়ে গেলেও তাঁর স্ত্রী ও শিশু সন্তান ফিরোজ থেকে যান। তারা দামোদর নদীর মুখে আস্তানা গড়ে তোলার পর ফিরোজের নাম থেকেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় ফিরোজপুর। আর পরবর্তী সময়ে সেটাই এখনকার পিরোজপুর। এ নিয়ে বিখ্যাত পঙ্ক্তি, 'ফিরোজ শাহের আমল থেকে ভাটির দেশের ফিরোজপুর/বেনিয়া চক্রের ছোঁয়াচ লেগে পাল্টে হলো পিরোজপুর।' সেই পিরোজপুরে পাল্টে গেছে ক্রীড়াঙ্গনের চিত্রটাও। দেড় যুগ আগে খেলায় মুখরিত থাকত ক্রীড়াঙ্গন। স্থানীয় ফুটবল লিগে আবাহনী, মোহামেডান, ব্রাদার্সের মতো দলগুলো জাতীয় তারকাদের পাশাপাশি নিয়ে আসত বিদেশিদেরও। সর্বশেষ ১৮ বছর আগে অনুষ্ঠিত লিগে আবাহনী এনেছিল প্রেমলাল, পাকির আলীর মতো ফুটবলার। এই জেলারই পাঁচ ভাই জাহিদ হাসান এমিলি, ফয়সাল আহমেদ এমেকা, শাকিল আহমেদ, সাব্বির খান ও লিটন খান খেলেছেন ঢাকার ফুটবলে। তাঁদের দুজন জাতীয় দল আরেকজন মাতিয়েছেন বয়সভিত্তিক জাতীয় দল। সেই জেলায় ১৮ বছর ফুটবল লিগ না হওয়াটা সত্যিই হতাশার। বদনামটা কাটাতেই এ বছর ছয় দল নিয়ে হলেও লিগ আয়োজনে মরিয়া জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। শেখ রাসেল, সোনালী অতীত, সৃজনী ক্লাব, নিউ বয়েজ স্পোর্টিং, সূর্যতরুণ ও সান স্পোর্টসকে নিয়ে লিগ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি। বুট, জার্সি কেনাসহ দল গড়ার খরচও ক্লাবগুলোকে দিতে চান জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মাওলা নকিব, 'ক্লাবের সব খরচ বহন করব আমরা। তাতে অন্তত ১৮ বছর পর লিগটা হোক আর কিছুটা দায়মোচন হোক আমাদের।' ১৮ বছর লিগ না হলেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু টুর্নামেন্ট হয় পিরোজপুরে। আন্ত-উপজেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়েছে তিনবার। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া টুর্নামেন্টের পরের দুটো আসর মাঠে গড়ায় ২০১২ ও ২০১৪ সালে। এ বছর জানুয়ারিতে পিরোজপুরের উপজেলা মঠবাড়িয়ায় অনুষ্ঠিত হয় মেয়র ফুটবল টুর্নামেন্ট। শহীদ মোস্তফা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে রেন্ট এ-কার একাদশ শিরোপা জেতে ২-০ গোলে উন্নয়ন সমিতিকে হারিয়ে। পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহমেদ ফেরদৌস শিরোপার পাশাপাশি প্রতীকি চাবিও তুলে দেন বিজয়ীদের হাতে। গত বছর অনুষ্ঠিত আন্তকলেজ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সাফা ডিগ্রি কলেজ ৪-০ গোলে হারায় মঠবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজকে। টুর্নামেন্টটা অনুষ্ঠিত হয় সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ মাঠে। পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামটি অনেক আগের হলেও এর পূর্ণাঙ্গ উদ্বোধন হয় ১৯৯৮ সালের ৫ এপ্রিল। তখনকার যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উদ্বোধন করেন সোয়া ১০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামটি। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্টেডিয়ামটির সংস্কার দরকার এখন। এ জন্য হয়ে গেছে এক কোটি ৩০ লাখ টাকার টেন্ডার। দ্রুতই স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ শুরুর আশায় এখন স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের কর্তারা। স্টেডিয়াম ছাড়া এখানে খেলার মাঠ বলতে জেলা স্কুলের মাঠ আর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ মাঠ। জেলা স্কুলের বিশাল মাঠে গিয়ে দেখা গেল একদিকে ক্রিকেট আর অন্যদিকে ফুটবল খেলছে ছেলেরা। মাঠ ভর্তি খেলোয়াড়। এত বড় না হলেও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ মাঠেও হয় নানা টুর্নামেন্ট। অর্থাৎ মাঠের সমস্যা নেই। অভাব কেবল সংগঠকদের উদ্যমী হয়ে খেলার আয়োজন করা।