kalerkantho


তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবসা শুরু ও সাফল্যের পথ

তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবসা শুরুর আগে কোন কোন বিষয়ে নজর দিতে হবে, সাফল্যের পথ কী? তা নিয়ে সফটওয়্যার ও ইন্টারনেট ব্যবসায় তিন যুগেরও বেশি অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন বেসিস পরিচালক সৈয়দ আলমাস কবির

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবসা শুরু ও সাফল্যের পথ

কাজ চলছে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে। ছবি : সংগৃহীত

তথ্য-প্রযুক্তিতে বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন ডলারের বাজার। এ তথ্যে উদ্দীপ্ত হয়ে এই ব্যবসায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে লাভবান হওয়ার এটিই সঠিক সময়।

তবে ব্যবসা শুরু করতে প্রথমেই চিন্তা করতে হবে মূলধন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, দক্ষ জনবল, পরিচালনার অভিজ্ঞতা, বিপণন দক্ষতা ইত্যাদি নিয়ে।

তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে জানাশোনা ও অভিজ্ঞতা না থাকলে এ ব্যবসায় যুক্ত হওয়া বিপজ্জনক। এ ক্ষেত্রে কর্মীরা প্রতারণা করতে পারে। নিজের জানাশোনা না থাকলে এ বিষয়ে পারদর্শী সহযোগী বা ব্যবসায়ী অংশীদার নেওয়া ভালো। প্রশিক্ষণ নিয়েও নিজেকে তৈরি করা যায়। সবচেয়ে ভালো হয় সংশ্লিষ্ট খাতের সফল কোনো প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে দুই বছর কাজ করা। এতে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে অফিসের কর্মপরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও ভালো ধারণা হবে। কী করে ক্রেতা বা ব্যবহারকারীর চাহিদা পূরণ করা যায়, কী করে নতুন পণ্যের বিপণন করা হয়, সফটওয়্যার পণ্য বা সেবার মূল্য কিভাবে নির্ধারণ করা হয় ইত্যাদি সম্পর্কে জানাশোনা হবে।

তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবসায় বিভিন্ন ধরনের মডেল থাকে।

প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন করবেন, নাকি তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা দেবেন। তারপর ঠিক করতে হবে আয়ের কৌশল। অর্থাৎ সফটওয়্যার পণ্য বা সেবার মাসিক বা বার্ষিক লাইসেন্স ফি থাকবে, নাকি এককালীন মূল্য থাকবে। নাকি প্রতি লেনদেনের ওপর মাসুল নেওয়া হবে।

নতুন ধরনের পণ্য বা সেবা বাজারে আলোচনায় আসে বেশি। ব্যবসার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তবে তৈরির আগে চিন্তা করতে হবে—পণ্য বা সেবাটি কী কাজে আসবে।

বাজার অনুসন্ধান করে জানতে হবে একই ধরনের পণ্য বাজারে আছে কি না। অন্য কেউ বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না। প্রতিযোগীদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে।

নতুন পণ্যটি টেকসই ও কার্যকর কি না বাজারে ছাড়ার আগে পরীক্ষা করে নিতে হবে। অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরীক্ষা করে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা বা আলোচনার আগে একটি অপ্রকাশ-চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) করে নেওয়া ভালো।

পণ্য যদি মেধাস্বত্বের (পেটেন্ট বা কপিরাইট) উপযোগী হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট উকিলের সহযোগিতায় করে নিতে হবে। বিদেশে বাজারজাত করতে চাইলে সেসব দেশেও পেটেন্ট বা কপিরাইট করিয়ে নিতে হবে।

ব্যবসার একটি বিস্তারিত কৌশলগত পরিকল্পনা থাকা দরকার। বিশেষ করে বিপণন পরিকল্পনা খুব জরুরি। ক্রেতা বা ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী বিপণন কৌশল ঠিক করতে হবে। দৈনিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম কিভাবে চলবে, পণ্য তৈরিতে সময় কত দিন লাগবে, কতজন কর্মী লাগবে, কী কী সরঞ্জাম কিনতে হবে, আনুষঙ্গিক আর কী কী খরচ হবে, কখন, কবে, কতটুকু বিনিয়োগ করতে হবে—সব কিছু আগেই ঠিক করে নিতে হবে।

নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানা নাকি অংশীদারি হবে তা ঠিক করে নিতে হবে। কোনটিতে কী সুবিধা উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সহায়তা পাওয়া যাবে। নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আয়কর, ব্যাংকঋণ ইত্যাদি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। নিবন্ধনের পাশাপাশি মূসক, টিন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) সংক্রান্ত কাজও করিয়ে নেওয়া ভালো।

নিজের মূলধন নিয়ে শুরু করাই ভালো। প্রথম দুই বছর সফলভাবে চালাতে পারলে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবসায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়া সহজ হয়। তখন ব্যবসার পরিসর দ্রুত বাড়ানো যায়। বিনিয়োগ জোগাড় করার আরো কিছু উপায় রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগের জন্য দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা হয়। সেখানে সম্ভাবনাময় ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহীরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে এসব প্রতিযোগিতার খোঁজখবর পাওয়া যায়।

শুরুতেই কিছু কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনবল বাড়াতে হবে। জনবল নিয়োগে দক্ষতা দেখাতে হবে। সৎ, আন্তরিক ও প্রতিভাবান কর্মী নিয়োগ দিতে না পারলে ব্যবসায় বিফল হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

সফটওয়্যারের ক্ষেত্র বড় হওয়ায় সব কাজ এক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা কঠিন। তাই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে হবে। প্রয়োজনে সেসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া যাবে।

সফটওয়্যার বাজারে ছাড়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। অভিজ্ঞ বিপণনকারী দিয়ে বাজারজাত করতে হবে। প্রচারণায় ওয়েবসাইট, ফেইসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। আর্থিক সামর্থ্য থাকলে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনও দেওয়া যেতে পারে।

প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তথ্য মাথায় রেখে দাম নির্ধারণ করতে হবে। তবে বাজার ধরার জন্য দাম কমাতে গিয়ে মোট খরচের (বেতন-ভাতা, ভাড়া, পরিচালন খরচ সব মিলিয়ে) নিচে যাওয়া ঠিক না।

ব্যবসায়ের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। ধারাবাহিকভাবে যদি আপনি কাজ না পেতে থাকেন বা আপনার পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে অচিরেই ব্যবসায়ের ভরাডুবি ঘটবে। তাই কম্পানির মালিক হিসেবে আপনাকে সর্বদা সুচারুভাবে নতুন নতুন ক্রেতা সংযোজন, উদ্ভাবনশীল প্রকল্প হাতে নেওয়া, বাজার পর্যবেক্ষণ, ব্যবহারকারীর চাহিদা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের পণ্য বা সেবার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন ইত্যাদি বিষয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে দেশে এখন সফটওয়্যার ব্যবসার পরিবেশ ভালো। যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে নামলে এ ব্যবসায় সফল হওয়া কঠিন কিছু নয়।


মন্তব্য