kalerkantho


ডিভাইসনির্ভর প্রশ্নপত্র সুরক্ষায় বিবেচ্য বিষয়

ড. মো. নাছিম আখতার

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ডিভাইসনির্ভর প্রশ্নপত্র সুরক্ষায় বিবেচ্য বিষয়

অভ্যাসবশত জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন সকালে একনজর চোখ বুলিয়ে নিই। কয়েক দিন আগে একটি পত্রিকার খবরের শিরোনাম ‘প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে দুই ডিভাইস, নতুন পদ্ধতি নিয়ে শঙ্কায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী’। খবরে প্রকাশ, গত মঙ্গলবার তিন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় নতুন এই পদ্ধতি চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা থেকে পদ্ধতিটি চালু হবে। এর আগে সেমিনারের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। পদ্ধতি দুটির মধ্যে একটি হলো, পরীক্ষার হলে ট্যাবের মতো ছোট একটি ডিজিটাল যন্ত্রের ব্যবহার, যা পরীক্ষার্থীরা ব্যবহার করবে এবং পরীক্ষার আগমুহূর্তে প্রশ্নব্যাংক থেকে তৈরি হওয়া প্রশ্ন তাদের সামনে ভেসে উঠবে। নতুন পদ্ধতিটি চালু করতে সরকারের খরচ হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি এরূপ—বিজি প্রেসে ছাপানো প্রশ্নপত্র রিমোট-আনলকড স্মার্ট বক্স নামক বাক্সে ভরা হবে। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এই ডিভাইস আনলক করার ক্ষমতা থাকবে নিয়ন্ত্রিত। এ ছাড়া এই বক্সে থাকবে বিশেষ অ্যালার্ম সিস্টেম। নির্ধারিত সময়ের আগে কেউ বক্সটি খোলার চেষ্টা করলে সিগন্যাল চলে যাবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে।

আমি একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক। তাই খবরটি নিয়ে আমার আগ্রহ, চিন্তা, শঙ্কা সবই একটু বেশি। কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক হওয়ায় ডিভাইসের ব্যবহারকে নিঃসন্দেহে আমি সাধুবাদ জানাতে চাই। তবে প্রস্তাবিত পদ্ধতিটির ব্যবহারের সফলতা যেমন সরকারের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে তেমনি এর বিফলতা সরকারকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। তা ছাড়া পদ্ধতিগুলো ব্যবহারে টাকার সংশ্লিষ্টতা নেহাত কম নয়। তাই পদ্ধতিটি ব্যবহারের আগে কতগুলো বিষয় খুব গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা দরকার বলে আমি মনে করি।

ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো সর্বাগ্রে বিবেচ্য বলে মনে হয়, তা আমি আমার পেশাগত জীবনের দুটি বাস্তব ঘটনা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি। কোনো একটি  মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের উপস্থিতিতে একটি প্রেজেন্টেশনে আমি উপস্থাপক ছিলাম। প্রেজেন্টেশনের জন্য পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড ওপেন করালাম। ওপেন করে দেখি স্লাইডগুলো ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। এত বেশি ফ্যাকাসে যে লেখাগুলো অস্পষ্ট ও পড়ার অনুপযোগী। সচিব মহোদয় ভীষণ বিরক্তবোধ করলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। কর্মকর্তা বললেন, কিছুক্ষণ আগেই তিনি পাওয়ার পয়েন্ট চালিয়ে দেখেছেন, তখন সব কিছু ঠিক ছিল। কিন্তু এখন কেন ঠিকমতো কাজ করছে না, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনো সুরাহা করতে না পেরে অন্য একটি ল্যাপটপ এনে সেট করলেন। এবার স্লাইড পরিষ্কার ও উজ্জ্বলভাবেই দেখা গেল। ICT দিবসের একটি অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার জন্য একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর ব্যবস্থা করা হলো। সম্মানিত ব্যক্তিদের  উপস্থিতিতে যখন ভিডিওটি চালানো হলো তখন কিছুতেই ভিডিওর শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। অথচ সকালেই অন্য একটি ল্যাপটপে টেস্ট করা হয়েছে এবং সব কিছু ঠিক ছিল। অনুষ্ঠান থামিয়ে ডেস্কটপের সাউন্ড অপশনগুলো সব চেক করা হলো, কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। বিকল্প হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে সেই ল্যাপটপ নিয়ে আসা হলো, যেটিতে সকালে সব কিছু ঠিকঠাক চলেছে। এমন ঘটনা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্ষেত্রে ঘটা খুবই স্বাভাবিক। এখানে উল্লেখ্য, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ওপরে বর্ণিত অনুষ্ঠান দুটি আধাঘণ্টা পরে শুরু করতে হয়েছিল।

এসএসসি পরীক্ষার ২২ লাখ ছাত্র-ছাত্রী যখন পরীক্ষা দেবে, তখন অল্পকিছু ডিভাইস হঠাৎ নষ্ট হয়ে যেতে পারে অথবা ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এসব ছাত্রের পরীক্ষা সময়মতো শুরু করা সম্ভব হবে কি না তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। ডিভাইস পরিবর্তন করে নতুন ডিভাইস সংযোগের জন্য স্কুলগুলোর সক্ষমতা একটি বড় বিষয়। তা ছাড়া এমন যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে নতুন ডিভাইস জোগান দিতে যে সময় লাগবে সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া উচিত। খবরে বর্ণিত ডিভাইসটি বছরে একবার বা দুইবার ব্যবহৃত হবে। ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়মিত ব্যবহৃত না হলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। এগুলোর ব্যাটারি, চার্জার ও ডিসপ্লে  নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং ডিভাইসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ। ফি-বছর ডিভাইস ক্রয়ে সরকারের খরচ বর্ধিত হবে কি না সে বিষয়টিও বিশেষভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সারা দেশে একযোগে পরীক্ষা শুরুর ক্ষেত্রে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুতরাং পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার মুহূর্তে প্রশ্ন সরবরাহের ক্ষেত্রে ছাপানো প্রশ্নই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে আমি মনে করি।

এবার আসছি স্মার্ট বক্সের কথায়। খবরের বর্ণনা অনুযায়ী স্মার্ট বক্স পিন নম্বর বা পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোলা যায়। নির্ধারিত সময়ের আগে কেউ বক্সটি খোলার চেষ্টা করলে সিগন্যাল চলে যাবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। ডিভাইসটি রিমোট কন্ট্রোল হলে নিঃসন্দেহে ডিভাইসটি সিগন্যালনির্ভর বা IOT (Internet of Thing) প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত। সে ক্ষেত্রে কোনো সিগন্যাল জ্যামার দিয়ে ডিভাইস থেকে নির্গত সিগন্যাল অকেজো করে দিলে কেন্দ্রের সঙ্গে এ রূপ ডিভাইসের সংযোগ বলবৎ থাকবে কি না তা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার। কোনো মেকানিক্যাল ত্রুটির কারণে পাসওয়ার্ড বা পিন নম্বর পাওয়ার পরেও যদি বক্স না খোলে সে ক্ষেত্রে বক্স ভেঙে প্রশ্ন না বের করা পর্যন্ত পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব নয়। ফলে ওই কেন্দ্রের পরীক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন করে বড় আকারে প্রয়োগের সুযোগ কতখানি তা ভাবার বিষয়। কারণ পরিসর যত বড় হবে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনাও তত বাড়বে। তবে পদ্ধতি দুটির মধ্যে স্মার্ট বক্স পদ্ধতিটি আমার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য, কিন্তু বক্সে একসেট প্রশ্ন না থেকে পাঁচ সেট প্রশ্ন থাকতে হবে। তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতা থাকবে না বললেই চলে। কারণ আগে থেকে না পড়লে কারো পক্ষেই বহু নির্বাচনী প্রশ্ন ছাড়া অন্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সরকার যারপরনাই বিব্রত। দেশের মেধা সৃষ্টির পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের আশু সমাধান খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের গুণীজনরা চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করবেন, যা আমাদের দেশের কোমলমতি ছাত্রদের ভীতির কারণ না হয়ে প্রশ্ন সুরক্ষায় হবে শতভাগ কার্যকর।

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 


মন্তব্য