kalerkantho


নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো কি হারিয়ে যাবে

ধরিত্রী সরকার সবুজ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো কি হারিয়ে যাবে

আজ ২৪ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব নদী দিবস।

২০০৫ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার দিনটিকে পালন করা হয় বিশ্বব্যাপী নদীর গুরুত্বকে তুলে ধরা এবং নদী রক্ষা ও ব্যবহারে মানুষের সচেতনতা ও উৎসাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে। বর্তমানে সারা বিশ্বেই নদীগুলো বিভিন্ন রকম হুমকির মুখে আছে এবং মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণই পারে আগামী দিনে নদীগুলোকে সুন্দর ও সঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে।

অসংখ্য নদ-নদীর দেশ বাংলাদেশ। খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ের অভাব ছিল না এ দেশে। বর্ষাকালে নদীর দুকূল ছাপিয়ে পানি ঢুকে পড়ত সমতল মাঠে বা প্লাবনভূমিতে। মাঠের ওপর দিয়ে প্রবহমান পানির স্রোতের মুখে মাছ ধরার জাল বা পলো বসিয়ে মাছ ধরতে দেখা যেত গ্রামের সাধারণ মানুষকে। গ্রামের মত্স্যজীবীরা ছোট নৌকা বা ডোঙায় করে নদীর বুকে ঘুরে বেড়াত নানা ঢঙের মাছ ধরার জাল ফেলে। গ্রামের হাটবাজার ভর্তি থাকত শৈল, টাকি, পুঁটি বা মেনি মাছের মতো দেশি মাছে। কিন্তু সে দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।

দেশে নদী আছে ঠিকই, তবে নদীর সে আগের চেহারা নেই। বেশির ভাগ নদীই জীর্ণশীর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে অনেকগুলো শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশের নদীগুলো খুব দ্রুত নাব্যতা হারাচ্ছে। একসময় যেসব নদী বেশ খরস্রোতা ছিল, সেগুলোও এখন মরতে বসেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার বুকেও যখন-তখন জেগে উঠছে চর। সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, নবগঙ্গা, ভৈরব, করতোয়া, চিত্রাসহ দেশের অসংখ্য নদ-নদী আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে এগুলোর অধিকাংশ নৌ চলাচলের উপযোগী থাকলেও শীতের শুরুতেই নাব্যতা হারায়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মোট নদীপথ ছিল ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার, ১৯৮৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় আট হাজার ৪৩৫ কিলোমিটারে। ১৯৯২ সালে কমে নৌপথের পরিমাণ দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৮৯৬ কিলোমিটারে এবং বর্তমানে নদীর পানিপ্রবাহ কমে আজ তা দাঁড়িয়েছে মাত্র তিন হাজার ৮০০ কিলোমিটারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে আরো অনেক নদীর দৈর্ঘ্য সংকুচিত হবে এবং নাব্যতা হারাবে।

নদীগুলোর এভাবে নাব্যতা হারানোর মূল কারণই হলো পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া। আমাদের নদীগুলোয় সাধারণত অক্টোবর মাস থেকেই পানিপ্রবাহ কমতে থাকে। ফলে নদীর পলি বহন ক্ষমতা হ্রাস পায়।

আমাদের এ নদীগুলোয় পলিমাটি জমে ভরাট হওয়ার প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের সৃষ্ট কারণও কম দায়ী নয়। নদীর উজানে বনভূমি উজাড় করা হলে পলিপ্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং অতিরিক্ত পলি নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদী ভরাট প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। মানুষ নদীর পানিতে শিল্পবর্জ্যের নিঃসরণ ঘটাচ্ছে। এসব শিল্পবর্জ্যের রাসায়নিক অংশ নদীর পানিকে দূষণের পাশাপাশি বর্জ্যের অদ্রবণীয় অংশ শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে জমা হচ্ছে এবং নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা নগরীতে আজ জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই ঢাকা শহরে বর্তমানে বসবাস করছে দেড় কোটির মতো মানুষ। নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বস্তিসদৃশ লোকালয়। মানবসৃষ্ট বর্জ্য বিভিন্ন ছোট-বড় খাল ও নর্দমার মাধ্যমে সরাসরি গিয়ে পড়ছে বুড়িগঙ্গায়।

ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নারায়ণগঞ্জের প্রাণ বলে খ্যাত শীতলক্ষ্যার অবস্থাও বড়ই করুণ। এর পানিতে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এসিড, ক্ষার ও দ্রবীভূত ক্লোরাইডের মাত্রা অনেক বেশি। নারায়ণগঞ্জ-সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর পয়োবর্জ্য যথারীতি মিশছে শীতলক্ষ্যার পানিতে। কিন্তু বড় শত্রু দুই তীরে গড়ে ওঠা টেক্সটাইল ও ডায়িংসহ অসংখ্য কারখানা। পয়োবর্জ্য ও শিল্প-কারখানাগুলোর নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য শীতলক্ষ্যার পানিকে নিয়ে যাচ্ছে হুমকির মুখে।

এদিকে তুরাগ নদীর পার্শ্ববর্তী সাভারে গড়ে উঠেছে বস্ত্রশিল্পসহ অনেক শিল্প-কারখানা। আমরা দেখতে পাচ্ছি শিল্প গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়টি অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সাভারের বস্ত্রকলগুলোর কোনো কোনোটির বর্জ্যপানি নর্দমা ও কৃষিজমির ওপর দিয়ে এবং কোনো কোনো কারখানা থেকে সরাসরি গিয়ে পড়ছে তুরাগে। ফলে নষ্ট হচ্ছে তুরাগের পানির ভৌত গুণাবলি। সাভার এলাকা একসময় মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল। তুরাগ নদীতে মাছ ধরে অনেক জেলের জীবন চলত। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই।

বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা তুরাগ—এগুলোর দূষণের প্রকৃতি অনেকটা এক। প্রথমত, গৃহস্থালি বর্জ, পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা সরাসরি মিশছে এসব নদীতে। দ্বিতীয়ত, কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে সরাসরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

মনে রাখা দরকার, নদীর সঙ্গে আমাদের জীবন, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ক। নদী শুকিয়ে গেলে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, মত্স্য সম্পদসহ নদীর অনেক প্রাণীর জীবন বিপন্ন হয়। আমাদের সব যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এখনো নদীপথই সর্বাপেক্ষা সুলভ। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশের যেকোনো প্রান্তে খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্য পৌঁছানোর জন্য নদীপথই এখন পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা উপযোগী। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য এখন পর্যন্ত নদীর পানিই আমাদের প্রধান ভরসা। মিঠা পানির বহু প্রজাতির মাছ এবং জলজ প্রাণী যে হারিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়াটাই উদ্বেগের বিষয়। নদীতে পানি না থাকলে মাছ থাকবে না। নৌপথ বন্ধ হয়ে যাবে। জেলেরা বেকার হয়ে পড়বে। হারিয়ে যাবে জীববৈচিত্র্য। কৃষিকাজ হবে না। গবাদি পশুর খাদ্য থাকবে না। অদ্ভুত এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সে কারণেই বর্তমানের বাস্তবতায় নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনা খুবই জরুরি।

ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে রক্ষার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনাও এসেছে একাধিকবার। হাইকোর্ট ২৫ জুন ২০০৯ সালে নদীগুলো রক্ষায় ১২ দফা নির্দেশনা দেন। এগুলোর কিছু অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কিছু হয়নি।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার ৪ অক্টোবর ২০০৯ সালে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চারটি নদী—বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। ইসিএ ঘোষণা করায় এ চারটি নদীতে আট ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব নির্দেশনা প্রতিপালিত হচ্ছে না।

দেখা গেছে, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে খণ্ডিত পরিকল্পনার আওতায় অপরিকল্পিত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ফলে সেগুলো কার্যকারিতা পায়নি। একাধিকবার ঢাকার চারপাশের নদীতীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। যেসব স্বার্থান্বেষী মহল নদী দখল ও দূষণের জন্য দায়ী, তারা প্রভাবশালী হওয়ায় দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে অনিয়মিত এসব উচ্ছেদ অভিযান কিংবা সতর্কতা জারি করে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। নদী রক্ষায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিতভাবে চালু রাখার পাশাপাশি উচ্ছেদকৃত স্থান আবার যাতে দখল হয়ে না যায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। নদীর পাড় চিহ্নিত করা, পাড় বাঁধানো এবং পাড়ঘেঁষে হাঁটার পথ বা গাছ লাগানোর নিরবচ্ছিন্ন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়নই পারে দেশের নদীগুলোকে রক্ষা করতে।

 

লেখক : প্রকৌশলী, ইংল্যান্ডের গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন বিষয়ে মাস্টার্স


মন্তব্য