kalerkantho


বর্ণমালার দুঃখ নিশি ভোর হোক

গোলাম কবির

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বর্ণমালার দুঃখ নিশি ভোর হোক

কবি শামসুর রাহমানের একটি স্মরণীয় কবিতা, ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। আমাদের অস্তিত্বের শিকড় বাংলা ভাষা নিয়ে দীর্ঘকালের অবজ্ঞা আর ষড়যন্ত্রের একপর্যায়ে কুচক্রী পাকিস্তানিরা বাংলা বর্ণমালাকে আরবিতে পরিবর্তনের আয়োজন করে।

দুঃখের বিষয়, বাংলাভাষী এ দেশের কিছু তোষামোদজীবী তথাকথিত পণ্ডিত তাতে সম্মতি দিয়েছিলেন। কবি ক্ষোভে-বেদনায় ওই কবিতার পঙিক্তগুলো উচ্চারণ করেছিলেন।

বাংলা ভাষার দুঃখের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বাংলা কবিতা যখন ঊষার আকাশের মতো উঁকি দিচ্ছে ও তখনকার কবিরা সন্ধ্যা ভাষায় (চর্যাপদের ভাষা) কবিতা লিখছেন, তখন থেকেই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তার পেছনে লাগে। কবিরা বাংলাদেশে তিষ্টিতে পারেননি। তাঁদের সৃষ্টি সম্ভারের কিছু অংশ পাওয়া গেছে বাংলার বাইরে নেপালে। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সেখান থেকে উদ্ধারের পর ১৯১৭ সালে সম্পাদনা করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষার দুর্গতি সেখানেই শেষ হয়নি। বৈদিক ভাষায় রচিত বলে কথিত বেদপুরাণ-রামায়ণ ইত্যাদি বাংলা ভাষায় রূপান্তর শুরু হলে পণ্ডিতরা ফতোয়া দিয়েছিলেন, রূপান্তরকারীদের স্থান হবে ‘রৌরব’ নরকে।

মুসলমানদের অনেকে বাংলা ভাষাকে সুনজরে দেখেননি। মধ্যযুগের কবি আব্দুল হামিদ তাঁদের কঠিন ভাষায় জবাব দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। সব টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার নিজের গতিতে এগিয়ে গেছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলা ভাষার ওপর নতুন দুর্যোগ দেখা দেয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে রায় দেন। এ অপকর্মে পরামর্শ দিয়েছিলেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দীন। এতে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন এ দেশের কিছু ‘জি-হুজুর’ ধরনের রাজনীতিক। যাঁরা নিজেদের আভিজাত্য প্রমাণের জন্য বাড়িতে উর্দু বলতেন। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি চক্র তাতে আমল দেয়নি।

ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ শাসনামলে অনেক বিদেশি বাংলা ভাষা শেখেন, বাস্তবতা অনুধাবন করে। বিশ শতকের প্রথম দিকে অমৃতসরবাসী জিয়াউদ্দীন (অপর ব্যক্তি) শান্তিনিকেতনে এসে বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্রসংগীত আয়ত্ত করেছিলেন। সেই নবলব্ধ শিক্ষা তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। থাকতেন সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত নানা সংগ্রামের পরও বাংলা ভাষা তার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারেনি। তবে এই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর কিছু পাকিস্তানপ্রেমীর মুখে শোনা গেছে, ভাষা আন্দোলনের জন্যই তাদের সাধের পাকিস্তান ভেঙে গেছে। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু নবীন প্রজাতন্ত্রের সব কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনের ফরমান জারি করলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ভয়াবহ পটপরিবর্তনের পর বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি উল্টোপথে চলা শুরু করল। আগের চেয়ে বেশি করে ইংরেজি ব্যবহারের জন্য অনেকেই উদ্বাহু হয়ে উঠল। পরিণামে এ দেশের মানুষ পুরোপুরি ইংরেজি আয়ত্ত করতে পারল তা নয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার আভিজাত্য হারাতে বসল। বাংলা ভাষার দুঃখ ঘুচল না, দুঃখিনীই রয়ে গেল।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পঠনপাঠন প্রবর্তন করেন। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ বাঙালি একে স্বাগত জানান। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনুরাগী মেধাবীরা সে সময় থেকে বাংলায় উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করতে আগ্রহী হলেন। তা ছাড়া তখনকার দিনে স্নাতক ডিগ্রিধারীরা ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষায়ই সমান দক্ষ ছিলেন। এখন প্রায় উল্টো। আমরা ইংরেজির কথা বলব না। কারণ আমাদের প্রাসঙ্গিক বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

বর্তমানে বাংলা ভাষার দৈন্যদশা পীড়াদায়ক। পাঠ্যপুস্তকে ভুল, ভুলে ভরা প্রশ্নপত্র। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি কম হচ্ছে না। কিন্তু অন্ধকার ঘুচছে না। এর অন্যতম কারণ হলো, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি প্রাপ্তির সহজলভ্যতা। গ্রামগঞ্জে-প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলা বিষয়ে অনার্স প্রবর্তিত হচ্ছে। একসময় বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজি পড়তে হতো বাংলায় অনার্স পড়লে, এখন আর নেই বলে বাংলা অনার্সে পড়ার জন্য এমন কিছু শিক্ষার্থী আসছে, যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল। তারা ডিগ্রিও পেয়ে যাচ্ছে। শুধু তাদের কথাই কেন বলি, তাদের যাঁরা শিক্ষা দেওয়ার ভার নিয়েছেন, তাঁদের ভিতও শক্ত নয়। এই যে অনেকটা হেলাফেলার ভেতর দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠনপাঠন, তার পরিণতি যে শুভ হতে পারে না, সে লক্ষণ দৃশ্যমান। এ অবস্থা চলতে থাকলে দুঃখিনী বর্ণমালার দুঃখ নিশি হয়তো ভোর হবে না।

পৃথিবীতে প্রচলিত জীবিত ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলার স্থান পঞ্চম। আমরা যদি এখন থেকে সচেতন না হই, তবে বিপুল সাহিত্য সম্ভারে ভরা বাংলা ভাষা হয়তো একদিন সংস্কৃত ভাষার দশায় পরিণত হবে। তবে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার মধ্যে পার্থক্য হলো, সংস্কৃত সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ছিল না কোনো দিন। পক্ষান্তরে বাংলা ভাষা শিকড় থেকে উঠে আসা।

একটা সত্য অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে বাংলা ভাষা শুদ্ধ করে লেখা ও সাহিত্য রচনার জন্য বাংলা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে হবে, তা কিন্তু অনিবার্য নয়। বাংলা সাহিত্যে অনেক দিকপাল আছেন, যাঁরা বাংলা নিয়ে এমএ পাস করেননি। অথচ তাঁরা স্মরণীয় হয়ে আছেন। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বাংলা নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের বিরোধিতা করছি। তবে আমাদের অনুযোগ, যেখানে-সেখানে বাংলায় অনার্স বা এমএ পড়ার ব্যবস্থা করে ও অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের সুযোগ করে দিয়ে প্রকারান্তরে বাংলা ভাষার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা থেকে যেন আমরা বিরত হই।

একসময় বাংলা ভাষাবিদ্বেষীরা আমাদের ভাষার অস্তিত্বের ওপর চড়াও হয়েছে নানাভাবে। এখন বাইরে থেকে কেউ হস্তক্ষেপ না করলেও আমরা বাংলা পড়ুয়ারাই বাংলা ভাষাকে হেয়প্রতিপন্ন করছি। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের মেধাবী উত্তরসূরিরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পাঠে এগিয়ে এলে দুঃখিনী বর্ণমালার দুঃখ নিশি ভোর হবে বলে আশা করা যায়।

 

লেখক : রাজশাহী কলেজের সাবেক শিক্ষক


মন্তব্য