kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ভিন্নমত

সৎ লোকের বন্ধু নেই

আবু আহমেদ

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সৎ লোকের বন্ধু নেই

পদ-পদবি দু-চারজন লোককে মহৎ করে। অন্য প্রায় সবাইকে আরো আক্রমণাত্মক করে।

ব্যবহার-আচারে একটা অহংকারের ভাব প্রকাশ পায়। এরা হলো ওরাই, যারা নিজ যোগ্যতায় পদ-পদবি পায় না। অন্যে কৃপা করেছে বলে পদ পেয়েছে। অথবা নিজের একটা গুণ ছিল সেটা হলো তদবির করা। কোথায় কিভাবে তদবির করতে হবে সে ব্যাপারে এরা জানে। অনেকে তদবিরে এতটাই পটু যে তাদের কাছে তদবিরের বই থাকে। ওসব বইতে ক্ষমতা যাদের আছে তাদের নাম-ফোন নম্বর ইত্যাদি থাকে। এরা সরাসরিও তদবির করে। আবার পদে বসে আছে এমন লোকদের প্রিয় লোকদের মাধ্যমেও তদবির করে। তদবির করতে গিয়ে কিছু ব্যয় করতে হলেও করে। এরা হলো একটা শ্রেণি। তদবির করে শুধু জীবিকা নির্বাহ করে না; রীতিমতো গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়। জিজ্ঞেস করলে বলবে, তিনি একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার। তবে অমুক দলের সঙ্গে আছে। সৎ লোকদের কাছেও এরা তদবির নিয়ে যায়। তবে কম। সৎ লোকের কাছে গিয়ে যখন তদবির করে তখন বলে, আরে ওই লোকটা তো সৎ। কিন্তু দলের আনুগত্যের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে বলে তার প্রমোশনটা হয়নি। সৎ লোক সততার কথা শুনতে পছন্দ করে। তাই প্রমোশন না পাওয়া লোকটার  প্রতি দুর্বল হয়। এবং চেষ্টা করে ওই লোকটার প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তার প্রতিবিধান করার জন্য। আর যে ব্যক্তি দলবাজি করে ওপরে গেছে এবং এখনো দলবাজিতে সময় দেয়, তার কাছে এসে তদবিরকারক বলতে থাকে, আহা, ওই বেচারা তো আমাদের দলেরই লোক। পূর্ব সরকারের সময় শুধু আমাদের দলের সৈনিক বলে তাকে ওএসডি করে বসিয়ে রাখা হয়েছিল অনেক দিন। আমাদের সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে প্রমোশন-পোস্টিং দুটিই দিয়েছে বটে, তবে কোনোটাই সুবিধার হয়নি। আর ওই যে গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে ওই লোকটা বসে আছে, সে তো পূর্ব সরকারের সময়ও সুবিধাভোগী ছিল। আর এখনো তার পোস্টিংটা হলো একেবারে প্রাইজ পোস্টিং! কেন এমন হবে? তার স্থলে কৃতজ্ঞ আমাদের লোকটাকে কি ওই পদে বসানো যায় না? বস যেহেতু দলের কথা শুনে প্রীত হন, তাই বলেই ফেলেন, তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন।

আমাদের অর্থনীতির একটা বিরাট অংশের লেনদেনের কোনো লিখিত দলিল থাকে না। অন্য কথায় অর্থনীতিতে অনেক লেনদেন হয় যেগুলোর কোনো রেকর্ড থাকে না। যেগুলো কর্তৃপক্ষ চাইলেই পরীক্ষা করে দেখতে পারবে। ক্যাশ বা নগদে যেসব লেনদেন হয় ওগুলোর কারণ ও উৎস খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তদবিরকারকরাও যেসব লেনদেন করে সেগুলোর তেমন কোনো রেকর্ড পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই অস্বীকৃত ব্যবসার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাত বদল হচ্ছে। অনেক লোকই সরাসরি কোনো কাজ করতে চায় না। তারা অন্য লোককে হায়ার বা ভাড়া করে কাজগুলো করিয়ে নেওয়ার জন্য। সবটা যেন একটা এজেন্ট না হলে তাদের চলে না। জজকোর্টে-হাইকোর্টে বুঝলাম বাদী-বিবাদী সরাসরি নিজের কথাগুলো উপস্থাপন করতে সাহস পায় না। সেখানে একজন বা একাধিক সনদপ্রাপ্ত অ্যাডভোকেট মামলার পক্ষ-বিপক্ষের পক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু ট্যাক্স অফিসে, পাসপোর্ট অফিসে কিংবা গাড়ির নম্বরপ্লেট ও ফিটনেস সনদ গ্রহণের ক্ষেত্রেও কি কোনো এজেন্ট, দালাল বা ব্রোকার দরকার? কিন্তু বাস্তবতা হলো, সর্বত্রই ব্রোকার-দালালরা ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্যের কাজটি অর্থের বিনিময়ে করে দেওয়ার জন্য। আমার গাড়িটির ফিটনেস সনদের জন্য আমি নিজে বিআরটিএতে (BRTA) যাই। গিয়ে দেখি গাড়ির দীর্ঘ লাইন, সবাই এসেছে কাগজপত্র ঠিক করে নিতে। কিন্তু কদাচিৎ গাড়ির মালিকদের চোখে পড়ে। গাড়ির মালিকরা নিজেরা এসবের ধারেকাছেও আসে না। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এসেছে। সে ধরেছে দালাল। এবং কাজও হয়ে যাচ্ছে। শুধু একটু দেরি হচ্ছে। অনেক লোক বলে ট্যাক্স অফিসে, বিআরটিএতে বা অন্য যেখানে সরকার সেবা বিক্রয় করছে ওসব অফিসে নিজেরা গেলে কাজটি শুধু জটিলই হয়। বরং দালাল ধরলে কাজটি সহজ হয়।

দালাল-দালালির এসবের একটা মূল্য আছে। এরাই অন্যদের পক্ষ হয়ে অন্য পক্ষকে অর্থ দিয়ে তুষ্ট করছে। নিজেরা একটা পার্সেন্টেজ পায়। কিন্তু কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীতে বিজ্ঞাপন দিয়ে ডায়মন্ড জুয়েলারির মেলা বসানো হয়। বড় হোটেলে বড়লোকদের জন্য। মেলা উপলক্ষে ডিসকাউন্টও দেওয়া হয়। বড়লোকদের ঘরের সদস্যরা দলে দলে এসব মেলায় ভিড় করে। অন্যদিকে শুনি সরকার ট্যাক্স পায় না। এত বড়লোক এত ডায়মন্ড খরিদ করতে পারলে সরকার ট্যাক্স পাবে না কেন? আসলে সরকারও চাইতে জানে না। সমাজে বড়লোক কারা, যারা ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। তাদের ধরা কি এতই কঠিন? সমাজ এখন আর সেই সমাজ নেই, যে সমাজকে আমরা ৪০-৫০ বছর আগে চিনতাম। এখন কেমন যেন একটা স্বার্থপরতার ভাব এসে গেছে। সেই সঙ্গে চৌর্যবৃত্তিরও একটা সংস্কৃতি এসে গেছে। গত ঈদে ভারতীয় হাইকমিশন নাকি ৬০ হাজার লোককে ভিসা দিয়েছে তাদের দেশে গিয়ে বেড়িয়ে আসতে। হতে পারে এসব যাত্রীর কিছু অংশ রোগী এবং তাদের সঙ্গী। অন্যরা তো এক্সিকিউটিভ ক্লাসে চড়ে ট্যুরিজমে বের হয়েছে। দেশে এখন বৈদেশিক মুদ্রার অভাব নেই। আইনি পথেও অনেক ডলার-ইউরো বাইরে নেওয়া যায়। আর ওই পথের বাইরেও যে পথ আছে, সে পথে তো অনেকই নেওয়া যায়। দেশে করপোরেট সংস্কৃতি নামে এক ধরনের প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সবারই লক্ষ্য ওই লোকগুলো, যারা তাদের কথা কিনবে, পণ্য কিনবে। বড় বড় করপোরেট হাউসের শতভাগ মালিকানা আবার বিদেশিদের হাতে। তারা অভাবনীয় লাভ করছে এ দেশে। কারণ হলো এ দেশে ক্ষতিকর বিজ্ঞাপনের ওপর যেমন বিধিনিষেধ নেই, তেমনি ক্ষতিকর পণ্যকে অনায়াসে বাজারজাত করা যায়। চারদিকে লুণ্ঠনের একটা দৌড় চলছে। জানি না একদিন অর্থনীতি ভার নিতে না পারলে এই দৌড় থেমে যায় কি না। তবে যত দিন মানুষ থাকবে, তাদের অভাব ও চাহিদা থাকবে, তত দিনই সমাজের দুষ্ট খেলোয়াড়রা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকবে। দেশ যদি মাথাপিছু আয়ে আরো সামনে যায়, তাহলে তাদের কৌশল হবে এক রকম আর অর্থনীতি থেমে গেলে তাদের কৌশল হবে অন্য রকম।

সৎ লোকদের কথা বলতে চাইছিলাম। তারা অতটা অসহায় নয়। সততাই হলো তাদের বড় সম্পদ। এই যে সারা জীবন সৎ থাকার জন্য ওরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, সেই চেষ্টাই হলো ওদের বড় অর্জন। সমাজের অজ্ঞ লোকেরা তাদের ব্যর্থ বলতেই পারে। কারণ ওই সব অজ্ঞ লোক দুর্নীতি-লুণ্ঠনের মধ্যে নিজেদের জন্য জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে। সৎ ও অসততার মধ্যে পার্থক্যটা হলো আকাশ-পাতাল। সৎ লোকের জীবনবোধ অসৎ লোকের জীবনবোধের চেয়ে বিপরীতধর্মী। সৎ লোকটা বৈষয়িকভাবে দরিদ্র থাকতে পারে। সে স্বেচ্ছায় ওই রকম দারিদ্র্যকে বেছে নিয়েছে। সৎ লোক নিজে জীবনচারিতায় কী আনন্দ পায়, সেটা একজন অসৎ লোক বুঝবে না। অসৎ লোকদের ধারণাই হলো, সমাজে সব লোকই অসৎ। আবার অসৎ লোক নিজের অসততার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়েও বলে, সমাজে সব লোকই অসৎ। আর সে নিজে যা করছে তা-ই স্বাভাবিক। কিছু অসৎ লোক এমনও বলে যে ওসব পদে বসে সৎ থাকা যায় না। সৎ থাকতে গেলে চাকরি হারাতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ের কিছু লোক বলে ট্যাক্স অফিসে গিয়ে সৎ হতে গেলে ট্যাক্সম্যানরা আপনার কাছ থেকে শুধু বেশি ট্যাক্সই চাইবে। অসৎ ও দুর্নীতিবাজ লোকদের আরেক কৌশল হলো—কী করব, ওপরের সবাইকে খুশি করতে হয়! অসৎ লোক কাউকে নিয়ম ভেঙে কিছু সুবিধা দিতে গিয়ে বলে, ওপরের নির্দেশ আছে। অসৎ লোকেরা আবার সংঘবদ্ধ থাকে। তাদের পাশ কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত কেউ দিতে গেলে তারা তা ঠেকিয়ে দেবে। দুর্নীতিবাজদের আরেক কৌশল হচ্ছে, সৎ লোকগুলোকেও দুর্নীতিবাজ বলা। তারা বলতে থাকে, ও, ওই লোকটা সৎ আছে কারণ সে তো দুর্নীতি করার সুযোগই পায়নি। সুযোগ পেলে দেখতেন সে হতো দুর্নীতির গডফাদার! আসলে দুর্নীতিবাজরা সৎ লোকদের এসব বলে একটু হলেও কাদা মেখে দিতে চায়। তবে যারা সৎ আছে তারা এসব নিন্দাবাদের পরোয়া করে না। তারা সৎ থাকে নিজের বিশ্বাসকে মূল্য দেওয়ার জন্য। তাদের বিশ্বাস, সততা তাদের অন্যদের থেকে শুধু আলাদাই করবে না, প্রকৃতপক্ষে তারাই সফল হবে। তাদের কাছে সফলতার মাপকাঠি হলো সততা আর পরিশ্রম। তাদের আরেক গুণ হলো তারা বিনয়ী। দুনিয়ার মিথ্যা লোভ তাদের তাড়িয়ে ফিরতে পারে না। তারা হলো এক অনন্য মানুষ। সৎ লোকদের কেউ তোষামোদও করে না। কারণ তারা অপরের এই ব্যবহার অপছন্দ করে। গৌরব-গরিমা—এসব হলো তাদের সৃষ্টিকর্তার জন্য। মহান শুধুই তাদের রব—তাদের সৃষ্টিকর্তা। এই লোকগুলো সমাজের কাদায় থাকলেও কাদা যেন গায়ে মাখতে না পারে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। চাওয়া-পাওয়ার উৎস তাদের কাছে একটিই। সেই উৎস হলো তাদের সৃষ্টিকর্তা এবং বিশ্বাস করে, তিনি চাইলে তারা ভালো থাকবে। দুনিয়ার ভালো থাকার উপকরণগুলো তারা ততটাই মূল্য দেয় যতটা না হলে ন্যূনতম জীবন ধারণ করা যাবে না। এরা অন্য লোককে সম্মান করে। এরা এ-ও জানে, প্রকৃত জ্ঞানী হওয়ার জন্য প্রকৃতির পাঠই অনেক উপকারী, যদি সেই পাঠ সঠিকভাবে গ্রহণ করা যায়।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য