kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

পিন্টু ভাইয়ের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হয়

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন দলটির ম্যানেজার তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্নার গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পিন্টু ভাইয়ের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হয়

গ্রুপিংয়ের কারণে আমাদের সেক্রেটারি লুৎফর চাচার ওপর হাত ওঠে পর্যন্ত। শাস্তি হিসেবে বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির পক্ষ থেকে পিন্টু ভাইয়ের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। শেষ তিন ম্যাচে আমাদের অধিনায়ক ছিলেন তাই আইনুল ভাই।

কতই বা বয়স তখন? ১৯-২০ বছর বড়জোর। তাঁকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার করা হয়েছে শুনে তাই তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না চমকে গেলেন খুব। ক্ষণকালের জন্য মাত্র। পরক্ষণেই বুঝতে পারলেন, ইতিহাস আলিঙ্গনের এ এক আশ্চর্য উপলক্ষ!

জীবন-সংসারে আপাদমস্তক সফল মানুষটি তাই এত বছর পরও গর্ব নিয়ে বলতে পারেন, ‘জীবনে অনেক কিছু করেছি; অনেক সাফল্য আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই আমাকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার হিসেবেই হয়তো মনে রাখবেন।’

অভিজাত পরিবারের সন্তান তান্না। বাবা বিখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের সঙ্গেও বন্ধুতা সেই ছোট্টটি থেকে। ‘ধানমণ্ডিতে ফুটবল খেলতাম কামালের সঙ্গে। পরে তো শাহীন স্কুলে একসঙ্গে পড়েছিও। বসতাম পাশাপাশি। শয়তান ছিলাম তো, দুজন মিলে দুষ্টুমি করতাম খুব’—গুলশানে নিজ বাসায় ঝাঁ চকচকে ড্রয়িংরুমে বসে বলতে বলতে মধ্য ষাটের তান্নার মুখে খেলে যায় কৈশোরের অপার্থিব আলো। সময়ের দুরবিনে দুরন্তপনার ছবিগুলো ভেসে ওঠে যেন। আবার যুদ্ধ যে হঠাৎই ওই প্রজন্মের বয়স অনেকটা বাড়িয়ে দেয়, তা-ও বোঝা যায় তাঁর পরের কথায়, ‘১৯৭১ সালের ভয়ংকর ২৫ মার্চের পর কামালরা ওদের পাশের বাসায় লুকিয়ে ছিল। সেটি ইরফান নামে আমাদের আরেক বন্ধুর বাড়ি। কারফিউ ওঠার পর আমি সেখানে গিয়ে কামালকে বের করে নিয়ে আসি। এরপর দুজন ভিন্ন ভিন্ন দিক দিয়ে পালিয়ে যাই ভারতে।’

টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ হয়ে বিস্তর ঝামেলা পেরিয়ে ভারত গেলেন তান্না। বুকে জ্বলছে স্বাধীনতার আগুন, অস্ত্র হাতে দেশ শত্রুমুক্ত করার প্রতিজ্ঞায় শানিত হৃদয়। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও দেশের ওই ক্রান্তিকালে পালিয়ে থাকতে চাননি তান্না। ষষ্ঠ বেঙ্গল রেজিমেন্টে শাফায়াত জামিলের সঙ্গে যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে ছিলেন প্রবলভাবে। ওই সময়ই কলকাতা থেকে ডাক পড়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে ম্যানেজার হওয়ার।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ বিতর্কে ম্যানেজার তান্নার মত আলাদা গুরুত্ব পেতে বাধ্য, ‘আমি কলকাতা যেতে যেতে স্বাধীন বাংলা দল গঠন হয়ে গেছে। এ দল গঠন ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সে রাজনৈতিক যোগাযোগ প্যাটেল, লুৎফর চাচাদের ছিল। ওনারাই যে দল গঠন করেছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

বিভ্রান্তির জায়গা তৈরি হয়েছে অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরা ও সুভাষ চন্দ্র সাহার মতো কয়েকজনের কারণে। তাঁদের পক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন সম্ভব না বলে জোরালো মত তান্নার, ‘পিন্টু ভাই আমার মতো বালুরঘাটে ছিলেন। তাঁর দল গঠনের প্রশ্নই ওঠে না। লুৎফর চাচা-প্যাটেলদের মতো রাজনৈতিক যোগাযোগ আবার প্রতাপদা, সুভাষদের ছিল না। এখন তো কাউকে কাউকে এমনও বলতে শুনেছি, শেখ কামালের সঙ্গে ময়দানে বসে এ নিয়ে আলাপ করেছেন। সব ডাহা মিথ্যা কথা।’ তবে আলী ইমাম তাঁর জায়গা থেকে অমন এক চেষ্টা করছিলেন বলে মনে করতে পারেন তান্না, ‘ইমাম ভাই অল ইন্ডিয়া ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের অধীনে বাংলাদেশের ফুটবলারদের নিয়ে দল তৈরির একটি চেষ্টা হয়েছিল বলে শুনেছি। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। পরে প্যাটেল-লুৎফর চাচারা বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি করে ফেলেন। ওদের দাবিটাই তাই সঠিক।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল রাখে অনন্য ভূমিকা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেই দলে বয়ে যায় অন্তঃকোন্দলের চোরা স্রোত। এমন কিছু আঁচ নাকি আগেই করতে পারছিলেন তান্না, ‘পিন্টু ভাই, প্রতাপদাদের ভেতরে শুরু থেকেই বড় খেলোয়াড়, মোহামেডানের খেলোয়াড় হওয়ার অহমিকা কাজ করত। প্রথম থেকেই পলিটিকস করেন তাঁরা।’ যার জেরে দুই ম্যাচ পর দল ছেড়ে চলে যান প্যাটেল। আরেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অধিনায়ক বদল করার কথাও মনে করতে পারেন তান্না, ‘ওই গ্রুপিংয়ের কারণে আমাদের সেক্রেটারি লুৎফর চাচার ওপর হাত ওঠে পর্যন্ত। শাস্তি হিসেবে বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির পক্ষ থেকে পিন্টু ভাইয়ের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। শেষ তিন ম্যাচে আমাদের অধিনায়ক ছিলেন তাই আইনুল ভাই।’

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ১৬ ম্যাচের মধ্যে সর্বশেষটি ছিল বম্বেতে। তত দিনে স্বাধীনতার সৌরভ পাচ্ছে বাংলাদেশ। ফুটবল দলের কার্যক্রম সীমিত করে আনা হয় তাই। সিলেটে গিয়ে রণাঙ্গনের যুদ্ধে যোগ দেন তান্না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্বাধীন দেশে যখন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে কয়েকজনের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হতে দেখেন, রাগে গা রি রি করে ওঠে তাঁর, ‘এটি নিয়ে রাজনীতি করেছেন পিন্টু ভাই, প্রতাপদারা। টাকা-পয়সা চুরি থেকে এত রকম বদনাম হয়ে গেছে তাঁদের! আমাদের দলের অনেকে তো গরিব। ভীষণ ভীষণ গরিব। কিন্তু তাঁরা তো এখান থেকে ফায়দা লুটতে চান না। ওই দু-একজন ছাড়া এমন বাজে মানোভাব আর কারো নেই।’ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এ অবস্থা তান্নাকে তাই কষ্ট দেয় খুব, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে ঝগড়ার কী আছে, আমি বুঝি না। এটি ইতিহাস, যা কেউ বদলাতে পারবে না।’

স্বাধীনতার পর ফুটবল সেভাবে খেলেননি তান্না। বাস্কেটবল, হকি, ক্রিকেটসহ নানা খেলার মাঠে ছিলেন। সবচেয়ে বেশি ছিলেন সাংগঠনিকভাবে। শেখ কামালের সঙ্গে মিলে আবাহনী ক্লাব প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জেনারেল সেক্রেটারি, ভাইস প্রেসিডেন্ট হন পর্যন্ত। সফল তিনি ব্যক্তিজীবনেও। প্রাচুর্যের কমতি নেই। এক ছেলে এক মেয়ের জনক এখন নিজের ভাষায় কাটাচ্ছেন ‘সেমি রিটায়ারমেন্ট লাইফ’।

সেই জীবনে একাত্তর ফিরে ফিরে আসে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কোনো সদস্যের দুর্দশার খবর পান যখন, মনটা হু হু করে ওঠে তান্নার, ‘আইনুল ভাই কত কষ্ট করে মারা গেলেন! এখন তসলিম ভাইসহ কয়েকজনের কষ্টের কথা শুনি। সাধ্যমতো চেষ্টা করি আমরা কয়েকজন। কিন্তু রাষ্ট্রেরই তো উচিত তাঁদের দেখভাল করা। ১০০% রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’ সেই রাষ্ট্র এই দলকে স্বীকৃতি প্রদানের বেলায় উপেক্ষা করছে এত কাল, ভাবলে বিস্মিত হন তিনি, ‘১৯৭১ সালে আমরা যে কাজ করেছি, তাতে এই দলটির স্বাধীনতা পুরস্কার না পাওয়াটা বিস্ময়কর। আমি অনেকবার অনেক জায়গায় বলেছি। বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। আর কত বলব? দলটির মনোনয়ন বাফুফে থেকে পাঠানোর পরও আমাদের স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয় না—ভাবা যায়!’

তান্নার তাই মন খারাপ হয়। ভীষণ মন খারাপ। সেখানে সান্ত্বনার উপলক্ষ খোঁজেন এভাবে—রাষ্ট্র স্বীকৃতি না দিক, ইতিহাস তো তাঁকে মনে রাখবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার হিসেবেই!



মন্তব্য