kalerkantho


যা চেয়েছি, পেয়েছি তার চেয়েও বেশি

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



যা চেয়েছি, পেয়েছি তার চেয়েও বেশি

ঠিক বাবরি যাকে বলে, তা বলা যাবে না। ঝাঁকড়া কিন্তু সিল্কি চুল ফুঁড়ে উচ্ছল হাসিতে দেশীয় ফুটবল গ্ল্যামারের অনন্য ছবি হয়ে আছেন রুমী রিজভী করীম

শৈশবেই ফুটবলের সঙ্গে প্রেম। সে যুগের অনেকের মতো মনে মোহামেডান নিয়ে মাঠে আবাহনীর জার্সিতে প্রিয় ক্লাবের বুকে পেরেক ঠুকেছেন তিনিও। প্রায় দেড় যুগ আগে কানাডায় থিতু হওয়া রুমীর অতীত-বর্তমানের এমন অনেক অজানা গল্প জেনেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

প্রশ্ন : অন্য একটি প্রশ্ন প্রথম প্রশ্ন হবে বলে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর শুরুতেই জানতে ইচ্ছে করছে—আপনার সেই ঘাড় পর্যন্ত ঝোলানো ঝাঁকড়া চুল গেল কই?

রুমী রিজভী করীম : (হাসি) আপনি শুধু নন, যাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, সবাই প্রথমে এটি জানতে চাইছে। নতুন করে কারো সঙ্গে পরিচয় হলে তো কথাই নেই। এমনকি বেশ কয়েক বছর পর যেসব বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তাঁদেরও প্রথম প্রশ্ন এটি। চুল কই?

প্রশ্ন : কারণ বল পায়ে দৌড়ে যাওয়া লম্বা চুলের স্টাইলিশ ওই ফুটবলারের ছবিটাই তো সবার মনে গেঁথে আছে...

রুমী : তা আমি বুঝি। আর ওই যে বললাম, অনেক দিন পর যাঁদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তাঁরাও বুঝিয়ে দিচ্ছে (হাসি)। আসলে দেশ থেকে কানাডা যাওয়ার পর থেকে চুল পড়া শুরু করে।

ওখানকার আবহাওয়া একেবারে অন্য রকম। খুব ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডা-গরম পানি মিশিয়ে গোসল করতে হয়। হয়তো সে কারণে চুল পড়ে গেছে দ্রুত। মামুন জোয়ারদারের তো আরো খারাপ অবস্থা। ও-ও কানাডায় থাকে। আমার চেয়ে ওর মাথায় চুল এখন কম।

প্রশ্ন : ট্রেডমার্ক ওই চুল নিশ্চয়ই মিস করেন?

রুমী : অবশ্যই। যারা লম্বা চুল রাখে, তাদের কাছে এটি খুব প্রিয়। আপনারও দেখছি লম্বা চুল, ব্যাপারটা তাই ভালো বুঝবেন। আর আমার ট্রেডমার্কই ছিল ওই চুল। পুরনো দিনের ছবি দেখলে খুব আফসোস হয়। কিছু দিন আগে আমার ছেলে আফসোসটা বাড়িয়ে দেয় আরো।

প্রশ্ন : কিভাবে?

রুমী : ও কিভাবে কিভাবে যেন খুঁজে ইউটিউব থেকে পুরনো এক খেলা বের করল। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে জাপানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচ। সেখানে ১-৪ গোলে হারি। কিন্তু বাংলাদেশের একমাত্র গোলটি দিই আমি। ওই ভিডিওতে লম্বা চুলের আমাকে দেখে সত্যি মন খারাপ হয়েছে। অন্যগুলো তো ছবি, কিন্তু সেটি ভিডিও। গোলের পর লাফ দিলাম, বাতাসে চুল উড়ছে—উফ্, দারুণ দিন ছিল।

প্রশ্ন : চুলের নাকি যত্নও করতেন খুব? সম্ভবত শেখ মোহাম্মদ আসলাম কোথাও বলেছিলেন কথাটা।

রুমী : ওই রকম না। তবে বড় চুল একটু গুছিয়ে রাখতেই হতো। আর এ জন্য মেয়ে ভক্তদের প্রচুর চিঠিও পেতাম। এখন যেমন সবাই প্রথম প্রশ্ন করে, চুল গেল কোথায়—তখন অনেক প্রেমপত্রের শুরু হতো আমার চুলের প্রশংসা দিয়ে। মজাই লাগত। আমার স্ত্রী, ভাই-বোনরা মিলে এ নিয়ে হাসাহাসি করেছি খুব।

প্রশ্ন : গোঁফও ছিল আপনার। সেটি তো ফেলে দিয়েছেন খেলোয়াড়ি জীবনেই?

রুমী : সে এক মজার ঘটনা। ১৯৯৩ সাফ গেমসের আগে জাতীয় দলের অনুশীলন চলছিল ওল্ডরিখ সোয়াবের অধীনে। আমরা মালয়েশিয়া যাই প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলার জন্য। খুব কঠিন প্রতিপক্ষ। ওদের সঙ্গে জিতব না ধরেই নিয়েছি। ম্যাচের আগে আমি, মুনসহ তিন-চারজন বললাম, আজ জিততে পারলে গোঁফ ফেলে দেব। সত্যি সত্যিই জিতে যাই। কী আর করা! খেলার পর ওই কয়েকজন ফেলে দিই গোঁফ। এরপর ডাইনিংয়ে যাওয়ার পর আমাদের নিয়ে সবার খুব হাসাহাসি। দেশে ফেরার পরও একই অবস্থা। তবে ওই যে গোঁফ ফেলে দিলাম, এরপর সব সময় ক্লিন শেভড থাকতাম।

প্রশ্ন : বড় চুল, পোশাকেও সব সময় টিপটপ। একই রকমভাবে খুব স্টাইলিস্ট ফুটবলারও ছিলেন আপনি। পেছন ফিরে তাকালে এখন কী মনে হয়, জীবনযাপনের ওই স্টাইলের প্রতিফলন আপনার ফুটবলেও পড়েছিল? হয়তো?

রুমী : (খানিকক্ষণ ভেবে) এভাবে ভাবিনি কখনো। তবে আপনি প্রশ্নটি করার পর মনে হচ্ছে, এমনটা হতে পারে। আমি এমনিতেই খুব ফিটফাট। শার্ট-প্যান্ট, জুতা খুব পছন্দ করে কিনি সব সময়। সেটি বেশি দামি নাকি কম দামি—তা নিয়ে ভাবিনি। গুরুত্ব দিই পছন্দ। আর আমি যে স্টাইলিস্ট ফুটবলার, তা ঢাকায় আসার পর শুনেছি। সাংবাদিকরা বলতেন, কোচরা বলতেন। এই পুরো ব্যাপারটাই সহজাত, এ জন্য আলাদা করে অনুশীলন করতে হয়নি। তবে হ্যাঁ, চুল-পোশাকের স্টাইলের ব্যাপারটির প্রভাব ফুটবলে থাকতে পারে। থাকা সম্ভব। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, ব্যক্তিজীবনে আমি খুব ভদ্র। কখনো কারো সঙ্গে বেয়াদবি করিনি। হয়তো মনের ভেতর কাজ করত যে, ফুটবলটাও পরিচ্ছন্নভাবে খেলতে হবে। স্টাইলটা ওখান থেকেও তৈরি হতে পারে।

প্রশ্ন : হ্যাঁ, ঢাকার মাঠে পরিচ্ছন্ন ফুটবলার হিসেবে সুনাম ছিল আপনার। রেফারি আপনাকে কখনো লাল কার্ড দেখিয়েছেন বলে তো মনে পড়ছে না?

রুমী : লাল কার্ডের প্রশ্নই ওঠে না। হলুদ কার্ডও যত দূর মনে পড়ে একবার দেখেছিলাম। আমি সেভাবে ফাউল করিনি, তা কার্ড হওয়ার কথা নয়। কিন্তু রেফারি আজিজ ভাই হলুদ কার্ড দেখিয়ে দেন। মনে আছে, ওনাকে গিয়ে বলেছিলাম, ‘আমাকে কার্ডটি না দিলে হতো না? ঢাকার মাঠে কখনো আমাকে কেউ কার্ড দেখাননি। ’ আজিজ ভাই দুঃখটি বোঝেন। কিন্তু ততক্ষণে তো কার্ড দেখিয়ে ফেলেছেন। ফেরত নেওয়ার উপায় নেই।

প্রশ্ন : ১৯৯৩ সালে আপনি ছিলেন আবাহনীর অধিনায়ক, সাব্বির মোহামেডানের। দারুণ স্টাইলিস্ট দুই ফুটবলার। পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘ক্রীড়ালোক’-এ আপনাদের দুজনের ছবি দিয়ে কাভার করেছিল, ভেতরে পোস্টার ছেপেছিল—মনে আছে?

রুমী : আরে বলেন কী, মনে থাকবে না! আমার কাছে সেই ম্যাগাজিনের কপি আছে এখনো। বড় করে শিরোনাম, ‘দুই বন্ধু দুই শত্রু’। ভেতরে আমাদের অনেক ছবি। ছবি তোলা হয় ঢাকা স্টেডিয়ামে। আমরা যে পোশাক পরিবর্তন করছি, সে ছবি পর্যন্ত ছাপা হয় (হাসি)। মাঠের বাইরে সাব্বির আর আমি আসলেই খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু খেলা শুরু হলে এসব কিছু মনে থাকে না। তখন ধ্যানজ্ঞান একটাই—নিজ দলকে জেতাতে হবে। মোহামেডানের বিপক্ষে ম্যাচ হলে জান দিয়ে খেলতাম সবাই। যদিও ছোটবেলায় কিন্তু মোহামেডানের পাঁড় সমর্থক ছিলাম।

প্রশ্ন : বলেন কী! তখন আবাহনীর সমর্থকরা জানলে তো খবর ছিল...

রুমী : আমি কিন্তু কখনো কাউকে এটি বলিনি। নাহ্, একবার সম্ভবত এক সাক্ষাতকারে বলেছিলাম। সব কিছু মিলে গেলে মোহামেডানে খেলতে চাই—এমনটাও বলি। কিন্তু কোনো কারণে সব কিছু কখনো মেলেনি।

প্রশ্ন : প্রস্তাব নিশ্চয়ই পেয়েছেন?

রুমী : বেশ কয়েকবার। নাসের হেজাজির সময় একবার কথা হলো। সম্ভবত ১৯৮৯ সালের ইসলামাবাদ সাফ গেমসের সময়। ও তখন জাতীয় দলের কোচ। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষে বলল, ‘এখন আমি ও তোমাকে নিয়ে আসলে অনেক কথাবার্তা হবে। সবাই বলবে, জাতীয় দলের কোচের প্রভাব খাটিয়ে মোহামেডানে তোমাকে নিয়ে এসেছি। যদি কর্মকর্তা পর্যায়ে কথাবার্তা হয়, তাহলে আসতে পারো। ’ সেবার তা হয়নি তবে পরে একবার প্রায় হয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : তাহলে এলেন না কেন?

রুমী : ওরা যদি দুই-তিন লাখ টাকা বেশি দিত, তাহলে চলে যেতাম।

প্রশ্ন : ঘটনাটি যদি একটু খুলে বলেন...

রুমী : সম্ভবত ১৯৯১-৯২ সাল। লুত্ফর রহমান বাদলের বাসায় আমার মিটিং হয় মোহামেডানের সালাম ভাই ও আনোয়ারুল হক হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে। আমি ২০ লাখের মতো চেয়েছি; পুরো টাকাটা ক্যাশ। মোহামেডান ১৭ লাখ পর্যন্ত দিতে রাজি। এখানেই ওদের সঙ্গে মিলল না। এই দুই-তিন লাখ টাকা বেশি দিলে আমি মোহামেডানে চলে যেতাম।

প্রশ্ন : পরে আবাহনীতে খেলেন কত টাকায়?

রুমী : একটু কম, ১৫-১৬ লাখ টাকার মতো। দুই-এক লাখ টাকার জন্য আর দলবদল করিনি। তবে ওই সময় দলবদল ঘিরে কী যে হতো! সমর্থকরা ক্লাবের ভেতর আমাদের তালা পর্যন্ত দিয়ে রাখত। গোলরক্ষক মহসিন ভাই একবার কী করেছিলেন, শুনুন। লুঙ্গি পরে আবাহনী ক্লাবের দেয়াল টপকে দিলেন দৌড়। পেছন পেছনে শত শত সমর্থক দৌড়াচ্ছে। ওরা ভেবেছে, আবাহনী থেকে পালিয়ে উনি মোহামেডানে যাচ্ছেন। পরে মহসিন ভাই দৌড় থামিয়ে বললেন, ‘আমি তো দুষ্টামি করছি’। তো মোহামেডানের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর আবাহনী ক্লাবে এসে সমর্থকদের আমার মিথ্যা বলতে হয়েছে। ওদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, এটি তো আর বলা যায় না। বলেছি, এক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : এবার একেবারে শুরুর কথা জানতে চাই। ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় কিভাবে?

রুমী : তখন পুরো দেশেই ফুটবল। বলে লাথি মারতে মারতে আমি ফুটবলের প্রেমে পড়ে যাই। মোহামেডানেরও। দারা ভাই সিনিয়র ফুটবলার; আমার ফুটবলের গুরু। উনার আব্বা আর আমার আব্বা দুজনেই খুলনা বিএল কলেজের শিক্ষক। পাশাপাশি বাসা। দারা ভাইয়ের বড় ভাই ছিলেন মোহামেডানের সমর্থক। আমি সেই দলে। দারা ভাই আবাহনীর সমর্থক। মনে আছে, মোহামডোন-আবাহনী খেলার দিন কারা কত বড় পতাকা ওড়াতে পারে, এ নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো। মোহামেডান হেরে গেলে চুপিচুপি পতাকা নামিয়ে কয়েক দিন লুকিয়ে থাকতাম। আর জিতলে দারা ভাই এবং আবাহনীর অন্য সমর্থকদের খুঁজে বের করে খেপাতাম খুব। তখন ফুটবল ছাড়া জীবনে আর কিছু নেই।

প্রশ্ন : বাবা-মা কিছু বলতেন না?

রুমী : আব্বা মোহাম্মদ বজলুল করীম খুলনা বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক। উনি খেলাধুলা এমনিতে পছন্দ করতেন। কিন্তু যখন দেখলেন, ফুটবল নিয়ে সারা দিন পড়ে আছি, ব্যাপারটা পছন্দ করতেন না। আমাকে সেভাবে কিছু বলেননি। তবে মা লায়লা আরজুমান্দকে বলতেন। আমরা তিন ভাই-বোন। ভাই আমার বড়, বোন ছোট। আর আমি তো খুলনার প্রথম বিভাগেই খেলা শুরু করি ল্যাবরেটরি স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়।

প্রশ্ন : ম্যাট্রিকের আগেই!

রুমী : হ্যাঁ। খুলনার দৌলতপুরে বিএল কলেজের ভেতরে থাকতাম আমরা। ওখানে এক টুর্নামেন্ট খেলতে ঢাকা থেকে সালাম ভাই, আসলাম ভাই, এমিলি ভাইদের মতো সুপারস্টাররা আসেন। আমি তখন এইটুকুন ছেলে, ক্লাস টেনে পড়ি। দৌলতপুর বাজার খেলেছিলাম। টুর্নামেন্টের এক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করি। সোনালী জুট মিলের কর্মকর্তা কালু ভাই দেখেন ম্যাচটি। উনি সেখান থেকে ধরে নিয়ে যান ক্লাবে। পরের মৌসুমে খেলার জন্য সই করান। সঙ্গে অবশ্য দারা ভাই ছিলেন। এই তো ক্লাস টেনে উঠেই খুলনার প্রথম বিভাগে খেলা শুরু।

প্রশ্ন : শুরুটা কেমন ছিল?

রুমী : প্রথম বছরই আমি লিগের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। এটি ১৯৮৩ সালের কথা। পরের বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে চলে আসি ঢাকায়।

প্রশ্ন : শিক্ষক বাবাকে বোঝানোর কাজটি নিশ্চয়ই সহজ হয়নি?

রুমী : খুব কঠিন। কিন্তু উনি তত দিনে বুঝে গেছেন, আমি ফুটবল নিয়েই থাকব। ঢাকার সাধারণ বীমা ক্লাবের কাশেম ভাইয়ের প্রস্তাবে ঢাকা চলে আসি। পরে বিএল কলেজে নাম লেখাই ঠিকই, কিন্তু সেভাবে আর পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন : ঢাকার শুরুও কি খুলনার মতো ঝলমলে?

রুমী : একেবারেই না। প্রথম বছর লিগে সাধারণ বীমার কোনো ম্যাচেই ছিলাম না প্রথম একাদশে। লিগ শেষে মন খারাপ করে খুলনা চলে যাই। ওই বছর প্রথম চালু হয় ডামফা কাপ। ক্লাব থেকে খবর পাঠানো হয়। এই টুর্নামেন্ট হয়ে যায় আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। ওয়ারী ক্লাবের বিখ্যাত জুটি রাজকুমার-এমিলির একজন রাজদা তখন সাধারণ বীমায়। ডামফা কাপের প্রথম ম্যাচে উনি ইনজুরিতে পড়েন। দ্বিতীয় খেলায় আমার তাই প্রথম একাদশে সুযোগ হয় প্রথমবারের মতো। আজাদ স্পোর্টিংয়ের বিপক্ষে করি হ্যাটট্রিক। ব্রাদার্সের বিপক্ষে পরের ম্যাচে দুই গোল। মোহামেডানের বিপক্ষে আরেক গোল। ছয় গোল করে ব্রাদার্সের লিটন ভাইয়ের সঙ্গে ডামফা কাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আমি। এরপর আমাকে আর কেউ আটকাতে পারেনি।

প্রশ্ন : সাধারণ বীমায় ছিলেন কয় মৌসুম?

রুমী : তখন নতুন খেলোয়াড়দের বাউন্ডিংসের নিয়ম ছিল। তিন বছর এক ক্লাবে খেলতে হয়। আমি ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬ মৌসুমে খেললাম। পরে সাধারণ বীমা আমাকে অধিনায়কত্বের প্রস্তাব করে। কিন্তু আমার ফুটবল গুরু দারা ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ জসিম ভাই ছিলেন বিআরটিসি ক্লাবের কর্মকর্তা। ওখান থেকে প্রস্তাব আসার পর ক্লাব বদলাই ১৯৮৭ সালে। টাকার অঙ্কটাও ভালো ছিল। দেড় লাখের মতো।

প্রশ্ন : এর আগে কত পেয়েছেন?

রুমী : খুলনার মিলে তো সাপ্তাহিক বেতন দিত। দেড় শ, পৌনে দুই শ টাকার মতো। ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্রের জন্য অনেক টাকা। ঢাকায় প্রথম তিন বছর বাইন্ডিংসে টাকা দিত কেবল হাত খরচের। খুব একটা না। বিআরটিসিতেই প্রথম পেশাদার চুক্তি বলতে পারেন।

প্রশ্ন : এক মৌসুম পর আবাহনীতে। ওখানে খেলার প্রস্তাব পান কিভাবে?

রুমী : ফেডারেশন কাপে প্রথম রাউন্ডে আবাহনীকে বিদায় করে দিয়ে। বিআরটিসি ম্যাচ জেতে ২-১ গোলে; আমি এক গোল করি, অন্যটি করাই। এর পর থেকেই আবাহনী পেছনে লেগে ছিল। প্রফেসর শাহ আলম, মনজুর কাদেরের মতো কর্মকর্তারা একবার আমাকে নিয়ে যান বাদল রহমানের বাসায়। ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ সিনেমার পরিচালক এই বাদল রহমান, উনিও কিভাবে যেন আবাহনীর সঙ্গে জড়িত। যাই হোক, তাঁর বাসায় গিয়ে চূড়ান্ত কথা হয়। তবে সত্যি বলতে কী, ১৯৮৮ সালে আবাহনীতে যাওয়ার সময় আমার কাছের অনেক মানুষ মানা করেছিলেন।

প্রশ্ন : কেন?

রুমী : আবাহনীর ফরোয়ার্ড লাইনে তখন ওয়াসিম ভাই, আসলাম ভাই, প্রেমলাল। তাঁদের বাদ দিয়ে আমাকে কেন খেলাবে—এই ছিল প্রশ্ন। ব্যাপারটি বুঝতাম। তবে এত বড় ক্লাব আমাকে চায়, এই প্রস্তাব ফেরাতে পারিনি। নিয়মিত খেলতে পারব না, এটি জেনেও আবাহনীতে চলে আসি।

প্রশ্ন : নিয়মিত খেলতে পেরেছিলেন?

রুমী : নাহ্। প্র্যাকটিসে প্র্যাকটিসে দিন কাটে। সাধারণ বীমা ক্লাবে প্রথম মৌসুম যেমন কেটেছে, ঠিক তেমন। ওখানে লিগ শেষে ডামফা কাপ দিয়ে নজর কাড়ি। আবাহনীর হয়ে লিগের পর ইতালির এক ক্লাবের বিপক্ষে প্রদর্শনী ম্যাচে। ওদের বিপক্ষে গোল করি। পরে ক্লাবটি খুলনায় গিয়ে খেলে জেলা দলের বিপক্ষে। সেখানেও আমার গোল। এরপর ১৯৮৯ প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপেও তাই। বাংলাদেশ লাল দলের স্কোয়াডে থাকলেও প্রথম ম্যাচে একাদশে নেই। বড় কামাল ভাই ব্যথা পাওয়ার পর দ্বিতীয় খেলায় মাঠে নামি। এরপর ফাইনাল পর্যন্ত খেলি টানা। আমার ব্যাপারটাই কেন যেন এমন! প্রথম মৌসুম, প্রথম ম্যাচে খুব ভালো করতে পারিনি। এরপর লিগ শেষে এক টুর্নামেন্ট বা এক ম্যাচে ভালো খেলেছি। সাধারণ বীমা, আবাহনী কিংবা প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ দেখুন—সব জায়গায় একই অবস্থা।

প্রশ্ন : আবাহনীতে টানা খেলার পর মুক্তিযোদ্ধায়। ওখানে যাওয়ার প্রেক্ষাপটটা যদি একটু বলেন?

রুমী : সবাই তো জানেনই। আবাহনী, মোহামেডান, ব্রাদার্স তিন ক্লাব মিলে ‘জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট’ করে। কেউ কারো খেলোয়াড় নেবে না, আবার আমাদের পারিশ্রমিকও নির্দিষ্ট করা। তখন আমরা অনেকে মিলে এর বিপক্ষে অবস্থান নিলাম। অনেকে অবশ্য কথা দিয়েও কথা রাখেনি। কায়সার হামিদ, সাব্বিররা যেমন বলেছিল মুক্তিযোদ্ধায় যাবে। পরে যায়নি।

প্রশ্ন : মোনেম মুন্না?

রুমী : মুন্না ভাই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলেন না। উনি কখনোই বলেননি যে মুক্তিযোদ্ধায় যাবেন।

প্রশ্ন : অনেক বিশ্লেষকের মত, বাংলাদেশ ফুটবলের মান ও জনপ্রিয়তা ধসের অন্যতম কারণ আবাহনী-মোহামেডান ভেঙে যাওয়া। কী বলবেন?

রুমী : এটুকু বলতে পারি, আমরা তা করতে একরকম বাধ্য হয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, ওই যে পুল করে ফুটবলারদের জিম্মি করতে চেয়েছে বড় ক্লাবগুলো—এখান থেকে ফুটবলের পতনের শুরু। কারণ এতে ফুটবলারদের প্রেরণাটা আগের মতো থাকে না। আরেকটি কারণ ‘এক খেলোয়াড় এক লিগ’ নীতি। আমি নিজেই ক্লাস সিক্স-সেভেনে থাকতে খুলনা লিগে গিয়ে ঢাকার সুপারস্টারদের খেলা দেখেছি। পরে ওই নীতি হওয়ায় ঢাকার খেলোয়াড় আসা তো বন্ধ হলোই। সঙ্গে খুলনার সেরা খেলোয়াড়রাও ঢাকা লিগে খেলে। তারাও আর খুলনা লিগে খেলতে পারল না। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট সব জায়গায় এক অবস্থা। ফলে কম মানের ফুটবলারদের খেলা দেখতে স্থানীয় পর্যায়ে দর্শক আগ্রহী হলো না। ফুটবলের সামগ্রিক পতনের আরেক কারণ এটিও।

প্রশ্ন : মুক্তিযোদ্ধার পরে তো আপনি আবার আবাহনীতে ফেরেন?

রুমী : দুই মৌসুম খেলি মুক্তিযোদ্ধায়। দ্বিতীয় মৌসুমে কোরিয়ান কোচ ম্যান ইয়াং ক্যাংয়ের সঙ্গে কিছু ঝামেলা হয়। আমাকে নিয়মিত খেলাননি। সতীর্থদের কিছু গ্রুপিংয়ের শিকার হই। মুক্তিযোদ্ধার কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও ভালো আচরণ পাইনি। পরে ফিরে আসি আবাহনীতে। ওখানে এক মৌসুম খেলার পর তো চলেই যাই কানাডায়। দারা ভাই সেখানে, উনি বললেন চলে যেতে। তত দিনে নানা কারণে ফুটবলের ওপর বেশ অভিমান জমে যায়। চলে যাই তাই, তবে অনেকটা গোপনে। পুশকিন ভাই, মুন্না ভাইয়ের মতো কাছের কয়েকজন কেবল জানতেন।

প্রশ্ন : মুন্নার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা শুনেছি দারুণ ছিল...

রুমী : দলবদল শেষে ক্যাম্পে যোগ দিতে প্রথম আবাহনী ক্লাবে ঢুকি ১৬ আগস্ট, ১৯৮৮। দেখি এক দিকে জুম্মন লুসাই দাদা বসে আছেন। উনি বলেন, ‘আসো আসো। তুমি মুন্নার রুমে উঠে যাও। ’ বলে লাগেজ নিয়ে মুন্না ভাইয়ের রুমে ঢুকিয়ে দেন। আসলাম ভাইয়ের ছোট ভাই আকরামও ছিল ওই রুমে। এরপর আবাহনী ক্লাব কিংবা জাতীয় দল—সব জায়গাতেই আমি আর মুন্না ভাই দুজন থেকেছি একই রুমে। ছোট ভাইয়ের মতো, বন্ধুর মতো আমাকে সব সময় গাইড করতেন উনি।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গলেও খেলেছেন একসঙ্গে?

রুমী : ওখানেও আমরা এক রুমে। ফেনীতে আজমেরি বেগম গোল্ডকাপ নামে একটি টুর্নামেন্ট হয় ১৯৯১ সালে সম্ভবত। সেখানে ফাইনালে ওঠে ঢাকা আবাহনী ও কলকাতা মোহনবাগান। ফাইনালের আগে চুন্নু ভাই বলেন, ‘আজ গোল করতে পারলে তোমাকে অ্যাডিডাসের একজোড়া বুট দেব। সঙ্গে আরেকটি সুখবর। ’ সেদিন গোল করতে পারিনি তবে খুব ভালো খেলি আর দলও জেতে। চুন্নু ভাই আমাকে অ্যাডিডাসের বুট দেন। আর বলেন, কলকাতার ইস্টবেঙ্গল আমাকে, মুন্না ভাইকে ও আসলাম ভাইকে দলে চায়।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে এখনো মুন্নার মর্যাদা কিংবদন্তিতুল্য। কিন্তু আপনারা বাকি দুজন খুব একটা ভালো খেলতে পারেননি। কেন?

রুমী : কী যে অমানুষিক গরম ওখানে! তার ওপর খেলা হতো দুপুরে; আর ওদের জার্সিটাও ছিল বেশ মোটা। আমার একেবারে কাহিল অবস্থা। আরেকটি ব্যাপার হলো, আমাদের নিয়ে ইস্টবেঙ্গলের কলকাতার ফুটবলাররা খুব ঈর্ষাকাতর ছিল। পাস-টাস তেমন একটা দেয়নি।

প্রশ্ন : অথচ এসব সত্ত্বেও মোনেম মুন্না অসাধারণ খেলেন। যা এখনো রয়ে গেছে কলকাতার দর্শকদের স্মৃতিতে?

রুমী : মুন্না ভাই ভিন্ন পর্যায়ের ফুটবলার। ফিটনেস খুব ভালো। আর আমরা দেখেছি তো, সত্যি উনি কী অসাধারণ খেলেছেন! আমি আর আসলাম ভাই পুরো মৌসুম খেলতে পারিনি। চলে আসি মাঝপথে। তবে কলকাতার মিডিয়া আমাদের খুব কাভারেজ দেয়। ক্লাবে সারাক্ষণ এসে সাক্ষাতকার চাইত। বিরক্ত হয়ে আমরা তিনজন মিলে এক শয়তানি করেছিলাম। সম্ভবত ‘বর্তমান’ পত্রিকার সাংবাদিক আসেন সাক্ষাতকার নিতে। তাঁকে বলি, ‘বাংলাদেশে আমাদের বিশাল ব্যবসা। অনেক টাকা। ওখানে সিনেমায় অভিনয় করি। ফুটবলের বাইরে শ্যুটিং নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। ’ মজা করে চাপাবাজি করছিলাম ওদের ভাগানোর জন্য। পরদিন দেখি, ওসব ঠিকই ছাপা হয়ে যায়।

প্রশ্ন : সমসাময়িকদের মধ্যে আপনার চোখে সেরা ডিফেন্ডার তাহলে মুন্নাই?

রুমী : মুন্না ভাই আর আমি ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় একসঙ্গে খেলেছি। ওনাকে তাই খেলোয়াড়ের দৃষ্টিকোণ থেকে সেভাবে বিচার করতে পারব না। সেদিক থেকে বললে সেরা অবশ্যই কায়সার হামিদ। সত্যি বলছি, তাঁকে আমার কখনো কখনো মুন্না ভাইয়ের চেয়েও ভালো মনে হয়েছে। কী যে ঠাণ্ডা মাথার ফুটবলার! একটা উদাহরণ দিলে বুঝবেন। আবাহনী-মোহামেডানের লড়াইয়ের ওই উত্তপ্ত সময়েও ম্যাচের মধ্যে কায়সার ভাই আমাকে বলছেন, ‘আরে রাখো ফুটবল ম্যাচ, আসো গল্প করি। ’ এটি কিন্তু কায়সার ভাইয়ের কৌশল না, উনার ধরনটাই এমন। এতটাই ঠাণ্ডা মাথার। সে কারণে আমি কায়সার ভাইকে সেরা বলব।

প্রশ্ন : মাঝমাঠের সেরা?

রুমী : আমি তো উইথড্রয়াল মিডফিল্ডারের রোলে খেলতাম। মাঝমাঠের প্লে-মেকারদের মধ্যে ওয়াসিম ভাই, সাব্বির সেরা।

প্রশ্ন : সেরা স্ট্রাইকার?

রুমী : সালাউদ্দিন ভাই আমার সব সময়ের প্রিয়। কিন্তু ওনার খেলা তো সেভাবে দেখার সুযোগ হয়নি। আমাদের সময়ের স্ট্রাইকারদের মধ্যে সেরা বলব আসলাম ভাইকেই।

প্রশ্ন : বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে?

রুমী : জুকভ, সামির শাকির, করিম মোহাম্মদ, আলেক্সিস, ভিজেন তাহিরি, নালজেগার, এমেকা। এঁদের মধ্যে আলাদা করতে হলে বলব জুকভ ও করিম মোহাম্মদের কথা।

প্রশ্ন : সেরা কোচ?

রুমী : সালাউদ্দিন ভাই ভালো কোচ। নাসের হেজাজিও।

প্রশ্ন : আপনার স্মরণীয় কয়েকটি ম্যাচ ও গোলের স্মৃতি যদি ভাগাভাগি করেন?

রুমী : ওই যে শুরুর দিকে বলছিলাম, জাপানের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের গোলটির কথা। তা খুব স্মরণীয়। দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে বল নিয়ে গিয়ে প্লেসিং শটে গোল করি। লিগে আবাহনীর হয়ে রহমতগঞ্জের বিপক্ষে দুটি গোলের কথাও ভুলব না। বাঁ-দিক থেকে গাউসের ক্রস এক ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে আমার কাছে আসে। তা মাটিতে পড়তে না দিয়ে উড়ন্ত বলকে ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে আবার অন্যদিকে নিয়ে যাই। এরপর এদিকেও বল মাটিতে পড়ার আগে বক্সের বাইরে থেকে ভলিতে গোল। পরের গোলটিও ভলিতে। পুরনো দিনের দর্শকরা এই ম্যাচটির কথা অবশ্যই মনে করতে পারবেন। আর মোহামেডানের বিপক্ষে আবাহনীর জার্সি পরে প্রথম ম্যাচেই করি দুই গোল। আসলাম ভাই, ওয়াসিম ভাই ছিলেন না ইনজুরির কারণে। আবাহনীর সমর্থকরা ভেবেছে, হেরেই যাবে। আমার দুই গোলে দল জেতে। আর মোহামেডানের বিপক্ষে সব সময় ভালো খেলতাম। ওদের সামনে পেলে আমি অন্য রুমী হয়ে যেতাম—এমন একটি কথাও ঢাকার ফুটবলে ছিল।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের কথা তো সেভাবে জানা হলো না?

রুমী : ১৯৮৮ সালে আবুধাবিতে এশিয়ান কাপেই সম্ভবত প্রথম খেলি। পরে তিনটি সাফ গেমসে। ১৯৯১ সালে কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে জয়ে গোল আছে। ও হ্যাঁ, স্মরণীয় ম্যাচ ও গোলের মধ্যে এটিকেও রাখুন। তবে আক্ষেপের বড় এক জায়গা ১৯৯৩ সাফ গেমস। দুর্দান্ত দল আমাদের, প্রস্তুতিও খুব ভালো। নিজেদের দেশে সেবার স্বর্ণপদক জেতার কথা। কিন্তু কেন যেন আমরা পারিনি।

প্রশ্ন : একটু পরিবারের কথা জানতে চাই। বিয়ে করেন কবে?

রুমী : ১৯৯৪ সালে। স্ত্রীর নাম শামীমা শিমু। আবাহনী ক্লাবে ঢোকার কিছু দিন পর খুলনা থেকে ঢাকা আসছিলাম বাসে। শিমু ওর বাবা-মাসহ একই বাসে ওঠে যশোর থেকে। ওই যাত্রাপথে পরিচয়। পরে পারিবারিক পর্যায়ে কথাবার্তাতে বিয়ে হয়।

প্রশ্ন : কানাডায় রয়েছেন কত বছর?

রুমী : ১৯৯৯ থেকে। শুরুতে একা যাই। পরে নিয়ে যাই বউ-বাচ্চা। ওখানে স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা শুরুতে ছিল না। পরে একমাত্র ছেলে রিয়ান রিয়াসাত করীমের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে থেকে যাই।

প্রশ্ন : আপনার ছেলেও নাকি খুব ভালো ফুটবল খেলে?

রুমী : হ্যাঁ। এবার দেশে ফিরলাম আড়াই বছর পর। যশোরে ওর নানাবাড়িতে গিয়েছিলাম। ওখানে এখন কোচ হয়ে যাওয়া পুরনো ফুটবলার সাথী ভাইয়ের সঙ্গে কয়েক দিন প্র্যাকটিস করেছে রিয়ান। উনি আমাকে বললেন, ‘ছেলের খেলা তো একেবারে তোমার কপি। ’ ও নিজেও ফুটবলে খুব আগ্রহী। মেজর লিগ সকারে টরেন্টোর দল রয়েছে। তবে সে পর্যায়ে যাওয়া কঠিন। আবার পরের পর্যায়গুলোতে ফুটবল সেভাবে নেই। আমার ছেলের তাই ইচ্ছা আছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে খেলার। এখনকার জাতীয় দলের অধিনায়ক মামুনুলের সঙ্গে ফেসবুকে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ও-ও রিয়ানকে খুব উৎসাহিত করে। তবে আমার এখনই ইচ্ছা নেই। দেখি সামনে হয়তো ফুটবল খেলতে ওকে বাংলাদেশে পাঠাতে পারি।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

রুমী : এক কথায় বললে, আমি সত্যি খুব খুশি। ফুটবলার হিসেবে যা চেয়েছি, পেয়েছি তার চেয়েও বেশি। দেশে ফিরলে সমর্থকরা চেনার পর যে সম্মান করে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমার আব্বা-আম্মা খুলনায় থাকেন। কেউ যখন জানেন তাঁরা রুমীর আব্বা-আম্মা, খুব খাতির করেন। এই ভালোবাসা তো ফুটবলের কারণেই। দেশের বাইরে থাকায় বাংলাদেশকে খুব মিস করি। এখানে শেষ আরেকটি কথা বলি। শুরুতেই বলেছিলাম, আব্বা চাননি আমি ফুটবলার হই। কিন্তু যখন আমি ফুটবলার হয়ে যাই, আবাহনীতে খেলি, জাতীয় দলে খেলি—উনি গর্বিত হন খুব। আমাকে নিয়ে পেপারে যত লেখা হয়েছে, সব পেপার কাটিং আব্বার কাছে রয়েছে। ওগুলো দিয়ে সামনে উনি একটি বই বের করবেন। এই যে আপনাদের সাক্ষাতকার দিচ্ছি, এটিও বইতে থাকবে। আব্বার যে আমাকে নিয়ে এত গর্ব, এটি ভাবলেও ভালো লাগে খুব।


মন্তব্য