kalerkantho


‘ডিজিটাল ময়নাতদন্ত’ পিবিআইয়ের ল্যাবে

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘ডিজিটাল ময়নাতদন্ত’ পিবিআইয়ের ল্যাবে

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরন। ইদানীং সাইবার অপরাধসহ ডিজিটাল পদ্ধতিতে অপরাধের মাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনকহারে। আবার অপরাধী অপরাধ সংগঠনের পরপরই নিজের ডিভাইস থেকে তথ্যও মুছে দিচ্ছে। যাতে পরবর্তীতে অপরাধ আড়াল করা যায়। এ অবস্থায় অপরাধ প্রমাণে

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়। বেশির ভাগ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্থাপিত ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের প্রতিবেদনের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। ওই সুযোগে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার সুযোগও পেয়ে যায় অপরাধীরা।

ডিজিটাল অপরাধ তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের এমন দুর্ভোগ আর থাকছে না। দেশের সব বিভাগীয় শহরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পর্যায়ক্রমে চালু করছে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব। প্রাথমিক পর্যায়ে পিবিআই ঢাকার সদর দপ্তরে প্রধান ল্যাব চালু করা হয়েছে। গতকাল বুধবার থেকে চট্টগ্রাম কার্যালয়ে ল্যাব চালু হয়। রংপুরেও শিগগিরই চালু হবে। বাকি বিভাগীয় শহরগুলোর পিবিআই কর্মকর্তাদের ট্রেনিং দেওয়ার পরপরই ডিজিটাল ল্যাব চালু করা হবে।

পিবিআইয়ের বিভাগীয় শহরের কার্যালয়ে এ ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ পাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সব ইউনিটও। ফলে দেশের মাঠপর্যায়ের থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডি কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য ইউনিটগুলোকে এখন থেকে আর ঢাকার কেন্দ্রীয় ল্যাবের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। দ্রুততার সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তারাই ল্যাবে ‘ডিজিটাল ময়নাতদন্ত’ করে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নাড়িনক্ষত্র বের করে নিতে পারবে।

ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব কী?-জানতে চাইলে পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে এখন সাইবার অপরাধসহ ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। প্রায় সব অপরাধেই মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে। ধূর্ত অপরাধীরা ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমে অপরাধের ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের ডিভাইস থেকে তথ্য মুছে ফেলছে। ফলে ঘটনার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা অনেকক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য বের করতে পারছেন না। আবার প্রকৃত সত্য জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ঢাকায় স্থাপিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ল্যাবের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। তাই পিবিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দেশের সব বিভাগীয় শহরে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব চালু করা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল ল্যাব শুধু পিবিআই ব্যবহার করবে না। পাশাপাশি স্থানীয় থানা পুলিশ, জেলা পুলিশ, মেট্রোপুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিট এটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তাহলে অপরাধের ঘটনায় তদন্ত দ্রুত শেষ করা যাবে। প্রকৃত অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব যথার্থভাবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।’

কী হবে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে?-এমন প্রশ্নে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ব্যবহারের ওপর আমাদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। ট্রেনিং শেষে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে

বুধবার থেকেই ল্যাবে কাজ শুরু করেছি।’ তিনি জানান, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে যারা অপরাধ করে তাদের ধরতে এই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব। এই ল্যাবের মাধ্যমে মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের মুছে দেওয়া তথ্য দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যাবে। এই ল্যাবে ১১ ধরনের প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করা যাবে। সেলিব্রাইট ইউএফইডি টাচ টু নামের একটি মোবাইল ফরেনসিক ডিভাইস। এর মাধ্যমে একটি মোবাইল ফোনে যতো ধরনের কাজ হয়েছিল তা সবই বের করা সম্ভব হবে। ফোনবুক, এসএমএস, এমএমএস, নোট, কলের তালিকা, ইমেইল, ছবি, অডিও, ভিডিওসহ বিস্তারিত তথ্য বের করা ছাড়াও মোবাইল ফোন দিয়ে কোন কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা হয়েছে-তা সবই জানা যাবে। 

ল্যাবে আরো থাকছে ফ্রেড-এল নামের অত্যাধুনিক একটি ল্যাপটপ। এটিকে বলা হচ্ছে ফরেনসিক ওয়ার্কস্টেশন। এ ল্যাপটপের সঙ্গে যুক্ত ডিভাইস থেকে তথ্য বের করে আনবে। সেই ধরনের প্রয়োজনীয় সফটওয়ার এতে ইনস্টল করা আছে। এতে আছে এনকেইস নামের একটি ব্যয়বহুল সফটওয়্যার আছে। রাইট ব্লোকার আলট্রা কিট-নামের বহনযোগ্য এই সরঞ্জাম ব্যবহার করে সন্দেহজনক ডিভাইসের তথ্য নেওয়ার সময় কোনো তথ্য ‘মেনুপুলেট’ হবে না। সব তথ্যই সুরক্ষিত থাকবে।

ফরেনসিক ইমার্জিং সিস্টেম টিডিথ্রি নামের সরঞ্জাম ব্যবহার করে যেকোনো হার্ডডিস্ক থেকে তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব। পাসওয়ার্ড রিকভারি টুলকিট নামের একটি ক্যামেরা আছে ল্যাবে; পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন দিয়ে বন্ধ করে রাখা যেকোনো মোবাইলের ওপর ওই ক্যামেরা ধরলেই স্ক্রিনে গোপন পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন দেখা যাবে। সার্ভার ও কম্পিউটারে থাকা অসংখ্য তথ্যের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত তথ্য খুঁজে দেবে এমন ডাটা রিকভারি স্টিক আছে। কম সময়েই মধ্যেই এসব তথ্য যাছাই করা যাবে এর মাধ্যমে।

এছাড়া আছে পর্নো ছবি-ভিডিও শনাক্ত করার সুবিধা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যদি কেউ অশ্লীল কিছু ছড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে অপরাধী নিজের মোবাইল ফোন থেকে তা মুছেও ফেলে তাহলেও ডিজিটাল ময়না তদন্তে সেই গোপন রহস্য সহজেই বেরিয়ে আসবে। পর্ন সাইটের তথ্যাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম এ ল্যাব।

বাড়তি সুবিধা হচ্ছে ডিজিটাল অপরাধী শনাক্ত করার পাশাপাশি ডাটা লকার সুবিধা। এটি পাসওয়ার্ড দ্বারা সংরক্ষিত থাকবে। ল্যাব থেকে প্রেরিত তথ্য প্রেরক-প্রাপক ছাড়া আর কেউই দেখতে পাবেন না। সঙ্গে থাকছে চীনের তৈরি ফোনের সব ধরনের তথ্য সংগ্রহে একটি টুল-নাম মিরাকল বক্স।

ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ব্যহার করে সাইবার অপরাধীদের ধরা সহজ হবে বলে জানিয়েছেন পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা। তিনি বলেন, ‘ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজানের জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনগুলোও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে নিয়ে তথ্য বের করা হয়েছিল।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য যে বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করবে, তাও শনাক্ত করা যাবে এই ডিজিটাল ময়নাতদন্তে।’


মন্তব্য