kalerkantho


পাঠকের চোখে

সিনেমার আয়-ব্যয় ও ফাঁকা বুলি

   

৬ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০



সিনেমার আয়-ব্যয় ও ফাঁকা বুলি

লাভ ম্যারেজ

দেশের সিনেমার আয়-ব্যয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। সবাই সিনেমার বাজেট বাড়িয়ে বলছে, আর হিট-সুপারহিট বানিয়ে ফেলছে। বহির্বিশ্বে সিনেমার আয়-ব্যয়ের হিসাব করার জন্য 'বক্স অফিস' থাকে। আমাদের দেশে তা নেই। বছর কয়েক আগেও আমরা এ ধরনের ফুলিয়ে বলার প্রচলন দেখিনি। তখন অনেক সিনেমাকেই ফ্লপ বলা হতো এবং প্রযোজক তা অস্বীকারও করতেন না। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, কোনো সিনেমাই আর ফ্লপ করছে না! যদি ঘটনাটা সত্যি হতো, তাহলে বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণযুগ বলা যেত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

এবারের ঈদে তিনটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে-'লাভ ম্যারেজ', 'অগ্নি ২' ও 'পদ্মপাতার জল'। লড়াই হয় মূলত প্রথম দুটি সিনেমার মধ্যে। দুটিই শতাধিক সিনেমা হলে মুক্তি পায়। মুক্তির প্রথম দিনেই দাবি করা হয়, একটি ছবি আয়ের দিক থেকে 'বেদের মেয়ে জোসনা'র রেকর্ডও ভেঙে ফেলেছে। দুই দিন পর অন্য সিনেমাটিও দাবি করে বসে একই রেকর্ড ভাঙার। কিন্তু এটা একেবারেই অবাস্তব। কারণ ২০০ হলে এক দিনে চার কোটি টাকা আয় করা চাট্টিখানি কথা নয়, তা-ও আবার অমন বৃষ্টিমুখর দিনে! ২০০টি হলে যদি ৫০০ আসন থাকে এবং টিকিটের দাম যদি ১০০ টাকা হয় এবং চারটি করে শো চলে তবুু চার কোটি টাকা তুলে আনতে বেগ পেতে হবে।   ঢাকার বাইরের হলগুলোতে টিকিটের দাম ৩০ থেকে ৮০ টাকা। তার ওপর সব হলে ৫০০ আসন থাকে না। চারটি করে শোও হয় না সব হলে। সবচেয়ে বড় কথা, টিকিট বিক্রির টাকাকে সরাসরি আয়ও বলা চলে না। মফস্বলের একটি হলের টিকিটের দাম ৫০ টাকা হলে সেখান থেকে ছবির প্রযোজক পান মাত্র ৮-৯ টাকা। এই টাকাটাই ছবির আয়। মাল্টিপ্লেক্সের হিসাব অবশ্য ভিন্ন। বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্স থেকে প্রতি টিকিট বাবদ প্রযোজক পান ৯০ টাকা। সারা দেশে এ রকম মাল্টিপ্লেক্স আছে মাত্র দুটি।

বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আয় করেছে 'বেদের মেয়ে জোসনা'। ছবিটি মুক্তির দুই বছর পর একটি বিনোদন পত্রিকা জানিয়েছে, এই আয়ের পরিমাণ ২০ কোটি টাকা। যদিও অনেকেই তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন পরিমাণ টাকার অঙ্কের কথাও বলেন। কেউ কেউ ৪০ কোটি টাকার কথাও বলেন। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে 'স্বপ্নের ঠিকানা'। ঈদে মুক্তি পেয়ে ছবিটি আয় করে প্রায় ১৯ কোটি টাকা। এরপর আছে 'মনপুরা', যার আয় আট কোটি টাকা। এ ছাড়া 'খায়রুন সুন্দরী', 'প্রিয়া আমার প্রিয়া', 'চাচ্চু', 'কোটি টাকার কাবিন'-এগুলোও চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা আয় করেছে।

আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা যেহেতু আমাদের দেশে নেই, তাই এ ধরনের আয়ের রেকর্ড ভাঙার অশুভ প্রতিযোগিতা আমাদের সিনেমার জন্য ক্ষতিই ডেকে আনবে বলে আমার বিশ্বাস। কলকাতার শ্রী ভেঙ্কটেশ বা এস কে মুভিজ তাদের সিনেমাকে হিট-সুপারহিট বা সুপারডুপার হিট তকমা দিলেও তাদের পেটে বোমা মারলেও কখনোই আয়ের কোনো অঙ্ক বলে না। এটাও আমাদের অনুকরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

মিথ্যা বুলির বেড়াজাল ছিঁড়ে বাংলা সিনেমা একদিন সত্যি আয়ের রেকর্ড ভেঙে খানখান করে দিক, একজন সিনেমাপ্রেমী হিসেবে এটাই কামনা করি।

'আমাদের দেশে একদিন সেই সিনেমা হবে, যা কথায় না হিট হয়ে বাস্তবে হিট হবে'-সেই সুদিনের অপেক্ষায়।

সিমিত রায় অন্তর, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

antorray@gmail.com



মন্তব্য