kalerkantho


ড. মাকসুদের গবেষণার ফল পেতে যাচ্ছে দেশ

আশরাফুল হক   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ড. মাকসুদের গবেষণার ফল পেতে যাচ্ছে দেশ

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর অধ্যাপক ড. মাকসুদুল আলম না- ফেরার দেশে চলে গেলেও থেমে নেই পাট নিয়ে গবেষণা। তাঁর দেখানো পথে জিন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তোষা ও দেশি পাটের চারটি জাত উদ্ভাবন করেছেন তাঁর অনুসারীরা। চলতি বছরই সেগুলো কৃষকপর্যায়ে অবমুক্ত করা হবে। এসব জাতের পাটের ফলন প্রচলিত জাতের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। লবণসহিষ্ণু পাট গত বছরই জন্মেছে এ দেশে। আর মাকসুদুল আলমের জিনোম সিকোয়েন্সের স্বীকৃতি, অর্থাৎ মেধাস্বত্ব পাওয়ার খবরও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাকসুদুল আলমের মৃত্যুতে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। ক্ষতি হলেও আমরা তাঁর দেখানো পথ হারাইনি। তাঁর আবিষ্কার থেমে নেই। তিনি যে স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেছেন, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। তোষা ও দেশি পাটের চারটি জাত শিগগিরই অবমুক্ত করা হবে। আর লবণসহিষ্ণু পাট গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে খুলনায় চাষ করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস সংসদে এ তথ্য জানিয়েছিলেন।’

যোগাযোগ করা হলে পঞ্চানন বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে জানান, খুলনার বাজুয়ায় লবণসহিষ্ণু পাট চাষ শুরু হয়েছে। গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে যে পাট চাষ করা হয়েছে, তা খুবই উন্নতমানের। লম্বায় সাধারণ পাটের চেয়ে এক থেকে দেড় ফুট বেশি। আর এসব পাটগাছ মোটা হয়। গত বছরের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এ বছরও লবণসহিষ্ণু পাট চাষ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান এ সংসদ সদস্য।

২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচনের খবর দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জিনোম হলো প্রাণী বা উদ্ভিদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের বিন্যাস বা নকশা। এই নকশার ওপরই নির্ভর করে প্রাণী বা উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য। গবেষণাগারে এই জিনবিন্যাস অদলবদল করে উন্নত জাতের পাট উদ্ভাবন করা হচ্ছে। এ কারণেই পাটের জিনোম সিকোয়েন্সকে পাটের জীবনরহস্য বলা হয়। জীবনরহস্য উন্মোচনের পর বাংলাদেশের আবহাওয়া ও প্রয়োজন অনুযায়ী পাটের নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাটের গুণগত মান ও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব চেষ্টা সফল হলে পাট পচাতে কম সময় লাগবে এবং পাটের জৈব জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হবে। 

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মঞ্জুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অধ্যাপক মাকসুদুল আলম বেঁচে থাকলে আমরা আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম। তাঁর মৃত্যুতে আমরা পিছিয়ে পড়লেও থেমে নেই। তিনি প্রতিটি বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর মধ্যে মাকসুদুল আলম হওয়ার স্বপ্ন গেঁথে দিয়ে গেছেন। মাকসুদুল আলমের আবিষ্কারের বিষয়গুলোর মেধাস্বত্বও আমরা পেয়েছি। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্বের জন্য আমরা ওয়ার্ল্ড ইনটেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনে  (ডাব্লিউআইপিও) আবেদন করেছি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মালয়েশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ আমাদের মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব স্বীকৃতি ডাব্লিউআইপিওর মাধ্যমেই এসেছে। অন্য সব দেশের স্বীকৃতি পাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।’

ড. মাকসুদুল আলম ছিলেন একজন বাংলাদেশি জিনতত্ত্ববিদ। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডাটাসফটের একদল উদ্যমী গবেষকের যৌথ প্রচেষ্টায় ২০১০ সালে সফলভাবে উন্মোচিত হয়েছে পাটের জিন নকশা বা জীবনরহস্য। ওই উদ্ভাবনের মাধ্যমে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন মাকসুদুল। তিনি বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের জুট জেনোম সিকোয়েন্সিং প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী ছিলেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে পাট ছাড়াও মালয়েশিয়ার হয়ে রাবার এবং পেঁপের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছেন তিনি। মাকসুদুল আলম ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যান।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন বিজ্ঞানী বলেন, ড. মাকসুদুল আলম বাংলাদেশের ইতিহাসে গর্বের এক নাম। জীববিজ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তাঁর গবেষণা ও উদ্ভাবন দিয়ে সারা বিশ্বের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। তিনটি উদ্ভিদ ও ছত্রাকের জিনোম সিকোয়েন্সিং করে তিনি স্থান করে নিয়েছেন বিশ্বের সেরা কিছু বিজ্ঞানীর তালিকায়।


মন্তব্য