kalerkantho


অবিন্তা কবির

মেয়ের স্বপ্নযাত্রা, কাঁদলেন মা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মেয়ের স্বপ্নযাত্রা, কাঁদলেন মা

অবিন্তা কবির এখন শুধুই স্মৃতি। গতকাল তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর ছবির সামনে মা রুবা আহমেদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘প্রিয় সোনামণি, তুমি আমার একমাত্র সন্তান, এখানে সবাই তোমার প্রশংসা করছে। তুমি বাচ্চা থেকে ক্রমেই কিশোরী হলে।

মাত্র ১৯ বছর চার মাস হলেও তুমি আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছো। তুমি আমার চাঁদ, তুমি আমার রোদ্দুর। আমি বিশ্বাস করি, তুমি আমাকে ধরে আছো এখনো। ’ এরপর কিছুক্ষণ কথা এগোল না। হলজুড়ে পিনপতন নীরবতা। আবার তিনি শুরু করলেন। বললেন, ‘তুমি প্রতি রাতে চার কলেমা পড়তে। এরপর বাংলা গান গাইতে। একটা গান প্রায়ই গাইতে, ‘আকাশ এত মেঘলা, যেও না কো একলা, এখনি নামবে অন্ধকার। ’ এতটুকু বলার পর আর পারলেন না। আবারও কাঁদলেন। তিনি রুবা আহমেদ। গত বছর ১ জুলাই হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলায় নিহত অবিন্তা কবিরের মা।

‘অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রিয় সন্তান অবিন্তার উদ্দেশে এই কথাগুলো বলছিলেন রুবা আহমেদ। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর লা মেরিডিয়ানে ছিল এ আয়োজন। নিষ্ঠুরতা ও উগ্রবাদের শিকার হওয়া অবিন্তা বেঁচে থাকতে দেশ ও সাধারণ মানুষ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতেন, তাঁর স্মৃতিতে গড়ে তোলা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের যাত্রা শুরু করল স্বজনরা।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা, অবিন্তার বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, পরিচিতজন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অবিন্তা কবিরের পরিবারের সদস্য ও পরিবার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে অবিন্তার স্বজন ও বিশিষ্টজনরাও কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্মৃতিচারণা করেন অবিন্তার পারিবারিক বন্ধু এস এ কামাল হক, কাজী আশরাফুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ‘অ্যান ইনটিমেট পোর্ট্রেট অব অবিন্তা কবির’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন অবিন্তার পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট () উন্মোচন করা হয় অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয় অবিন্তা কবির স্মরণে এটি ভিডিও তথ্যচিত্র। এ ছাড়া তাঁর হাতের লেখা কিছু নোট ও চিঠি অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়।

‘১ জুলাই’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রুবা আহমেদ বলেন, ‘আমাকে সে বলেছিল রাত ১০টার মধ্যে ফিরে আসবে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম; কিন্তু অবিন্তা আর ফিরে আসেনি। ’ একমাত্র সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অবিন্তা মাত্র ১০ বছর বয়সে ওমরাহ করেছিল। সে ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। অবিন্তা বেঁচে থাকলে সে মানুষের জন্য অনেক কিছু করত। সে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা নিয়ে প্রচুর ভাবত। কখনোই সে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হতে চায়নি। ঢাকা তার প্রিয় শহর ছিল। অবিন্তা স্বপ্ন দেখত, সে একদিন মানুষের জন্য অনেক কিছু করবে। আজ সে নেই, আমরা তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য অবিন্তা ফাউন্ডেশন তৈরি করেছি। এই ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করবে। ’

অবিন্তার নানা মঞ্জুর মুর্শেদ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘মাত্র ১৯ বছর বয়সে সে চলে গেছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই সে আমাদের অনেক কিছু দিয়ে গেছে। সে আমাদের পরিবারের গর্ব। অবিন্তা লেখাপড়ায় অত্যন্ত ভালো ছিল। তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। ঢাকাকে সে খুব ভালোবাসত। এই শহরে এত ধুলাবালু, জ্যাম তার পরও নিউ ইয়র্ক থেকেও তার প্রিয় শহর ছিল ঢাকা। ’

নানি নীলু মুর্শেদ বলেন, ‘শেষ গ্রীষ্মে আমরা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় ছিলাম। টুনটুনি (অবিন্তা) গ্রীষ্মের চশমা ও শাড়ি পরেছিল। তাকে অনেক বড় দেখাচ্ছিল, যেন সে কিশোরী থেকে নারী হয়ে উঠেছে। অবিন্তা তার মা ছাড়া একটি মুহূর্তও থাকেনি। সে চলে গিয়ে আমাদের শূন্য করে দিয়েছে। ’

মামা তানভির আহমেদ বলেন, ‘সে সব সময় সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখত, যেখানে দারিদ্র্য থাকবে না। আমরা চেষ্টা করব তার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে। ’ তিনি আরো বলেন, “আমাকে অবিন্তা ‘বিল্লু’ বলে ডাকত। বলত, ‘বিল্লু, আমি বাংলাদেশে ফিরে আসব। এখানে গরিব ছেলে-মেয়ের জন্য কাজ করব। ’”

মার্সিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট বলেন, অবিন্তা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। সে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখত। ’ তিনি আরো বলেন, ‘অবিন্তার মতো আমরাও একটা সুখী শান্তিপূর্ণ সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, আমাদের সেই পৃথিবীটাই গড়ে তোলার কাজ করা উচিত। ’

‘অ্যান ইনটিমেট পোর্ট্রেট অব অবিন্তা কবির’ গ্রন্থে অবিন্তার নানা মঞ্জুর মুর্শেদ লিখেছেন, যে পথভ্রষ্ট যুবকগুলো এই জঘন্য অপরাধ করল, তাদের আল্লাহতায়ালা বিচার করবেন নিশ্চয়ই। আল্লাহতায়ালার কাছে আমার এই প্রার্থনা যে তিনি যেন এ রকম বিভ্রান্ত পথভ্রষ্ট যুবকদের সুমতি দেন, যেন এ ধরনের কোনো ঘটনা এই বাংলার মাটিতে না হয়। ’

উল্লেখ্য, অবিন্তা নিহত হওয়ার পর তাঁর একটি ডায়েরি খুঁজে পায় তাঁর পরিবার। ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি মানুষের জন্য চিন্তা করি এবং আমার লক্ষ্য, বাংলাদেশে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করব। আমি বিশ্বাস করি, আজকের এই আমি, আমার সংস্কৃতি ও জাতীয়তার একটি অংশ। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল একটি দেশ, আর এ দেশের জন্য কিছু করা আমার নৈতিক দায়িত্ব, যদিও এনজিও প্রতিষ্ঠা করা অতি সামান্য একটি পদক্ষেপ। ’

হলি আর্টিজানে নিহত হওয়ার আগে ২০১৬ সালের ২৭ জুন অবিন্তা কবির দেশে আসেন পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপনের জন্য। গুলশানে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে গিয়েছিলেন সহপাঠীর সঙ্গে। অবিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত বছরের ১ জুলাই রাতে ইফতারের পরপরই অবিন্তা তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরেক বন্ধু ও এই ঘটনায় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে হলি আর্টিজানে যান। সেখানেই জঙ্গিদের হাতে তিনি অন্যদের সঙ্গে নির্মমভাবে খুন হন।


মন্তব্য