kalerkantho


বিশ্ব কিডনি দিবস-২০১৮ উপলক্ষে

কিডনি ও নারীদের স্বাস্থ্য : চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে করণীয়

ক্যাম্পস আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক

তারিখ : ৩ মার্চ ২০১৮, স্থান : ডেইলি স্টার সেন্টার   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কিডনি ও নারীদের স্বাস্থ্য : চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে করণীয়

কিডনি ও নারীদের স্বাস্থ্য : চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে করণীয়

অধ্যাপক ডাঃ এম এ সামাদ

সভাপতি, কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস)

চিফ কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, কিডনি রোগ বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা

কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব নারীদের মাঝে পুরুষের চাইতে বেশি, অথচ চিকিৎসাক্ষেত্রে তারা অবহেলিত। বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগ একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যা, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৬ লক্ষ নারী অকালমৃত্যু বরণ করে কিডনি বিকল হয়ে। এই সমস্যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশেই বেশি। সারা বিশ্বে ১৪% নারী পক্ষান্তরে ১২% পুরুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। অথচ কিডনি বিকলের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা অনেক কম। এতে প্রতীয়মান হয়, চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত। তারা পুরুষশাসিত সমাজে বৈষম্যের শিকার।

আমাদের দেশে কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাবার চেয়ে মায়েরা বেশি ক্ষেত্রে সন্তানদের কিডনি দান করে থাকে। তেমনি বোনেরা ভাইদের চেয়ে এবং স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের চেয়ে বেশি ক্ষেত্রে কিডনি দান করে থাকে। প্রয়োজনের তুলনায় মেয়েদের কিডনি সংযোজনের হার অনেক কম। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, পারিবারিক আর্থিক আয়ে নারীদের কম অবদান, রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, শিক্ষার অভাবই এই বৈষম্যের মূল কারণ।

এমন কতগুলো বিশেষ কিডনি রোগ আছে, যা শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়। যেমন—লুপাস নেফ্রাইটিস, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ, গর্ভবতী অবস্থায় কিডনি রোগ, আবার কিডনি রোগ নিয়ে গর্ভধারণ। এসব ঝুঁকি শুধু নারীদেরই পোহাতে হয়।

একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই আধুনিক যুগে এসেও আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও অধিকার বঞ্চনার বিষয়সমূহ প্রবলভাবে আলোচিত।

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল এই বাংলাদেশে জনসংখ্যাধিক্য এবং দারিদ্র্যের হার বিবেচনায় গণমানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার পূরণের ক্ষেত্রে এখনো বিশাল ঘাটতি বিদ্যমান। মৌলিক মানবিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির অধিকার অন্যতম, কারণ অসুস্থতা এবং চিকিৎসার সাথে জড়িয়ে রয়েছে জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি।

দারিদ্র্য, অসচেতনতা, স্বাস্থ্যজ্ঞানের অভাবের কারণে এখনো এদেশে প্রচুর সংখ্যক মানুষ সংক্রামক, অসংক্রামক নির্বিশেষে নানাবিধ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করে। নারীরা এদেশে সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রায় সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া কিংবা অবহেলার শিকার, সেক্ষেত্রে জড়তা, লোকলজ্জা, সহজাত লুকিয়ে রাখার প্রবণতা—এসব কারণের জন্য বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের বা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী এখনো সীমাহীন বৈষম্যের শিকার। এ চিত্র বাংলাদেশে যেমন প্রকট, বহির্বিশ্বে বা বিশ্বজুড়ে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিভিন্ন দেশেও চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর প্রতি অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। এ বিষয়টি মাথায় রেখে বিশ্ব কিডনি দিবস উদযাপন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক “বিশ্ব কিডনি দিবস ২০১৮”-এর প্রতিপাদ্য হিসেবে “কিডনি এন্ড উইমেন হেলথ : ইনক্লুড, ভ্যালু, এমপাওয়ার” নির্ধারণ করা হয়েছে। কিডনির সাথে নারীর স্বাস্থ্য নিবিড়ভাবে জড়িত। সুস্বাস্থের জন্য নারীদের অংশগ্রহণ, মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়ন জরুরি। সমগ্র বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নির্ধারণ করা হলেও দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অতিমাত্রায় প্রযোজ্য, সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়বস্তু। যে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী সে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কোনোভাবেই নারীদের অবহেলা করে কিংবা গুরুত্বহীন রেখে সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর অধিকার সমানভাবে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা এবং চিকিৎসার মতো প্রধানতম দুটি বিষয়ে অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারীদের সুযোগ নিশ্চিত না করলে অগ্রসরমাণ জাতি থমকে দাঁড়াবে একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবে এক্ষেত্রে নারীদের নিজেদেরও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে তা আদায়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে।

কিছু কিডনি রোগ আছে, যা নারীদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ :লুপাস নেফ্রাইটিস ও মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ

লুপাস নেফ্রাইটিসে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ৯ জনই নারী। এটা এমনই একটা রোগ যা অল্প বয়সের নারীদের হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শেষে ৯০ শতাংশ ভালো হয়, তবে চিকিৎসা না হলে ৬ মাসের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ রোগীর মৃত্যু হয় কিডনি বিকল হয়ে। এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ নাক ও গালে প্রজাপ্রতির আকারে লাল বর্ণ ধারণ করে, যা অনেকটা মেছতার মতো দেখায়। হাড়ের জোড়াতে ব্যথা, জ্বর-জ্বর ভাব, চোখের পাতা ভারী, মুখ ফোলা ইত্যাদি প্রাথমিক লক্ষণ। মূত্রতন্ত্রের প্রদাহে অন্যরূপ, মূলত নারীরা পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি আক্রান্ত হয় (৮:১)। ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া, তলপেটে ব্যথা, কখনো কাঁপুনি  দিয়ে জ্বর ওঠা ইত্যাদি প্রধান উপসর্গ। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে কিডনি বিকলসহ অনেক জটিলতার শিকার হতে পারে নারীরা।

গর্ভকালীন কিডনি সমস্যা :

গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন জটিলতার জন্য অনেক সময় কিডনি রোগ হয়ে থাকে। যেমন—প্রিএকলাম্পসিয়া, একলাম্পসিয়া যেখানে প্রস্রাবের সাথে প্রচুর আমিষ যায়, শরীর ফুলে যায় এবং উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এতে কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। আবার প্রসবকালীন সময় রক্তক্ষরণের জন্য আকস্মিক কিডনি বিকল হতে পারে। তাছাড়া গর্ভপাতের সময়ও জরুরি সিজারের পর অনেক রোগী ইনফেকশন বা সেপটিসিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে অকালমৃত্যু বরণ করতে পারে।

কিডনি রোগ নিয়ে গর্ভধারণ করা

মা হবার স্বপ্ন কোন নারীর না থাকে। কিন্তু কিডনি রোগ নিয়ে গর্ভধারণ নারীদের অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়। যার জন্য মা ও শিশুমৃত্যুর হার সাধারণ মানুষের চেয়ে এদের মাঝে অনেক বেশি। তারপরেও তাদের মা হবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, তবে এজন্য প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা ও সচেতনতা। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীদের গর্ভকালীন সময় নিয়মিত চেকআপে থাকতে হবে, হাসপাতালে বিশেষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ডেলিভারি করাতে হবে। যারা নিয়মিত ডায়ালাইসিসের রোগী, যদিও তাদের প্রজনন ক্ষমতা অনেক কমে যায়, তবুও অনেকে গর্ভধারণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে ঘন ঘন ডায়ালাইসিস হলে মা ও শিশু সুস্থ থাকতে পারে। ঝুঁকি থাকলেও কিডনি সংযোজন করার পর মা হবার উদাহরণ বাংলাদেশে অনেক। তবে তাদের জন্য প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা ও দায়িত্ব।

নারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

চিকিৎসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। এই বৈষম্য দূর করতে গেলে একটি সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন।

সরাসরি চিকিৎসাক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের পরিবর্তে মূল কারণের পরিবর্তন আনতে হবে, যেমন—মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান সর্বোপরি অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

নারীর সামাজিক অবমূল্যায়ন রোধ করতে হবে। মেয়েরা ঘরে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি পরিশ্রম করে, অথচ তাদের শ্রমকে মূল্য দেয়া হয় না। বাইরে কর্মক্ষেত্রে তাদের পুরুষদের চেয়ে কম মূল্য দেয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে হলে সব কর্মসূচিতে; যেমন—

বাসস্থান, কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কর্ম এবং রাজনীতির মতো জায়গাগুলোতে নারীদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বিবেচনায় রাখতে হবে। তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

আর্থিক আয়ের বড় অংশ পুরুষদের কাছ থেকে আসে বলে চিকিৎসাক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত থাকে। আর্থিক আয়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকার মতো যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের দেশের সংবিধান মেয়েদের সমঅধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তব সংস্কৃতি তার নিজের পথেই চলছে। সামাজিক বিপ্লব ছাড়া নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি কার্যত অধরাই থেকে যাবে। চিকিৎসাক্ষেত্রে সমানাধিকার অর্জনে অনেক কিছুই করার আছে, কিন্তু এর মধ্যে সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যকে জানা, বোঝা এবং তার মুখোমুখি হতে হবে।

লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে আইনের প্রয়োগ জরুরি।

চিকিৎসকদেরও নারীদের সমমর্যাদা দিতে হবে। গর্ভকালীন সময় ও গর্ভপাতের পর জটিলতা নিরসনে নিবেদিত জরুরি ব্যবস্থা হাতের নাগালে থাকা উচিত।

উপরে বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে এটা পরিষ্কার যে, কিডনি রোগের ঝুঁকি নারীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। এটাও আমরা জানি চিকিৎসার সুযোগের ক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্য ও অবহেলার শিকার। এই সমস্যা দূরীকরণে সচেতন পুরুষদের সাথে নারী নেত্রীদের এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে, তাদের অধিকার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাদের মূল্যায়ন ও ক্ষমতার আন্দোলনে সকল সচেতন নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সুস্বাস্থ্য রক্ষায় ও  সুচিকিৎসায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান অধিকার।

 

ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন

সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ)

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা সেক্টরের প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, এমনকি তিনি ডাক্তারদের এই বলে উপদেশ দেন যে, তোমরা রোগীদের নিজের আত্মীয় মনে করে সেবা করো। তিনি প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আজকে দেশের গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাটও অনেক উন্নত, ফলে ডাক্তার ও রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছতে কোনো সমস্যা হয় না।

নারীদের তীক্ষ বুদ্ধি রয়েছে, যা আমাদের কাজে লাগাতে হলে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনেক উন্নতি সাধন হলেও এখনো নারীরা পিছিয়ে আছে, এজন্য সমাজে সমতা ভিত্তিক চিন্তা প্রতিষ্ঠায় জনমত সৃষ্টি করতে হবে, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

আজ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদগুলোতে নারীর অবস্থান বেশি, এটা আরো বিস্তৃত করতে হবে, তবেই নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ সহজ হবে।

 

অধ্যাপক ডাঃ হারুন অর রশিদ

সভাপতি, কিডনি ফাউন্ডেশন

যে কোনো সুস্থ মানুষেরও ৪০ বছরের পর থেকে প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে কিডনি বিনষ্ট হতে থাকে। কিডনি রোগ একসাথে দুটো কিডনিতেই হয় এবং এর যে কোনো একটা সঠিক থাকলেও মানুষ বেঁচে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী কিডনি দানের ক্ষেত্রে মা ও বাবার মধ্যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় মায়েরা দান করে, তেমনি ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে বাবা দান করে। তেমনিভাবে ভাই ও বোনের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ বোনেরা দান করে, ১০ শতাংশ ভাইয়েরা। এবং স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে শতভাগই স্ত্রীরা দান করে। সুতরাং বৈষম্যের এই চিত্র শুধু ভয়াবহ নয়, বরং উদ্বেগজনক। কিডনি প্রতিস্থাপন জনপ্রিয় হচ্ছে না, গত ১০ বছরে মাত্র ৪২০টা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। এটা অরগান অ্যাক্টের বাধার কারণে, যদিও এখন তা অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে এবং মানুষ সুফল পাবে।

 

অধ্যাপক ডাঃ এম এ সালাম

প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইউরোলজি

মূত্রাশয়ের প্রদাহে সাধারণত অবিরাম মূত্রত্যাগের ইচ্ছা হয়। অনেক সময় ডাক্তাররা রোগ সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক দেন। তবে সাবধানতার সাথে ব্যবহার না করলে তা ক্ষতিকর হয়। পানি পান নিয়ে এখনো ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অতিরিক্ত পানি পান ক্ষতিকর। অপ্রয়োজনীয় পানি শরীরের ক্ষতি করে। সুতরাং যখন পানি পিপাসা হয় শুধু তখনই পানি খেতে হয়। পানি খাওয়াটা এমনকি একটা নেশায়ও পরিণত হয়। এই নেশা ক্ষতিকর, দৈনিক দেড় লিটার পানি খেলে শরীরের সুস্থতার জন্য তা যথেষ্ট। ক্যাম্পসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ কিডনি রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। যখন আমরা জানি যে এ রোগ চিকিৎসা দিয়ে সরানো দুরূহ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল তখন প্রতিরোধ করে ঠেকানোর বিকল্প নেই। তাই অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ সাহেবের উদ্যোগ যথার্থ এবং সঠিক। মূত্র বিষয়ক জটিলতায় নারীরাই বেশি ভোগে, তাই তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার সুবিধা বেশি থাকা উচিত অথচ নারীরাই পিছিয়ে আছে। নারীদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুবিধা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অপরিহার্য।

 

অধ্যাপক মেজর (অবঃ) ডাঃ লায়লা আরজুমান্দ বানু

প্রেসিডেন্ট, অবস্ট্যাট্রিক্যাল এন্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ

মেয়ে কিডনি রোগীদের গাইনি জটিলতা বেড়ে যায়। মেয়েরা এমনিতেই চিকিৎসায় পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে সচেতনতা বাড়ানোর ভূমিকা নিতে হবে। অনেক জায়গায় মহিলা টয়লেট না থাকায় মেয়েরা লম্বা সময় ধরে প্রস্রাব আটকে রাখে, যা কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মেনোপজ মায়েদের চিকিৎসায়ও নারীরা খুবই পিছিয়ে আছে। আজ সময় এসেছে লজ্জাবোধ, শঙ্কা ঝেড়ে ফেলে নিজের স্বাস্থ্যের ভালোর জন্য নিজেকেই এগিয়ে আসার। তাছাড়া ক্যালসিয়ামের অভাবে অধিকাংশ নারী ভোগে। এসব বিষয়ে ক্যাম্প করে দেশব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তবে আমি বলব, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদের ক্যাম্পস একটি রোল মডেল। অনেকে তা অনুসরণ করতে পারে।

 

অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ রফিকুল আলম

সভাপতি, বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশন

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সরকারের শীর্ষস্থানে অনেক নারীর উপস্থিতি রয়েছে, এতে একটা ফলক ইমপ্রেশন তৈরি হচ্ছে সমাজে, অথচ সত্যিকার অর্থে নারীরা চিকিৎসা, শিক্ষা সর্বক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে। এযাবৎকালের রেকর্ডে আমি মাত্র একজন পুরুষকে পেয়েছি যে তার স্ত্রীকে কিডনি দান করেছে, অথচ মেয়েরা কিডনি দান করেই যাচ্ছে। আমি মনে করি, মেয়েদের শিক্ষার অগ্রগতিই তাদের এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। শিক্ষা গ্রহণে সমস্যা আছে, তবে তা নারীর দায় নয়। শিক্ষিত হলে তাদের অধিকার নিজেরাই আদায় করে নেবে। এ দায়িত্ব সরকারেরই নিতে হবে। সচেতন মহলকেই দায়িত্ব নিতে হবে সচেতনতা সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে।

 

গোলাম রহমান

সাবেক সচিব, সাবেক চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

মেয়েরা মমতাময়ী, আমরা বলে থাকি মমতাময়ী মা। এজন্য সহজাতভাবেই মেয়েরা স্নেহশীল, দয়ালু বেশি। তাই আজকের পরিসংখ্যানে যে কিডনিদাতাদের মধ্যে মেয়ের সংখ্যা বেশি তার প্রকৃতিগত কারণ এটাই। তবে চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে মেয়েরা যে পিছিয়ে আছে, এটা ঠিক নয়। আমাদের বৈষম্য দূর করতে হলে মেয়েদের ক্ষমতায়ন সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমানে যে গতিতে মেয়েরা অগ্রসর হচ্ছে, তাতে একটি সময়ে এসে বৈষম্য থাকবে না। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে উদ্যোগ মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা, তা সর্বস্তরে প্রসারিত করতে হবে। তবে স্বাস্থ্য সচেতনতায় ক্যাম্পস যে উদ্যোগ গ্রহণ করছে তা অনুকরণ করে অন্যদের এগিয়ে আসতে হবে।

 

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক প্রথম আলো

চলার পথে ১০ মিনিট অন্তর অন্তর পাবলিক টয়লেট স্থাপন করতে হবে এবং তা যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে কঠোরভাবে তা নিশ্চিত করতে হবে। টয়লেট প্যান সিস্টেমের পাশাপাশি কমোড সিস্টেম রাখা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে মেয়েদের বেশি কাজে আসে না। আবাসিক বাড়িগুলোতে যাতে স্থানীয়ভাবে পথিক নারীদের জরুরি প্রয়োজনে টয়লেট ব্যবহারের জন্য প্রবেশাধিকার থাকে সেটা গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

ডায়ালাইসিস ব্যয় একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে কমিয়ে আনতে হবে অর্থাৎ ন্যূনতম ৩০০ টাকায় যাতে ডায়ালাইসিস দেয়া যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নীতি সহায়তা দরকার। কিডনি দানের ক্ষেত্রে দালাল একটি বড় সমস্যা। একসময় কিডনি দানে আইন একটি প্রতিবন্ধকতা ছিল, তবে গত বছর সরকার তা শিথিল করেছে। সচেতনতা বাড়াতে মিডিয়া অবশ্যই ভূমিকা রাখবে, তবে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডাক্তাররা যদি তৈরি লেখা পাঠান তাহলে মিডিয়ার পক্ষে সহজ হবে।

 

গাজী আশরাফ হোসেন লিপু

ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও সাবেক অধিনায়ক, জাতীয় ক্রিকেট দল, বাংলাদেশ

সমাজে নারীদের অধিকার বঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসতে সচেতনতা বৃদ্ধিই প্রধান হাতিয়ার। তবে সচেতন করতে আমাদের সমাজে নাটক, সিনেমার নায়ক-নায়িকা বা সেলিব্রিটি খেলোয়াড়, মডেল—এদেরকে ব্যবহার করলে সহজে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থারও একটা ভূমিকা আছে। মসজিদের ইমামের প্রতি মানুষের আস্থা থাকে, খুতবায়ও এসব বিষয় প্রচার করা যেতে পারে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে কিডনি রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়, তা বাচ্চারা বুঝবে না। মা-বাবারই এটা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমার মা ৮২ বছর বয়সী। তাঁকে একটু কমফোর্ট দিতে আমি অনেক চেষ্টা করি। তবে আমার ধারণা আমাদের বাচ্চারা তা করবে না। আমি সুপারিশ করব নতুন প্রজন্মের বাচ্চাদের শারীরিক ফিটনেসকে গুরুত্ব দিতে, তাদের খেলার মাঠের ব্যবস্থা রাখা। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা প্রয়োজন। সব শেষে বলব, ডায়ালাইসিস সেবা ছড়িয়ে দিতে জেলায় জেলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে।

 

 

মিতা হক

বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী

সমাজে নারীরা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি এবং এর মধ্য দিয়েই তাদের টিকে থাকতে হয়। আমি বিশ্বাস করি, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব রোগীই অসহায় হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়, তাই ডাক্তারের থেকে শোভন ও ন্যায্য ব্যবহার পাওয়া খুব জরুরি। তবে এতে ঘাটতি আছে। সচেতনতার অভাব সমাজে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেমন—আমি কিডনি রোগে আক্রান্ত, এটা না জেনে গত ১২ বছর যাবৎ প্রেট্রিন খেয়ে আসছি, যা আমার কিডনির অনেক ক্ষতির কারণ হয়েছে। মেয়েরা সব দিক থেকেই সমাজে পুরুষের চেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়, তাই কিডনি বিষয়টা বিশেষ কিছু না। কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস, ইনজেকশন—এসব খুবই ব্যয়বহুল। তাই মধ্যবিত্ত বা গরিব রোগীদের কথা বিবেচনা করে তা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আমি মনে করি, নানা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে কিডনি রোগীদের বুস্ট-আপ করা উচিত। আর সেক্ষেত্রে ক্যাম্পসের মতো প্রচারণায় আরো অনেককে এগিয়ে আসতে হবে।

 

ফেরদৌস আহমেদ

চলচ্চিত্র অভিনেতা

মানুষ ও মানবতার প্রতি বোধের পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজে সুস্থ চিন্তাধারার অভাব রয়েছে। সৃষ্টিশীল চেতনা থাকলে অনেক বড় সমস্যারও ছোট সমাধান বের করা সম্ভব।

নারীর সমস্যা ও পিছিয়ে থাকা চিরন্তন। তবে আজ একবিংশ শতাব্দীর সময়ে এসে ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। মেয়েলি স্বাস্থ্য সমস্যা যে লুকিয়ে রাখার কোনো বিষয় নয় তা আজ প্রমাণিত। এতে মেয়েদেরই এগিয়ে আসতে হবে আর পুরুষদের এতে সহযোগিতা করতে হবে। সর্বোপরি সরকারকে নীতি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমার দুটো মেয়ে আছে, তাদের মেয়েলি সমস্যার সমাধানে বাবা হিসেবে আমাকেই ভূমিকা নিতে হবে। সব বাবারই তা ভাবা উচিত। এ বিষয়গুলো সমাজে ছড়িয়ে দিতে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। প্রয়োজনে নাটক ও সিনেমা তৈরি করে হলেও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।



মন্তব্য