kalerkantho


সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির আপিল গৃহীত হলে নির্বাচন করা যায়

খালেদার ক্ষেত্রে কী হবে তা নির্ভর করবে সময়ের ওপর

আশরাফ-উল-আলম   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির আপিল গৃহীত হলে নির্বাচন করা যায়

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় রায় ঘোষণার সময় যত এগিয়ে আসছে ততই আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ করতে পারা না পারার বিষয়টি আলোচনায় আসছে। সাজা হলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না সে নিয়ে বিতর্কও হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গত শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স

ইউনিটি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় বলেছেন, দুর্নীতির মামলায় বেগম জিয়ার সাজা হলেও তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম গতকাল রবিবার মাদারীপুরে বলেছেন, খালেদা জিয়ার সাজা হলেই তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অযোগ্য হবেন।

কোনো মামলায় সাজা হলেই আপাতত দোষী বলে ধরে নেওয়া হয়। বিচারিক আদালত সাজা দিলে দেশের আইন অনুযায়ী আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আপিলের সুযোগ পেলে এবং আপিল আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলে বিচারিক আদালতের রায় বহাল থাকে না। আর সে কারণে কোনো মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলেই তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন না বলেই আইনজীবীরা মনে করেন। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়টি নির্ভর করে মামলার রায় ও আপিলের সময়ের ওপর।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ (ঘ) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কেউ যদি দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তিলাভের পর যদি পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হয় তবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না বা সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না।

সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেগম জিয়ার যদি দুই বছরের বেশি সাজা হয় তবে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন।

তবে এ দেশে এমন নজির রয়েছে যে, সাজা হওয়ার পরও কেউ কেউ উচ্চ আদালতে আপিল করায় সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য হননি।

যেকোনো মামলায় সাজা হওয়ার পর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪১৮ ধারা অনুযায়ী আসামির আপিল গ্রহণযোগ্য হবে। একই আইনের ৪১৯ ধারা অনুযায়ী তিনি আপিল আবেদন করতে পারবেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারায় বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতে আপিল করা হলে আপিল আদালত বিচারিক আদালতের রায় ও দণ্ড স্থগিত করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার সাজা হলে তিনি যদি আপিল করেন তাহলে উচ্চ আদালত বিচারিক আদালতের রায় ও দণ্ড স্থগিত করতে পারেন। আর যদি সে রকম হয় তাহলে খালেদা জিয়ার আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা থাকবে না।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও বলেছেন, বেগম জিয়ার যদি সাজা হয় তবে তাঁরা আপিল করবেন আর আপিল করলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, দুর্নীতির মামলায় ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়। তিনি আপিল করেন। হাইকোর্ট সাজা বাতিল করেন। পরে দুদক আপিল করে আপিল বিভাগে। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্ট আবার আপিল শুনানির নির্দেশ দেন। তার মানে এখনো সাজা বহাল রয়েছে। কিন্তু আপিল বিচারাধীন থাকায় মায়া চৌধুরীর সংসদ সদস্য পদ এখনো যায়নি, মন্ত্রিত্বও যায়নি।

শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমাদের সামনে আরেকটি উদাহরণ আছে। সেটি হচ্ছে কক্সবাজারের এমপি বদিকে গত বছর তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। জামিন পান। তাঁর সংসদ সদস্য পদও যায়নি। ’ শাহদীন মালিক আরো বলেন, ‘এই দুটি নজিরকে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়া সুফল পেতে পারেন। যদিও বেগম জিয়ার সাজা হয় নাকি তিনি খালাস পান সেটাও আমাদের সামনে আপেক্ষিক বিষয়। তার পরও যতি তাঁর সাজা হয় এবং হাইকোর্টে আপিল করেন তবে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। অবশ্য উচ্চ আদালতেও যদি আপিল নিষ্পত্তি হয়ে সাজা বহাল থাকে তাহলে যে কেউই সংসদ সদস্য পদের যোগ্যতা হারাবেন। ’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, বিচারিক আদালত সাজা দেওয়ার পর কেউ আপিল করলে আপিল আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী যদি আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে রায় ও দণ্ড স্থগিত করেন তাহলে ওই ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না। আর উচ্চ আদালত আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে যদি রায় ও দণ্ড স্থগিত না করেন তবে নির্বাচনে অযোগ্য হবেন।

শ ম রেজাউল আরো বলেন, মামলার রায় যদি এমন সময়ে হয় যে, নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে আপিল করার সময়ই কেউ পাচ্ছেন না, তখন তো আর যোগ্যতা থাকবে না।

পাঁচটি দুর্নীতির মামলাসহ হত্যা, সহিংসতা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির ২৫টি মামলা বিচারাধীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। যে গতিতে এই মামলাগুলো নিষ্পত্তির দিকে এগোচ্ছে, তাতে চলতি বছরের মধ্যেই যে কোনো মামলার রায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জিয়া ট্রাস্ট সংক্রান্ত দুটি মামলার বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেই মামলায় খালেদার সাজা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁর দলেরই অনেক নেতাকর্মী।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে পাঁচটি ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা। এগুলো হচ্ছে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের জন্য জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট-সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা এবং নাইকো দুর্নীতি মামলা। এ ছাড়া বাকি একটি দুর্নীতির মামলাসহ ২০টি মামলা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।


মন্তব্য