kalerkantho


পাঠ্য বইয়ে ভুলের ভূত

সুন্দরবনে হাতি ভালুক!

আরিফুর রহমান   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুন্দরবনে হাতি ভালুক!

চতুর্থ শ্রেণির ‘আমার বাংলা বইয়ে’ সুন্দরবন নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। শিরোনাম ‘বাওয়ালিদের গল্প’। তাতে বলা হয়েছে—‘সুন্দরবনে ভালুক আছে’ এবং ‘সুন্দরবনের বাঘ গরু, ছাগল ও ভেড়া খেয়ে বাঁচে’। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে আরেক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘সুন্দরবনের প্রাণী হাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে’। তবে সুন্দরবনের অভিভাবক কর্তৃপক্ষ বন বিভাগ বলেছে, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে সুন্দরবন নিয়ে উল্লিখিত এসব তথ্য ডাহা ভুল। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই। এতে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই শিশুরা সুন্দরবন নিয়ে ভুল তথ্য জেনে বড় হবে। সুন্দরবন নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হবে। যাদের দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে সুন্দরবন সম্পর্কে লেখানো হয়েছে, তারা কখনো সুন্দরবনে গেছেন কি না কিংবা সুন্দরবন সম্পর্কে তাদের জানাশোনা আছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বন বিভাগ। পাঠ্য বইয়ের এসব তথ্যের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং তা সংশোধন করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) চিঠিও পাঠিয়েছে বন বিভাগ।

পাঠ্যপুস্তকে ভুল নিয়ে চলতি বছরের শুরুতেই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি এখন ভুলগুলো সংশোধনের কাজ করছে। ভুল সংশোধনের মধ্যেই প্রথমবারের মতো সরকারি একটি সংস্থার কাছ থেকে এ ধরনের প্রতিবাদ এলো। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ভুল তথ্য সম্পর্কে বন বিভাগ থেকে তাঁরা মতামত পেয়েছেন। আগামী বছর সেগুলো সংশোধন করা হবে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘সুন্দরবনে ভালুক আছে’—এমন তথ্যে তাঁরা বিস্মিত। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন বিভাগে কর্মরত আছেন সফিউল আলম চৌধুরী। বর্তমানে তিনি প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ)। পাঠ্য বইয়ে পরিবেশিত তথ্যের বিষয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনো শুনিনি সুন্দরবনে ভালুক আছে। আমরা নিজেরা গবেষণা করে দেখেছি সুন্দরবনে কখনো ভালুক ছিল না। পাঠ্য বইয়ে ভালুক নিয়ে যে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে, সেটি মিথ্যা। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। আর সুন্দরবনের বাঘ গরু, ছাগল ও ভেড়া খেয়ে বেঁচে বলে যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে তাও মিথ্যা। ’

বন বিভাগ সূত্র বলেছে, চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘বাওয়ালিদের গল্প’ শিরোনামের প্রবন্ধের প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, সুন্দরবনের বাঘ গরু, ছাগল ও ভেড়া খেয়ে বেঁচে থাকে। এর প্রতিবাদে এনসিটিবিতে পাঠানো প্রতিবেদনে বন বিভাগ জানিয়েছে, গবেষণালব্ধ তথ্য মতে, সুন্দরবনে খাবার হিসেবে বাঘ প্রধানত হরিণ, বন্য শূকর ও বানরের ওপর নির্ভরশীল। এ বনের বাঘ গরু, ছাগল ও ভেড়া খায় না। তবে বইয়ে যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে তা বিভিন্ন চিড়িয়াখানা কিংবা অন্য কোথাও আবদ্ধ বাঘের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে। একই অনুচ্ছেদে আরো উল্লেখ আছে, সুন্দরবনে ভালুক আছে। কিন্তু বন বিভাগের কাছে গবেষণালব্ধ যে তথ্য আছে, তাতে দেখা গেছে, ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনে কোনো ভালুক নেই।

বইয়ের ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠায় একই প্রবন্ধের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাতের বেলা হিংস্র জন্তুদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে বাওয়ালি ও মৌয়ালরা সুন্দরবনের মাটি থেকে অন্তত ছয় ফুট ওপরে গাছের ডালপালার ভেতর ঘর বা টং তৈরি করে থাকে। ’ এ বিষয়ে বন বিভাগ তাদের মতামতে জানিয়েছে, সুন্দরবনের ভেতরে গাছের ডালপালার ভেতরে ঘর বা টং তৈরি করার কোনো অনুমতি বা সুযোগ নেই। সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য বন অধিদপ্তর থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত গোলপাতা আহরণকারী বাওয়ালি ও মৌয়ালরা রাতের বেলায় তাদের অনুমোদিত নৌকায় অবস্থান করে। পর্যটকদেরও রাতের বেলায় সুন্দরবনের ভেতরে থাকার সুযোগ নেই।

৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সুন্দরবনে যারা কাঠ কাটেন ও বিক্রি করেন তাদের ‘বাওয়ালি’ বলে। বন বিভাগ বলেছে, তথ্যটি সঠিক নয়। অভিধান অনুযায়ী, বাওয়ালি শব্দের অর্থ যিনি বাঘ বশ করার মন্ত্র জানেন। অথবা সুন্দরবন থেকে কাঠ, মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর বর্তমানে স্থানীয় ও প্রচলিত অর্থে সুন্দরবন থেকে বন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত গোলপাতা আহরণকারীদের বাওয়ালি বলা হয়।

‘বাওয়ালিদের গল্প’ প্রবন্ধের ৫৬ নম্বর পৃষ্ঠায় শেষ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সুন্দরবনের তিন পাশের গ্রামের অনেক মানুষ বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে এবং বাওয়ালিরা রোজ গ্রাম থেকে বনে এসে কাঠ কাটেন। দিনের শেষে আবার কাঠ নিয়ে গ্রামে ফিরে যান। ’ এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বন বিভাগ বলেছে, ১৯৮৯ সাল থেকে সুন্দরবনে কাঠ আহরণ নিষিদ্ধ আছে। সুন্দরবন থেকে বৈধ উপায়ে কাঠ আহরণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে উল্লিখিত তথ্য সঠিক নয়। অবৈধ পন্থায় কেউ যদি বন থেকে কাঠ আহরণ করে, বন বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। তবে সুন্দরবন থেকে বৈধভাবে গোলপাতা আহরণের সুযোগ থাকলেও প্রবন্ধে সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।

পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘সুন্দরবনের প্রাণী’ শিরোনামের প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, সুন্দরবনের প্রাণী হাতি বিলুপ্ত হয়েছে। এ বিষয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনে কখনো হাতির অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে হাতি বিলুপ্ত হওয়ার কথা আসে কিভাবে?

প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সুন্দরবনে কখনো হাতি ছিল না। সেখানে হাতি থাকার পরিবেশও নেই। সুন্দরবনের আশপাশে লবণাক্ত পানি। তা ছাড়া এটি শ্বাসমূলীয় বন। সেখানে তো হাতি থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

সফিউল আলম চৌধুরী আরো বলেন, ‘চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সুন্দরবন সম্পর্কে যেসব ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে, আমরা সেগুলো চিহ্নিত করে এনসিটিবিকে জানিয়েছে। বলেছি, এগুলো সঠিক তথ্য নয়। তা যেন শোধরানো হয়। ’

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন বিভাগ থেকে আমরা চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের বিষয়ে কিছু মতামত পেয়েছি। এখন এসব তথ্য পর্যালোচনা চলছে। যাঁরা প্রবন্ধটি লিখেছেন, তাঁদের সঙ্গে বৈঠকে বসে ঠিক করা হবে ওই সব তথ্য সঠিক না কি ভুল। যদি ভুল হয়, তাহলে পরের বছর তা পরিমার্জন করা হবে।   প্রতিবছরই আমরা বই পরিমার্জন করি। যেসব মতামত আসে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধন করা হয়। ’

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আগে ভালোভাবে জানা উচিত। তারপর সুন্দরবন নিয়ে লেখা উচিত। যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ তাদের দিয়ে সুন্দরবন সম্পর্কে লেখার পরামর্শ দিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।


মন্তব্য