kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অকেজো আইন এখনো বলবৎ

আশরাফ-উল-আলম ও রেজাউল করিম   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অকেজো আইন এখনো বলবৎ

প্র্রণীত যেকোনো আইন সাধারণ মানুষকে অবহিত করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে ওই আইন গেজেট আকারে প্রকাশ করা। দ্য বাংলাদেশ ল’স (রিভিসন অ্যান্ড ডিক্লিয়ারেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর ধারা ৬ ও ৬এ অনুসারে বাংলাদেশের সব আইন কোড আকারে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতাসংবলিত নির্দেশনাও ছিল।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রচলিত সব আইন, অধ্যাদেশ এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ কালানুক্রমিকভাবে বাংলাদেশ কোড শিরোনাম ও আকারে প্রকাশ করতে হবে। ওই নির্দেশনার আলোকে বিলম্বে হলেও ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কোড আকারে ১৮৩৬ থেকে ১৯৩৮ সালের আইনগুলো ১১টি ভলিউমে প্রথম প্রকাশিত হয়। বর্তমান পর্যায়ে বাংলাদেশ কোড রেগুলেশন ও পুরোপুরি সংশোধনী আইন ব্যতীত, বাংলাদেশে বিদ্যমান সব আইন, অধ্যাদেশ ও রাষ্ট্রপতির আদেশ মোট ৩৮টি ভলিউমে কালানুক্রমিক ও বর্ণানুক্রমিক সূচিপত্রসহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে ১১টি ভলিউমে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ কোড’ বর্তমান প্রকাশনায় ভলিউম ১ থেকে ৮ এবং আংশিক ভলিউম ৯-এ পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং ১৯৩৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংকলিত আইনগুলো একত্রে ভলিউম ৯ থেকে ৩৮-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১৮৩৬ সালের পরে উত্তরাধিকারসূত্রে অতীতের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ওই সময়ে বলবৎ সংবিধানের আওতায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রণীত আইনগুলো বর্তমান কোডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ প্রবর্তনের পরে বাংলা ভাষায় প্রণীত সব আইন ভলিউম ২৭ থেকে ভলিউম ৩৮-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বাংলাদেশ কোডে এখন অনেক আইন রয়েছে যেগুলো বর্তমানে অকেজো।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রণীত এসব অকেজো আইন বাতিল করতে আইন বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে অনেক আগে থেকেই দাবি রয়েছে। এ ছাড়া কিছু আইন বাতিল করতে আইন কমিশনেরও সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু বাতিল হচ্ছে না সেসব আইন। আবার অনেক আইন রয়েছে বাস্তবে সেসবের কোনো প্রয়োগ নেই। তাই বাংলাদেশ কোড ভারি হচ্ছে দিনের পর দিন।

আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেক আইন রয়েছে যেগুলো আর চলে না। আরো কিছু আইন রয়েছে যেগুলো অমানবিক বলে বিবেচিত। তিনি বলেন, ‘যেমন চাবুক আইন নামে একটি আইন রয়েছে যেটি বাতিল করতে ২০১২ সালে সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এতে করে আমাদের দেশে এখনো এ রকম ভুতুড়ে আইন রয়ে গেছে। অনেক আইন হাস্যকরও বটে। অথচ বিশ্বে অনেক দেশ এ ধরনের শারীরিক শাস্তিসংক্রান্ত আইন অনেক আগেই বাতিল করেছে। ’

চাবুক আইন : চাবুক মারা বা বেত দিয়ে পেটানোর মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিধান এখনো বহাল। দেশে কয়েকটি আইনে এই বিধান বর্তমান। এগুলো হলো চাবুক আইন-১৯০৯, রেলওয়ে আইন-১৮৯০, অমানবিক পাচার দমন আইন-১৯৩৩, কারা আইন-১৮৮৪, কিশোর অপরাধ সংশোধন স্কুল আইন-১৯২৮, শিশু বিধি-১৯৭৬ ও ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮। দেশে যদিও এ শাস্তির প্রয়োগ নেই, তার পরও কাগজপত্রে আইনটি রয়ে গেছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে চাবুক মারা বা বেত্রাঘাতের বিধান নেই। বিশেষ করে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে বেত্রাঘাতসহ যেকোনো ধরনের শারীরিক শাস্তির বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শারীরিক শাস্তি দেওয়াটা একটি নৃশংস, অমানবিক ও অপমানজনক পদ্ধতি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিধান মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি একটি সেকেলে বিধান। সভ্য সমাজে এ রকম বর্বর শাস্তির বিধান থাকা উচিত নয়। যদিও আমাদের দেশে এই আইনগুলোর প্রয়োগ নেই, তবু সময় এসেছে এই আইনগুলো বিলুপ্ত করার। ’

জানা যায়, ২০০৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৮৩টি দেশে চাবুক মারা, বেত দিয়ে পেটানোসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক শাস্তির প্রথা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

টাউট আইন : অসাধু ব্যক্তির পরিচয় বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত করার দায়িত্ব সরকারের। ১৮৭৯ সালের টাউট আইনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্তাব্যক্তির হাতে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ আইনের ৩৬ ধারা অনুসারে, সুপ্রিম কোর্ট, জেলা জজ, দায়রা জজ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টরের নিচে নন এ রকম রাজস্ব কর্মকর্তা প্রত্যেকেই তাঁদের বা নিজ নিজ আদালতের এবং তাঁর অধস্তন আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে টাউটদের তালিকা তৈরি করতে পারেন। যেসব ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে ‘টাউট’ হিসেবে কাজ করে মর্মে তথ্য রয়েছে, এ তালিকায় তাদের নামই স্থান পাবে। মাঝেমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ তালিকা পরিবর্তন ও সংশোধন করতে পারেন। আইনজীবীরা বলছেন, এই আইনটি এখন অকার্যকর। কারণ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা করার বিধান রয়েছে। এই বিধান থাকার কারণে টাউট আইনের কোনো প্রয়োজন নেই। তার পরও রয়ে গেছে এই আইন।

উন্মাদ আইন : বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক একমাত্র বিদ্যমান পূর্ণাঙ্গ আইন হলো ‘উন্মাদ আইন-১৯১২’। আইনটি প্রণয়নের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত আধুনিক হলেও শতবর্ষের কালপরিক্রমায় এর প্রাসঙ্গিকতা ও সময়োপযোগিতা নেই। তাই এ-সংক্রান্ত একটি অধুনিক আইন করা জরুরি। আইন এবং স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের উন্নতিকে জনগণের দৈনন্দিন জীবনে সফলভাবে কাজে লাগাতে উন্নত দেশগুলোতে ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন’ প্রণীত হয়েছে। ব্রিটিশ-ভারতীয় আইনি কাঠামোয় ‘উন্মাদ আইন-১৯১২’ যেসব দেশে প্রচলিত ছিল সেসব দেশেও অনেক আগেই এই আইন বাতিল করে সময়োপযোগী মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণীত হয়েছে। ভারত ১৯৮৭ সালে মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করেছে। পাকিস্তানে ২০০১ সালে মানসিক স্বাস্থ্য অর্ডিন্যান্স হয়েছে। বাংলাদেশে এই আইন বলবৎ থাকা যুক্তিযুক্ত নয়।

বিষ আইন-১৯৫২ : এটি বিষ বা বিষাক্ত পদার্থ আমদানি, জমা রাখা ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের আইন। ভারত সরকার সর্বপ্রথম ১৯১৯ সালে বিষ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পয়জন্স অ্যাক্ট, ১৯১৯ জারি করে। পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনে আইনটি সংশোধিত হয়ে ১৯৫২ সালে পয়জন্স অ্যাক্ট, ১৯৫২ হিসেবে গৃহীত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে আইনটি সংশোধন করে। আইনের দৃষ্টিতে ‘বিষ’ বলতে এমন দ্রব্য বোঝায় যা অপেক্ষাকৃত অল্পমাত্রায় গ্রহণ করলেও মৃত্যু বা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আইনে বর্ণিত বিষকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। গ্রুপ-১ : মানুষের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিষাক্ত দ্রব্য এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। কেবল নিবন্ধনকৃত চিকিৎসকরাই এ ধরনের বিষ ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থাপত্র দিতে এবং লাইসেন্সধারী বিক্রেতারা বিক্রয় করতে পারেন। গ্রুপ-২ : এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত বিষাক্ত দ্রব্যগুলো মানুষের বিভিন্ন রোগের ওষুধ এবং জীবাণু প্রতিরোধক ও বালাইনাশক (যেমন—কীটনাশক, ইঁদুর জাতীয় প্রাণিনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো লাইসেন্সধারী ও লাইসেন্সবিহীন বিক্রেতা উভয়েই বিক্রি করেন। এ আইনের বিধিবিধান ছাড়াও ওষুধ আইন, ১৯৪০ অনুযায়ী বিষ বিতরণ ও বিক্রির সংস্থান রাখা হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, একই ধরনের দুটি আইন বলবৎ রাখার প্রয়োজন নেই। যেকোনো একটি আইন সংস্কার করে আরেকটি বিলুপ্ত করলেই চলে।

সাবালকত্ব আইন : বাংলাদেশে বলবৎ সাবালকত্ব আইন হাস্যকর আইনে পরিণত হয়েছে। ১৮৭৫ সালে প্রণীত এই আইনে সাবালকের সংজ্ঞাও স্পষ্ট নয়। তবে আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বয়স ২১ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি সাবালক হয়েছেন বলে অভিহিত হবে। এ ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ের সাবালকের ব্যাখ্যা নেই। বর্তমানে শিশু আইনে ১৮ বছর পূর্ণ হলেই প্রাপ্ত বয়স্ক বলে ধরে নিতে হবে। দুই আইনে দুই ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই সাবালকত্ব আইনটিও সংস্কার করা অথবা একটি আইনে রূপান্তর হওয়া যুক্তিযুক্ত বলে অনেকে মত দিয়েছেন।

কিশোর ধূমপান আইন : ১৯১৯ সালে প্রণীত হয় কিশোর ধূমপান আইন। ১৬ বছরের নিচের বয়সী কারো কাছে তামাক জাতীয় দ্রব্য বিক্রয় করলে এই আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। এতে প্রথমবার অপরাধ করার কারণে ১০ টাকা, দ্বিতীয়বার অপরাধ করার ক্ষেত্রে ২০ টাকা ও পরে ৫০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত বিচারে এই দণ্ড দেবেন বলেও আইনের ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের এ ধরনের অভিযান কখনো চোখে পড়েনি।

আইন কমিশনের সুপারিশ : ব্রিটিশ আমলে করা বেশ কিছু রেগুলেশনের আর কোনো প্রয়োজন নেই বলে আইন কমিশন এসব রেগুলেশন বাতিল বা অন্য আইনের সঙ্গে একীভূত করে সংস্কারের সুপারিশ করে ২০১১ সালে। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক রেগুলেশন রয়েছে ৩৫টি। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক স্বতন্ত্র আইন প্রণীত হওয়ায় এগুলোর আর প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া ১৭৯৯ সালের উইলস ও বাজেয়াপ্ত রেগুলেশন, দাতব্য বৃত্তিদান, জনগৃহ এবং বাজেয়াপ্ত রেগুলেশন, ১৮১০, অভিবাসী রেগুলেশন, ১৮১২, ১৮১৮ সালের রাষ্ট্রীয় বন্দি রেগুলেশন, ১৮২২ সালের সরকারের দায়মুক্তি, ১৮২৫ সালের সিকস্তি ও পয়স্তি রেগুলেশন, ১৮২৯ সালের রাজস্ব কমিশনার রেগুলেশন, ১৮২৯ সালের সতী রেগুলেশন, ১৮৩৩ সালের ভূমি রাজস্ব (সেটলমেন্ট ও ডেপুটি কালেক্টর) রেগুলেশনসহ ১৪টি রেগুলেশন বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।


মন্তব্য