রাজাকার পুনর্বাসনের টাকা এনে-333837 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


রাজাকার পুনর্বাসনের টাকা এনে ধনকুবের মীর কাসেম

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রাজাকার পুনর্বাসনের টাকা এনে ধনকুবের মীর কাসেম

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী ধনকুবের হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্য ‘গান গেয়ে’। দেশ স্বাধীনের পর স্থায়ীভাবে ঢাকায় আসেন মীর কাসেম, পরে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালিয়ে চলে যান লন্ডনে। সেখান থেকে সৌদি আরবে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতি, মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙার বর্ণনা আর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশি মুসলমানদের মানবেতর জীবনের কথা বলে তাদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ সহায়তা জোগাড় করেন তিনি। পরে ওই অর্থ মসজিদ-মাদ্রাসা পুনর্নির্মাণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যাণে ব্যয় না করে নিজেই ভোগ করতে থাকেন পুরোটা, গড়ে তোলেন এনজিও। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশে ফিরে আসা মীর কাসেম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্যপুষ্ট রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী নামের এনজিওর কান্ট্রি ডিরেক্টর হন। সেই এনজিওর অর্থে তিনি একের পর এক গড়ে তোলেন ব্যবসায়িক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

সেই থেকে জামায়াতের সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহে সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগানদাতা মীর কাসেম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিস্ট নিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের নেতৃত্বেও ছিলেন হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক মীর কাসেম আলী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল জামায়াত নেতাদের মধ্যেই নয়, গত তিন দশকে দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ীতে পরিণত হন মীর কাসেম আলী। ব্যাংক, হাসপাতাল, কৃষি ব্যবসা, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তার করেন তাঁর ব্যবসা। এসব ব্যবসা থেকে বিপুল আয়ের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করতেন জামায়াতের রাজনীতির পেছনে, বিভিন্ন নামে গড়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। তবে তাঁর নিজের নামে সম্পদের পরিমাণ বেশ কম। তাঁর বেশির ভাগ সম্পত্তিই বিভিন্ন নামে গড়ে ওঠা ট্রাস্ট, কম্পানি ও বেসরকারি সংস্থার নামে। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে মীর কাসেম আলী যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়া অন্য জামায়াত নেতাদের বাঁচাতে, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করে বাধাগ্রস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী লবিস্ট নিয়োগ করেছিলেন বলে তথ্য রয়েছে। ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল তখনকার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মীর কাসেম আলী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ প্রশ্নবিদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লবিস্ট ফার্মকে আড়াই কোটি ডলার দিয়েছেন। লবিস্ট ফার্মটির সঙ্গে ওই চুক্তির কপি এবং টাকা দেওয়ার রসিদ সরকারের কাছে রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমের রায়ের কয়েক দিন আগেও ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ করতে লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন করেন।

ঢাকা কর অঞ্চল-৫-এ সার্কেল ৫০-এর করদাতা মীর কাসেম আলী। তাঁর কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন ০৭৬-১০৩-৯৬৬৩। ২০১০ সালে তাঁর দেওয়া আয়কর রিটার্নে মোট ব্যক্তিগত সম্পদ দেখানো হয়েছে তিন কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৪ টাকার। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর নামে থাকা শেয়ারের মূল্য এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা। রিটার্নে তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৫২৯ টাকা। ব্যাংকে নগদ টাকার পরিমাণ দেখানো হয় ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭০১ টাকা।

২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে তাঁর নাম বাতিল করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাসেম আলী বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের মালিকানা বহাল রয়েছে। বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটিতে তাঁর নামে এখনো এক লাখ ১৯ হাজার ৫৩৪টি শেয়ার রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কম্পানির মোট ২৭ হাজার ২৭৭টি শেয়ার রয়েছে তাঁর নিজ নামে। তিনি ও তাঁর স্ত্রী খোন্দকার আয়েশা খাতুন এবং তাঁদের দুই ছেলে, তিন মেয়ের নামে বিভিন্ন কম্পানির শেয়ার রয়েছে।

ঢাকার মিরপুরের দক্ষিণ মনিপুরে ২৮৭ নম্বর প্লটের বহুতল ভবন মীর কাসেম পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর ব্যক্তি নামে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একতা সোসাইটির পাঁচ কাঠা জমি ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের চালায় সাড়ে ১২ শতক জমি রয়েছে। তিনি ধানমণ্ডির বহুতল ভবন কেয়ারি প্লাজার অবিক্রীত ১৭৮.৬৯ বর্গমিটারের মালিক।

মীর কাসেম আলীর মালিকানা রয়েছে, এমন বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের মোটা অঙ্কের ঋণের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছিল তখন। তবে ঋণগুলোর কোনোটিই খেলাপি ছিল না।

কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনসের মধ্যে চলাচলকারী কেয়ারি নামের পাঁচটি বিলাসবহুল নৌযান রয়েছে মীর কাসেমের। তিনি ইডেন শিপিং লাইনসেরও চেয়ারম্যান।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একাত্তর-পরবর্তী সময়ে জামায়াত ও তাদের সহযোগী সংগঠন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালায় যে বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা ভেঙে ফেলেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। শহীদ করেছেন হাজার হাজার রাজাকার, আলবদর ও আলশামস সদস্যদের। ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ-মাদ্রাসা পুনরায় নির্মাণ ও মৃত রাজাকার-আলবদরদের পরিবার পরিচালনার জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক অর্থ সহযোগিতা পায়। এসব অর্থ লেনদেনের লবিস্ট হিসেবে কাজ করে আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম। তখনই মীর কাসেম হয়ে ওঠে অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থীরাই ক্ষমতায় ছিল বেশি সময়। মীর কাসেমও এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরো অর্থ আনার সুযোগ পায়। সেই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে তার পরিমাণ হাজার গুণে বৃদ্ধি করে।’

যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা নিয়েও সরকারের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মীর কাসেম আলীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত নেই। মীর কাসেম আলী এ দেশের নাগরিক। আদালত তাঁকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। তার মানে এই নয় যে, তাঁর সম্পত্তি সরকারের অধীনে বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। কাসেম আলীর সম্পত্তি তাঁর সন্তানরাই দেখাশোনা করবেন। রায় কার্যকর হলে তাঁর উত্তরাধিকাররা এসব সম্পত্তির মালিক হবেন। এ জন্য ইসলামের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি রয়েছে।

মন্তব্য