kalerkantho

নাম তার ‘মহুয়া’

২০০ বছরের পুরনো গাছ!

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



২০০ বছরের পুরনো গাছ!

মিরসরাইয়ের মিঠানালা রামদয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরপাড়ে গাছটি দেখতে উত্সুক জনতা ভিড় জমান প্রায়ই। ছবি : কালের কণ্ঠ

উপজেলার মিঠানালা রামদয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরপাড়ে প্রায় ২০০ বছরের একটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। বছরের পর বছর গাছটি নিয়ে এলাকার মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই।

স্থানীয়দের দেওয়া ‘হানজ্ ফল’ নামেই এটি পরিচিত।

তবে গাছটির নাম ‘মহুয়া’। যার বৈজ্ঞানিক নাম‘Madhuca Longifolia অথবা Madhuca Indica। এটি মধ্যম থেকে বৃহৎ আকারের একটি বৃক্ষ। এটির বৃন্ত ছোট, ফুল লম্বাকৃতির ও ফল ডিম্বাকার।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, নন্দ কেরানী নামে এক ব্যবসায়ী শখের বসে নিজের পুকুরপাড়ে গাছটি লাগিয়েছিলেন। এটি আনা হয়েছিল তৎকালীন বার্মা (মিয়ানমার) রেঙ্গুন শহর থেকে। গ্রামবাসীর কাছে গাছটির প্রাকৃতিক আচরণ রহস্যময়! তাঁদের ধারণা, এই গাছে বসন্তকালে এক ধরনের ফল ধরে। যা দিনে ধরে এবং দিনেই পেকে খাওয়ার উপযোগী হয়।

তাঁরা স্থানীয় ভাষায় গাছটির নাম দিয়েছে ‘হান্জ ফল’। প্রকৃত বাংলায় যার অর্থ ‘তাত্ক্ষণিক ফল’। শুধু তাই নয়, এটিকে সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক সৃষ্টি মনে করে মানতও করেন অনেকে। চলে পূর্জা-অর্চনা।

জানা গেছে, ‘বিরল গাছ’ হিসেবে ২০১২ সালে গাছটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা গাছের গুণগত মান, ফলের খাদ্যমান, ওষুধি গুণ এবং চারা তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করছি। ’ গাছটির প্রকৃত নাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এটির বৈজ্ঞানিক কোনো নাম আমরা এখনো জানতে পারিনি। ’

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ গাছটির ফল, শাখা-প্রশাখার ছবি দেখে জানিয়েছে, এটি দেশের আরো কয়েকটি স্থানেও আছে তবে সংখ্যায় কম। ভারতে খুব পরিচিত গাছ এটি। এই গাছকে সংস্কৃতে ‘মধুকা’, হিন্দিতে ‘মহুয়া’ বা ‘মউয়া’ নামে পরিচিত। ভারতের গুজরাট, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যা, তামিল নাড়ু, পশ্চিমবঙ্গসহ উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র কমবেশি গাছটির দেখা মেলে। জায়গা ভেদে নামে তফাত দেখা যায়। তবে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে কবি নজরুল তাঁর একাধিক কবিতা ও গানে ‘মহুয়া’ ফুলের বন্ধনা করেছেন। এছাড়া এদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গানেও মহুয়ার উপস্থিতি উল্লেখ করার মতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘দেশে শতবর্ষী গাছের সংখ্যা কম। এদিক থেকে এ গাছের গুরুত্ব অনেক। গাছটি ঘিরে মানুষের একটু বাড়তি আগ্রহ খারাপ কিছু না। বরং গাছটিকে টিকিয়ে রাখতে এটি বেশ কাজে দেবে। তবে এই গাছের নাম মহুয়া, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। ’

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে (বাংলা ফালগুন) ভোরে ডালে শোভা পায় ফুল, সূর্যোদয়ের মুহূর্তে কিছুটা ফলের আকৃতি ধারণ করে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই আবরণ আর রং বদলে এটি ধারণ করে সাদা। ১০ ঘণ্টা সময়ে পেকে খাওয়ার উপযোগী হয়। এছাড়া গ্রীষ্ম-বর্ষায় অন্য একটি ফল ধরে এই গাছে। শুধু বসন্তকালে নয়, গ্রীষ্মের শেষ এবং বর্ষার শুরুতেও ওই গাছে এক ধরনের ফল ধরে। এ বিষয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জানান, বসন্তে যাকে মানুষ ফল ভেবে বসে আছে প্রকৃত অর্থে তা ফল নয় ফুল। বসন্তকালে ফোটা ফুলের গর্ভাশয় থেকে গ্রীষ্মকালীন ফলটির উদ্ভব হয়।

স্থানীয়রা জানান, বসন্তের ফলটি খেতে খুব মিষ্টি। তবে গ্রীষ্মের ফলটিকে তাঁরা ফল ভাবতে রাজি নন। তাঁদের মতে, এটি ফল নয় এক ধরনের গোটা (বীজ)। এটি খেতে সুস্বাদু নয়।

এ প্রসঙ্গে মিঠানালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সফিউল আলম বলেন, ‘গাছটির প্রকৃত পরিচয় না জানার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে এটি নিয়ে প্রচুর কৌতূহল আছে। এলাকার সবাই এটিকে ‘হানজ্ ফল’ গাছ নামেই চেনে। এটির বয়স হবে প্রায় ২০০ বছর। ’

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিঠানালা গ্রামের হানজ্ ফল (মহুয়া) গাছটির ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু চারাগাছ রোপণের অল্প সময়ে মারা যায়। গত ১০০ বছরের ইতিহাসে অনেক চারা উৎপাদন এবং রোপণ করা হলেও চারাগাছটির বয়স ৪-৫ বছর হতে-না হতেই মারা যায়। কলম কিংবা ডাল ভেঙেও এলাকার মানুষ চারা উৎপাদনে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

মধ্যম মিঠানালা গ্রামের ৭২ বছর বয়সী খোরশেদ আলম শখ করে ২০১০ সালে বাড়ির আঙিনায় দুটি চারাগাছ লাগান। ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি গাছ এখনো সবল-সতেজ আছে। তবে খোরশেদ বলেন, ‘এর আগে যারা গাছের ছোট চারা এনে লাগিয়েছেন কেউই গাছটি বড় করতে পারেননি। আমার গাছটিও হয়তো মারা যাবে। ’

‘মহুয়া’ নিয়ে কাজ করে ভারতের রাজস্থানভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘জাত্রফা’। জাত্রফার ওয়েব সাইট ঘেঁটে জানা যায়, এটি মধ্য ভারতের আদিবৃক্ষ। শুষ্ক অঞ্চলের গাছ হলেও আর্দ্র কোমল আবহাওয়াতেও ভালো জন্মায়। শীত মৌসুমে এটির সব পাতা ঝরে যায়। ভেষজগুণে সমৃদ্ধ ‘মহুয়া’। পাতা, বাকল, ফুলের নির্যাস ও তেলবীজ নানা রোগের চিকিৎসায় বহুকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। মৌসুমি সর্দি কাশি, অগ্নিমন্দ্য, আন্তিক রোগ, অর্শ, বাত-ব্যথা ও মাথার ব্যথা নিরাময় হয়। তাছাড়া পুরানো ক্ষত ও কীট দংশনেও এটি বিষ ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। সাঁওতালেরা মশার কামড় যন্ত্রণা ও কীটপতঙ্গের দংশনের ক্ষেত্রে মহুয়া বীজের তেল ব্যবহার করে। এ তেলের নির্যাস আদিবাসী সাঁওতালদের প্রিয় পানীয়। মহুয়া গাছের ফুল থেকে এক ধরনের মদ তৈরি হয়। ভারতের মহারাষ্ট্র ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ এবং ছত্রিশগড়ের সাঁওতাল ও অন্যান্য উপজাতীয় সম্প্রদায় এই মদ তৈরি করে। জনশ্রুতি আছে, এ মদ খেলে হাতিরও নেশা হয়।


মন্তব্য