kalerkantho


ভোর | কানিজ ফাতেমা তিশা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২২:২২



ভোর | কানিজ ফাতেমা তিশা

অ্যালার্মটা বাজলো না কেন আজ? এই ঘড়িটার যে কি হয় মাঝে মাঝে কে জানে! তাই বলে আজই? ধুর, দেরি হয়ে গেলো। ৯টায় বের হওয়ার কথা আর এখন ৯.৩০ বাজে! না খেয়েই বের হলাম বাসা থেকে, উদ্দেশ্য কিছুই না আবার অনেক কিছু। আজ ভোরে সাদিদ আসছে ঢাকা থেকে ওর সাথেই দেখা করতে যাচ্ছি। ওর যশোর আসার একটাই কারণ, আমি।

মাঝে মাঝে খুব অবাক হই শুধু আমার জন্যে একটা ছেলে সুদূর ঢাকা থেকে যশোর চলে আসে কতটা বিশ্বাস আর ভরসা নিয়ে। আজ আমাদের দ্বিতীয়বারের মতো দেখা হবে। প্রথম দেখা হওয়াটা অনেক বড় সারপ্রাইজের মতো ছিল। আমাদের সম্পর্কটা আর পাঁচটা সাধারণ সম্পর্কের মতো না। পরিচয়টা আমার ফ্রেন্ডের সূত্র ধরে হলেও সেটা অসাধারণের মতই। আমার ফ্রেন্ডের মুখে তার দূর, দূর এবং দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের গল্প শুনেই তাকে না দেখেই হঠাত প্রথম এসএমএস করা,
'Are You Sadid?'  
হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। এসএমএসটা ফেসবুক বা হোয়াটসএপে দেইনি, কারণ আমার তো ঐসব কিছুই নেই এমনকি যে নাম্বার থেকে এসএমএস সেন্ড করেছি সেটাও আম্মুর নাম্বার। মানে আমি তো ফোনই ব্যবহার করি না। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। আর এখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে কিন্তু এখনও সে সব কিছুই ব্যবহার করি না। অবাক হচ্ছেন!

না, অবাক হবেন না প্লিজ কারণ এখনও এমন মেয়ে আছে। তারপর অনেকক্ষণ পর সেই এসএমএস এর রিপ্লাই আসে 'Yes'। তারপর থেকে এসএমএস এ কথা বলা শুরু, মাঝে মাঝে চুরি করে আম্মুর ফোন থেকে কথা হতো। এ রকম কথা বলতে বলতে কখন যে তাকে না দেখেই তার প্রেমে পড়ে গেছি বুঝতেই পারিনি। তারপর থেকে শুরু হয় চিঠি লেখা। সারা সপ্তাহের অবসান ঘটিয়ে প্রতি শনিবার দু’জন দুজনের চিঠি পড়ি আমরা।
এই রিকশা, দাঁড়ান দাঁড়ান এখানে।
সাদিদ আগে থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছে। জানতাম আমার দেরি হয়ে যাবে।
সরি দেরি হয়ে গেলো আসতে।
ইটস ওকে।
আসতে প্রবলেম হয়নি তো?
নাহ।
হোটেল কেমন?
ভালোই, খারাপ না। একটু আগেই তো উঠলাম দেখি কি হয়!
সাদিদের যশোর কেউ নেই তাই থাকার জন্যে হোটেলে উঠতে হয়েছে। আর আমার যে ফ্রেন্ড ওর আত্মীয় ওদের বাসায় তাদের যাওয়া আসা নেই।
চলো, কোথাও বসি।
একটা রেস্টুরেন্টের ছাদের বসার জায়গা আছে ওখানে গিয়ে বসলাম। মাথার ওপর পুরোটাই মুক্ত আকাশ।
আচ্ছা সাদিদ, তোমার একা একা এতো দূর আসতে ভয় করে না?
ও মা, ভয় করবে কেনো আমি তো বাচ্চা না ভার্সিটি লাস্ট ইয়ারে পড়ি। আর সবচেয়ে বড় কথা ভালোবাসা ভয়কে জয় করতে জানে। আমি তোমাকে ভালোবাসি অবনী।
তাই বুঝি?
জ্বী, ম্যাডাম।
সাদিদ
হ্যাঁ
একটা কথা বলবো?
 তোমার কথা শুনতেই তো এতো দূর আসা। বলো… :
না, আগে চোখ বন্ধ কর। আমিও চোখ বন্ধ করে বলবো তাহলে দেখবা ম্যাজিক হচ্ছে। পাগলি আমার। আচ্ছা করলাম বলো..
কাল ভোরে তুমি আর আমি বের হবো। সাথে একটা সাইকেল নিবো। দু’জন শীতের সকাল দেখবো। তুমি সাইকেল চালাবা আর আমি পিছনে বসবো। আমরা অনেক দূর যাবো সাথে থাকবে ঘন কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাস। যে বাতাস গায়ে লাগলে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেঁপে উঠবে।আমি তখন তোমার আরো কাছে যাবো তোমার শরীরের উষ্ণতার লোভে। তারপর একটা ছোট চায়ের দোকানে বসে চা খাবো। ঘাসের পড়ে থাকা বিন্দু বিন্দু শিশিরের ভালোবাসা দেখবো। যাবা তো তুমি?
হ্যাঁ, যাবো। তোমার সাথে ঘুরার জন্যে একটা পৃথিবী তো কম জায়গা।
আচ্ছা, চলো উঠি কাল ভোরে দেখা হচ্ছে তাহলে…

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল, ভোর হয়ে গেছে প্রায়। নাহ, সাদিদ আসেনি। আসার কথাও না। সাদিদ আর অবনীর কাছে আসবে না, অনেক দূরে চলে গেছে সে। তবুও অবনী প্রায় সময় এই স্বপ্নটা দেখে, তাদের শেষ দেখায় এই কথাগুলোই হয়েছিল কিন্তু ওদিন রাতেই সাদিদ হোটেল থেকে বের হয়ে রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে না ফেরার দেশে চলে যায়। অবনী তার জন্যে এখনও অপেক্ষা করে, এখনো প্রতি ভোরে অবনী স্বপ্ন দেখে তারা সেই ভোরে সাইকেলে করে ঘুরতে বের হয়েছে। শুধু সাদিদ আর অবনী।

শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।



মন্তব্য