kalerkantho


বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চায় মূল্যবান সংযোজন

‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’

হাসান মেহেদী   

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০৩:৪২



‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’

ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলা ভাষা হাজার বছরের ঐতিহ্যে ঋদ্ধ। বিচিত্র-সংস্কৃতি আর বর্ণিল পেশার জনগোষ্ঠীর এই ভাষার রয়েছে অগণিত উপভাষা।

পাহাড়-টিলা আর নদী-বিধৌতা চট্টগ্রামের এবং পাশের জেলা কক্সবাজারের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর কথ্য ভাষা  চট্টগ্রামের এই উপভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ এনামুল হক চট্টগ্রামের এই উপভাষাকে ‘চট্টগ্রামী বাংলা’ অভিধায় ভূষিত করে এর মহিমাই কেবল বাড়াননি, অন্য উপভাষা থেকে এ উপভাষার স্বাতন্ত্র্যের দিকটিও তুলে ধরেছেন।  

খানিকটা তফাৎ পরিদৃষ্ট হলেও ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য চট্টগ্রামী বাংলায় উপরোল্লিখিত জেলা দু‘টি ছাড়াও ভারত ও মায়ানমারের বড় একটি জনগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলেন। কম-বেশি ১৩ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর এই কথ্য ভাষাটি বয়েসে যেমন আনকোড়া নয়, তেমনি তার অর্জনও নিতান্ত খেলো নয়। বরং প্রমিত বাংলার সাথে পাল্লা দিয়ে যেন চট্টগ্রামী বাংলাও অর্জনের ঝুড়িটি পূর্ণ করে চলেছে নিয়ত। তাইতো প্রমিত বাংলার অন্যতম ভাষিক উপাদান হিসেবে প্রবাদ-প্রবচন শাখাটি যেমন সমৃদ্ধ তেমনি চট্টগ্রামী বাংলার প্রবাদ-প্রবচনও নিতান্ত কম নয়।
 
অর্থশাস্ত্রের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও চৌকস শিক্ষা-প্রশাসক হয়েও মৌলিক গবেষক হিসেবে লব্দ-প্রতিষ্ঠ শিমুল বড়ুয়া চট্টগ্রামী বাংলার সমৃদ্ধ এই শাখাটি নিয়ে কাজ করার প্রয়াস পেয়েছেন। এর আগে এই বিষয়টি নিয়ে কিছু কাজ হলেও শিমুল বড়ুয়ার বিস্তৃত ও নিবিড় গবেষণার ফল হিসেবে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’ বইটির বিশেষত্ব চট্টগ্রামী বাংলায় আগ্রহীদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে।

শিমুল বড়ুয়া মোটা দাগে গ্রন্থটিকে ছয়টি ভাগে ভাগ করেছেন।

প্রথম মুখবন্ধ দু‘টিতে মূল গ্রন্থের বিশেষত্বের দিকটি বাদেও উদ্দীষ্ট বিষয়ের পরিচিতি মূলক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এরপর প্রসঙ্গকথায় লেখক তাঁর গ্রন্থ-রচনার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। গ্রন্থের মূল ভাগে “চট্টগ্রামের লোকসাহিত্য: প্রবাদ-প্রবচন” অংশে লেখক বিস্তৃত আলোচনা করে চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যের নানা শাখা-উপশাখার পরিচিতি তুলে ধরেছেন। এ অংশে লেখক শিমুল বড়ুয়া প্রাসঙ্গিক উদাহরণসহ চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যের একটি গ্রহণযোগ্য শ্রেণিবিভাগ দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

সংযুক্ত ভিন্ন প্রবন্ধে তিনি চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচনের পরিচয়, ভাষিক বৈশিষ্ট্য, বিশেষত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। ‘সংগৃহীত চট্টগ্রমের প্রবাদ-প্রবচন’ অংশে বিষয়ভিত্তিক প্রবাদ-প্রবচনগুলোর সন্নিবেশ গ্রন্থটির বিশেষত্বের অন্যতম একটি দিক। লেখক এখানে ৫৩টি বিষয় বিভাজনের মাধ্যমে সংগৃহীত প্রবাদগুলো সাজিয়েছেন। বিষয় বিভাজন করতে গিয়ে চট্টগ্রামের সাধরণ মানুষের আটপৌরে জীবন থেকে উপজীব্য সংগ্রহ করার দিকটি লেখকের মনোযোগ এড়িয়ে যায়নি।  

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিভাজনের শিরোনাম এরকম: ‘অতিকথন-কর্ম’, ‘অভাগা-ভাগ্যবান’, ‘অভাব’, ‘অভ্যাস-স্বভাব’,‘ আচার- আচরণ’, ‘ আপন-পর’, ‘আবহওয়া’, ‘কুসংসংস্কার-কুপরামর্শ’, ‘কৃষি-চাষাবাদ’, ‘খাদ্যবিষয়ক’, ‘নারী সম্পর্কিত’,  ‘বিয়েশাদি’, ‘শরীর-স্বাস্থ্যবিষয়ক’, ‘হিতোপদেশ’। এই বিষয় বিভাজনের মধ্য দিয়ে লেখক চট্টগ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা, আচার-সংস্কৃতি বলতে গেলে পুরো চট্টগ্রামকে তুলে এনেছেন। আর এই অনন্য কাজটির মৌলিকত্ব হলো এই প্রবাদগুলো লেখক নিজে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সহায়ক গবেষকের মাধ্যমে মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করেছেন। ফলতঃ এই বিভাজনের বিশুদ্ধতার দিকটি অনেকাংশে রক্ষিত হয়েছে বলা যায়। এখানেই লেখক শিমুল বড়ুয়ার বিশেষত্ব।
 
লেখকের কৃতিত্বের আরেকটি দিক হলো তিনি প্রতিটি প্রবাদ-প্রবচনে আঞ্চলিক দুর্বোধ্য শব্দের প্রমিত বাংলা অর্থ সংযুক্ত করে দিয়েছেন। এতে চট্টগ্রামের বাইরের পাঠকরা সহজেই প্রবাদ-প্রবচনগুলোর অর্থ বুঝতে পারবেন। প্রতিটি প্রবাদ-প্রবচনের মর্মার্থ সংযোজন করাতে উদ্দীষ্ট ভাব বোধগম্য হতে আরো বেশি সহায়তা করবে। এর বাইরে অঞ্চলভেদে চট্টগ্রামী বাংলার উচ্চারণবৈচিত্র্য ও ব্যাকরণিক ভিন্নতা বিষয়ে তিনি যে বিশদ আলোচন করেছেন, তা ভাষাজ্ঞানে তাঁর দক্ষতার পরিচয় দেয়। পরিশিষ্ট অংশে লেখক চট্টগ্রামের উপভাষা ও লোকসাহিত্য নিয়ে কাজ করা পথিকৃৎ বিদ্ধৎজনদের সচিত্র-নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা লেখকের কৃতঋণ প্রকাশের উদারতার পরিচায়ক।

‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’ গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণের দিক হলো এই গ্রন্থের সারাৎসার নিয়ে বিস্তীর্ণ আলোচনামূলক ভূমিকা লিখেছেন ভাষাবিজ্ঞানী, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য প্রফেসর ড. পবিত্র সরকার আর বাংলাদেশের খ্যাতিমান ভাষাবিদ, একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক-গবেষক প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান।

প্রফেসর ড. পবিত্র সরকার বইটি সম্পর্কে লেখেন, চট্টগ্রামী উপভাষা বাংলার একটি অতি সমৃদ্ধ ও বিশিষ্ট উপভাষা, ফলে এর প্রবাদ-প্রবচনের ভাণ্ডারও যে সমৃদ্ধ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি খুব আনন্দিত যে শ্রী শিমুল বড়ুয়া ‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেছেন, এবং অভিজ্ঞতা ও ভাষাবোধের নান্দনিক রূপ-এই দু’দিক থেকেই এই প্রবাদগুলির বিচার করেছেন। আমি তাঁর নিষ্ঠা ও বিচারবোধে মুগ্ধ হয়েছি। প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান তাঁর ভূমিকায় উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামের এই সম্পদ আহরণের ও তার যথার্থ বিশ্লেষণের যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব তা আগামী গবেষকদের কাছে অমূল্য হয়ে থাকবে। এ যুগে এমন একনিষ্ট ও শ্রমদায়ী অন্বেষক আমাদের মাঝে খুবই বিরল। অধ্যক্ষ শিমুল বড়ুয়ার কাল সচেতনতা, বিষয়জ্ঞান এবং নিষ্ঠা আমাদের সমাজে আদর্শ হয়ে থাকুক।
 
চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের বিস্তৃত আলোচনা এবং সংগৃহীত আটশত পঞ্চাশটি প্রবাদ-প্রবচন নিয়ে প্রকাশিত এ গ্রন্থটি নি:সন্দেহে বাংলা লোকসাহিত্য গবেষণায় সমৃদ্ধ সংযোজন। লোকসাহিত্যের শিক্ষার্থী, গবেষক ছাড়াও সব শ্রেণির পাঠকের নিকট সমাদৃত হওয়ার মত তথ্য ও তত্ত্ব সংযোজিত হওয়ায় ‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’ গ্রন্থটি চট্টগ্রামের উপভাষা তথা ‘চট্টগ্রামী বাংলা’ ভাষার ঐশ্বর্যের দিকটি আরেকবার বিশ্বদরবারে তুলে ধরলো বলা যায়। এই গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বের দিক হলো প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনাশ্রয়ী, লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিস্মৃতপ্রায় প্রজন্মের নিকট চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ হলেও ধারণা দেবে। লেখক শিমুল বড়ুয়া ‘চট্টগ্রামের প্রবাদ-প্রবচন’ গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর সহধর্মিনী লিপিকা বড়ুয়া লিপিকে।
 
গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের খড়িমাটি। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন মনিরুল মনির। মনোরম বোর্ড বাঁধাই আর উন্নতমানের কাগজে বইটির দাম রাখা হয়েছে তিনশত টাকা মাত্র। হাতেগোনা কয়েকটি মুদ্রণপ্রমাদ বাদ দিলে গ্রন্থটিকে সর্বাঙ্গ সুন্দর বলা যায়। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

লেখক : হাসান মেহেদী


মন্তব্য