kalerkantho


অপরূপ বাংলাদেশ

ডাকো সাধুর বাঁশের কারুকার্য

বাঁশ দিয়ে নানা রকম শৈল্পিক জিনিস তৈরি করেন নীলফামারীর ডাকো সাধু। আসল নাম ধনঞ্জয় রায় (৭২)। তাঁর শিল্পকর্ম দেখতে গিয়েছিলেন ভুবন রায় নিখিল

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ডাকো সাধুর বাঁশের কারুকার্য

নীলফামারী জেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের পলাশবাড়ী ইউনিয়নের খলিশাপচা গ্রামে তাঁর বাড়ি। এলাকার মানুষ ডাকে ডাকো সাধু। একসময় ছিলেন বাঁশ দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরির কারিগর। তাঁর নিখুঁত হাতে তৈরি হয়েছে অনেকের ঘর। বাঁশের ঘর তৈরিতে শৌখিন মানুষের কাছে তাঁর বেশ কদর ছিল। ওই বাঁশের কাজ করতে করতেই তার মন যায় শিল্পের দিকে। তৈরি করেন জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য, মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তানি সেনার প্রতিকৃতি, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। নিজের খেয়ালে বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছেন গ্রামবাংলার নৌকা, মাঝি, গায়ের বধূ, কুমির, হরিণ, ময়ূরসহ নানা ধরনের পশুপাখি, শিশুদের পাঠশালা, জাতীয় পতাকা। এসব শিল্পকর্ম দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে।

দেখতে পেলাম বাড়ির আঙিনা ও বারান্দায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা শিল্পকর্ম। কাপড় দিয়ে বাঁশের তৈরি স্মৃতিসৌধটি পরিষ্কার করছিলেন শিল্পী।

তিনি জানান, দরিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করে বড় হতে হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেই অভাবে দিনমজুরি শুরু করেন। সে পেশায় একসময় বাঁশের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। তখন ডাক পড়ত বাঁশের বাড়িঘর তৈরির কাজে। সে সময় আঞ্চলিক নাম ‘ছকরবন’ (বাঁশ দিয়ে ঘর বানানোর কারিগর) হিসেবে পরিচিত হন তিনি। অনেক শৌখিন মানুষ বাড়ি-ঘরের কাজ করাতে তাঁকে ডেকে পাঠাতেন। সেসব কাজের ফাঁকে চলত বাঁশের শিল্পকর্ম চর্চা। সামান্য দিনমজুরির আয়ে সংসার চালিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলেন নিজের শিল্পভাণ্ডার।

দিন কেমন কাটছে—জবাবে বলেন, ‘বাড়িতে বসে বাঁশের জিনিসপত্র তৈরি করছি। পশুপাখি ছাড়াও বিভিন্ন মূর্তি তৈরি করে বিক্রি করছি। কিন্তু যে দাম পাই তাতে বাঁশের দাম মিটিয়ে তেমন কিছু থাকে না। মূলধন থাকলে বাঁশের তৈরি শিল্পকর্ম শহরে বিক্রি করে লাভ করতে পারতাম। আগে যে দিনমজুরির কাজ করতাম, বয়সের ভারে এখন আর সেটিও করতে পারছি না। ’ এখন আয়ের একমাত্র উৎস বাজারে ছেলে প্রদীপের পানের দোকান।

ধনঞ্জয় রায়ের স্ত্রী সুন্দরীবালা রায় (৬৫) বলেন, ‘স্বামীর কাজ দেখে সকলেই মুগ্ধ হন। কিন্তু অভাবের সংসারে আমরা খুবই কষ্টে আছি। ’

খলিশাপচা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি ৯ মাস। আর আমাদের বাঁশের শিল্পী ধনঞ্জয় রায় তাঁর শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে যুদ্ধ করছেন সারা জীবন। ’

শিল্পের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এই শিল্পীর। তিনি বলেন, ‘বাঁশের কাজ করতে করতে ওই বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন শিল্পকর্মের চর্চা করেছি। একপর্যায়ে সেটি ছেড়ে সন্ন্যাস জীবনের খেয়াল চাপে। ওই খেয়ালে বিভিন্ন মন্দিরে কাটাই জীবনের ১৪টি বছর। সেখান থেকে পরিচিত হই ডাকো সাধু হিসেবে। একপর্যায়ে সংসারজীবনে ফিরে আবারও বাঁশের কাজে মনোনিবেশ করি। ’

এ বছর জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তাঁর তৈরি পণ্যের একটি প্রদর্শনী হয়েছে। ফলে আরো অনেক বেশি ছড়িয়েছে তাঁর নাম। পলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মমতাজ আলী প্রামাণিক বলেন, ‘তিনি বাঁশের কাজ এত নিখুঁতভাবে করেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমি তাঁর বাড়ি অনেকবার গিয়েছি। ’


মন্তব্য