kalerkantho


শিকড়ের টানে, শিকড় সন্ধানে ...

সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু   

২ নভেম্বর, ২০১৮ ০৯:০২



শিকড়ের টানে, শিকড় সন্ধানে ...

অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জির হৃদয়ে নিঃশব্দে, নিরন্তর বয়ে চলা একটি নদী আছে। নদীর নাম মানিকগঞ্জ। যে মানিকগঞ্জের পলি-জলে বড় হয়েছিলেন তাঁর পিতা, পিতামহসহ স্বজনেরা। 

মানিকগঞ্জের মাটিকে, আলো, বাতাসকে কখনও ছুঁয়ে দেখেননি অভিজিৎ। তবুও অসীম মায়া, গভীর, নিবির টান বুকের গভীরে বয়ে চলেছেন শৈশব থেকে।

তিনি জন্মেছেন কলকাতা শহরে,বড়ও হয়েছেন সেখানে । অধ্যাপনা করেন ভারতের বিখ্যাত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে।

ব্যস্তমানুষ,গুণী মানুষ,বরেণ্য মানুষ অভিজিৎ মুখার্জি শৈশবেই দাদুর মুখে,বাবার মুখে,পিসির মুখে হাজার বার শুনেছেন মানিকগঞ্জের নাম,শুনেছেন মানিকগঞ্জ শহরের দাশড়া গ্রামের কথা। যে গ্রামে ছিল তাঁদের পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি।

দাদু বেঁচে নেই,বাবা নেই,কেবল কাকু আছেন। আমেরিকার বোস্টনবাসী কাকু এখনও বয়ে চলেছেন মানিকগঞ্জের হিরন্ময় স্মৃতি,জন্মস্থানের স্মৃতি।

অশিতিশপর কাকুর কাছে কি কলকাতা, কি বোস্টন, কোন কিছুই প্রিয় নয়,তাঁর কাছে এখনও ভূ-স্বর্গ,জন্মভূমি মানিকগঞ্জ। অশতিপর কাকুর স্মৃতিতে মানিকগঞ্জ ছাড়া পৃথিবীর কোন অস্তিত্ব এখনও নেই।

গত ২৮ অক্টোবর অভিজিৎ মুখার্জি এসেছিলেন মানিকগঞ্জের দাশড়ায়, আমাদের প্রিয়জন কচি ভাইয়ের বাসায়।
তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তরুণ সাহিত্যিক, সাংবাদিক অলাত এহসান।

অভিজিৎ মুখার্জি বুকভরে শ্বাস নিয়েছেন দাশড়া গ্রামের আলো হাওয়ায়। যেখানে এককালে শ্বাস নিয়েছেন,বড় হয়েছেন তাঁর স্বজনেরা।

দাশড়ার কোথায় তাঁদের বাড়ি ছিল ঠিক করে জানা নেই তাঁর। জানা নেই সেকালের প্রতিবেশীদের নাম-পরিচয়। কেবল মনে আছে দাদু, কাকু, পিসি, বাবার মুখে শোনা দাশড়া নামটি।

তাঁদের মুখেই অসংখ্যবার শুনেছেন মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম,মডেল হাইস্কুলের নাম,সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের নাম। শুনেছেন শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের গল্প।

অভিজিৎ মুখার্জির ঠাকুর দাদা প্রথমে মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে দেবেন্দ্র কলেজে সংস্কৃতির শিক্ষক ছিলেন। বাবা পড়েছেন মানিকগঞ্জ মডেল হাই স্কুলে।

পূর্ব পুরুষদের বেড়ে উঠা সেই ভূস্বর্গ,তার মানুষগুলো কেমন ছিল তা বোঝার, দেখার ইচ্ছে অভিজিৎ মুখার্জির অনেক দিনের। একই সাথে তাঁর বোস্টনবাসী অশতিপর কাকুকে মানিকগঞ্জের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়ার ভাবনাতেই মানিকগঞ্জে এসেছিলেন । মুগ্ধ হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন পূর্বপুরুষদের স্মৃতিধন্য জায়গাগুলো,স্কুল-কলেজগুলো।

দিনের একটা বড় সময় তাঁর সাথে কাটাবার সুযোগ আমার হয়েছিল। মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনেছি। অভিভূত হয়েছি তাঁর জ্ঞানের গভীরতায়। শ্রদ্ধায় অবনত হয়েছি মানিকগঞ্জের প্রতি তাঁর ভালবাসা,অন্তরের টান দেখে।

অভিজিৎ দা,আবার আসবেন আপনার পিতৃভূমিতে, শিকড়ে। শুভ কামনা আপনার জন্য।

অভিজিৎ মুখার্জি একাধিকবার জাপান ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে সে দেশের ভাষা শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। দেশে ধারাবাহিকভাবে দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। বক্তৃতা দিয়েছেন বিভিন্ন দেশে। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও সাহিত্যের অনেকগুলো শাখায় তার উৎসাহ ও চর্চা। 

বিশ্বসাহিত্য বিস্তৃত পাঠসূত্রে তিনি জাপানি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদে নিবিষ্ট হয়েছেন। জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির গল্প-উপন্যাস অনুবাদে তাঁর সুখ্যাতি অনেক। মুরাকামির অথোরাইজ বাংলা অনুবাদক তিনি। গত ২৬ অক্টোবর বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা ট্রানস্লেশন ফেস্ট ২০১৮'র অন্যতম বক্তা হিসেবে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন অভিজিৎ মুখার্জি।

তাঁর লেখা গ্রন্থগুলো হচ্ছে - ট্যাগোর এন্ড জাপান (গদ্য), যে ভারতীরা ইংরেজিতে লিখছেন (প্রবন্ধ), যেটুকু জাপান (গদ্য), এক ডজন মুরাকামি (অনুবাদ), বিগ্রহ ও নিরাকার (অনুবাদ)। সম্প্রতি যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশ হয়েছে হারুকি মুরাকামি’র উপন্যাস ‘সমুদ্রতটে কাফকা’।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী



মন্তব্য