kalerkantho


সোনালি সম্ভাবনায়, পাট পলিমার

দীপান্বিতা সরকার    

২১ মে, ২০১৮ ১৭:১৯



সোনালি সম্ভাবনায়, পাট পলিমার

পরিবেশ রক্ষায় নতুন দিগন্তের সূচনা হচ্ছে জুট পলিমার বা পাট পলিমার আবিস্কারের মাধ্যমে। খুব শিগগিরই রাজধানীর ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানি জুট মিলে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে পাট থেকে পলিথিন উৎপাদনের কাজ। পরিবেশ বান্ধব এই পলিমার একদিকে যেমন পচনশীল তেমনি পরিবেশ রক্ষায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রচলিত পলিথিন ব্যাগ পেট্রোলিয়াম জাতের পলিমার দিয়ে তৈরি যা পচনশীল নয়। ফলে পরিবেশের জন্য এটি হয়ে উঠেছে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তাই এই পলিথিন এর বিকল্প খুঁজতে দীর্ঘ ২০ বছরের গবেষণার পর বাংলাদেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমেদ খান পাটের আঁশ থেকে তৈরি করেছেন এক ধরনের পলিথিন।

এই ধরনের পলিথিন সহজেই মাটিতে মিশে যায় এবং পানিতেও মিশে যেতে সক্ষম। ড. মোবারক আহমেদ খান বর্তমানে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসাবে কর্মরত আছেন। পাটের আঁশ থেকে সেলুলোজ সংগ্রহ করে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি এ পলিথিন দেখতে হুবহু পলিথিন এর মত হলেও এটি প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ ভাড় বহন করতে সক্ষম। এই পলিথিনের সবচেয়ে ভালো দিক হলো বায়োডিগ্রেডেবল হওয়ায় মাত্র ৪/৫ মাসেই এটি মাটিতে মিশে যায় এবং পোড়ালে ছাই হয়ে যায়। পলিথিনের ব্যাপক চাহিদা ও ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট মাটি, পানি, বায়ুদূষণ ও জলাবদ্ধতা প্রভৃতি সমস্যা সমাধানে, পলিথিনের চমৎকার বিকল্প হতে পারে পাটের এই পলিথিন। পচনশীল হওয়া সত্ত্বেও এই ‘সোনালী ব্যাগ’ বায়ু এবং পানি প্রতিরোধী। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, গঠনগত দিক থেকে পাট জটিল পলিমারের সমন্বয়ে গঠিত যাতে প্রধানত সেলুলোজ ৭৫ ভাগ, হেমিসেলুলোজ ১৫ ভাগ এবং লিগনিন ১২ ভাগ রয়েছে। এছাড়া সামান্য পরিমাণে ফ্যাট, মোম, নাইট্রোজেনাস ম্যাটার, বিটা ক্যারোটিন ও জ্যানথোফেলাস থাকায় পাট পলিমার পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব। অপচনশীল পলিথিন ব্যাগ শুধু বাংলাদেশেই না, গভীর উদ্বেগের এক অন্যতম কারণ। এ সমস্যা মোকাবেলায় প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের চমৎকার বিকল্প হতে পারে পাটের পলিথিন। সেই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে, বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের এই পলিথিন রপ্তানির মাধ্যমে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে বাংলাদেশ, তেমনি এর উৎপাদন ও বাজারজাতের মাধ্যমে পাট ফিরে পেতে পারে এর হারিয়ে যাওয়া সোনালী ঐতিহ্য।

এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন করে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে সে হিসাবে শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিনই দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলো নালা-নর্দমা খাল ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পলিথিন নষ্ট হয়না ফলে মাটির গুনাগুন নষ্টকারক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া রাজধানীসহ সারাদেশে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির প্রায় ২০০ কারখানা রয়েছে। যার বেশিরভাগই পুরান ঢাকায়। বন্ড লাইসেন্সের মাধ্যমে আমদানিকৃত পলিপ্রোপাইলিন অবৈধভাবে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 পরিবেশবাদীদের সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেরই প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হয়।  শহরের জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী এই পলিথিন ব্যাগ। সারাদেশে পলিথিন ব্যাগ কত ব্যবহৃত হয় এবং তার কী ধরনের বিরূপতা পরিবেশ, উৎপাদন ও জীবনযাত্রায় পতিত হয়, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, এই প্রশ্ন পরিবেশবাদীরা সবসময় করে আসছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব এবং ব্যবস্থা গ্রহণের অক্ষমতাই এজন্য মূলত দায়ী বলে মনে করেন তারা। 

পলিথিনের দাম কম এবং সহজলভ্য হওয়ার কারণেই মানুষ তা ব্যবহার করছে। তাদের মধ্যে সচেতনতারও অভাব রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাজারে উপযুক্ত বিকল্পও যথেষ্ট পরিমাণে নেই। এই অবস্থায়, সোনালী ব্যাগ সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প হতে পারে। একদিকে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে অন্যদিকে সোনালী ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার জনপ্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে পরিবেশঘাতক পলিথিন ব্যাগের ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব হতে পারে। 

৬ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে United Nations Environment Program (UNEP)  আয়োজিত এক সভায় ১৯৩ টি দেশের প্রতিনিধি সমুদ্রের পানিতে প্লাস্টিক দূষণ অবসানের জন্য জাতিসংঘের রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেন, এর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশেও রয়েছে। পলিথিন নিষিদ্ধকরণ আইন এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে, কাগজ ও কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহার বাড়বে, মাঠ পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাটের ব্যাগ আমেরিকায় রপ্তানীর উদ্যোগ নেয়া হলে রপ্তানী আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষক পাট চাষে উৎসাহিত হবে এবং পাটের ন্যায্য মূল্য পাবে। বাংলাদেশ সোনালী আঁশ পাটের ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

(নাগরিক মন্তব্যে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)



মন্তব্য