kalerkantho


উৎসবের ঢাকা

নবান্ন উৎসব

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নবান্ন উৎসব

আমাদের আদিমতম উৎসবগুলোর একটি ‘নবান্ন উৎসব’। কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় গড়ে ওঠা শস্যভিত্তিক এই লোকজ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় বাংলার গ্রামগঞ্জে কৃষকের ঘরে ঘরে। নবান্ন শব্দটি শুনলেই পিঠা, পায়েস, মুড়ি-মুড়কি আর নতুন চালের ভাতের সুগন্ধে ভরে ওঠে মনটা। অন্ন বা আহার নিয়ে এই উৎসবের জন্ম। কার্তিক মাসের শুরু থেকেই দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে ধান কাটা শুরু হয়ে যায়। অগ্রহায়ণে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে ধান-চালে। যার ফলে কৃষিনির্ভর বাংলায় পিঠা-পুলি, চিঁড়া-মুড়ি নিয়ে উৎসব করার সময় এটাই। এ সময়ে কোনো বাড়িতে দেখা যায় চাল কুটছে পিঠার জন্য, কোনো বাড়িতে তৈরি হচ্ছে পায়েস। বাড়ি বাড়ি নানা রকম পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। এ দেশের গ্রামগঞ্জে নবান্ন একটি সহজাত উৎসব। ঢাকায় প্রথম নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয় ১৯৯৮ সালে। এ বছর এই উৎসবের দুই দশক বা বিশ বছর পূর্ণ হবে। নাগরিক নবান্ন উৎসবের আয়োজক সাহরিয়ার সালাম। তিনি জানলেন ২০ বছরের উৎসব আয়োজনের নানা বিষয়ে। তিনি তখন উদীচীর দক্ষ কর্মী। সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলেন ঋতুভিত্তিক একটি উৎসবের আয়োজন করা যায়। তখন ছায়ানটে অনিয়মিত শরৎ উৎসবের আয়োজন করতেন। দেশে ও কলকাতার উৎসব নিয়ে পড়ে দেখলেন নবান্ন উৎসবই এই অঞ্চলের আদি উৎসব। আদিতে অগ্রহায়ণ মাসে বছর শুরু হতো। অনেক ভেবে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করলেন। অনেকে নাক সিটকালেও সঙ্গে পেলেন তিন বন্ধুকে। গঠন করা হলো ‘জাতীয় নবান্ন উৎসব উদ্‌যাপন পর্ষদ’। পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হলো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নৃত্যশিল্পী লায়লা হানাসকে। প্রথম বছর উদ্বোধক ছিলেন কলিম শরাফী। তারপর কয়েক বছর উদ্বোধক ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে উদ্বোধক হিসেবে ছিলেন ফয়েজ আহমদ, হাসান ইমাম, আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ২০ বছরের আয়োজন সম্পর্কে বললেন, বিগত ১৯ বছর ধরে এক দিনের আয়োজন থাকলেও এবার উৎস হবে দুই দিনব্যাপী। পহেলা অগ্রহায়ণ, ১৫ নভেম্বর সকাল ৭টায় উৎসবের শুরু হবে। অনুষ্ঠানে নৃত্য, গান ও আবৃত্তি থাকবে। নবান্নের গানে মুখরিত হয়ে উঠবে চারদিক। এবার ঢাকার বাইরে থেকে আসবে সংযাত্রা, লাঠিখেলা। থাকবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নৃত্য। এবার উদ্বোধন করবেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। প্রথম দিনের নানা সাজের নবান্নের আনন্দ শোভাযাত্রা চারুকলার বকুলতলা থেকে টিএসসি হয়ে আবার ফিরে আসবে চারুকলায়। দ্বিতীয় দিনে একই সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হবে। মধ্যখানে থাকবে শিশু প্রহর। সেখানে শিশুদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠান মুখরিত হবে। সারা দিন অনুষ্ঠান চলবে। দুই দিনে এক হাজার ৪০০ শিল্পী অংশগ্রহণ করবেন। প্রতিবছর উৎসবে স্যুভেনির হয়, পোস্টার হয়—এ বছর পোস্ট-কার্ড করা হবে। ১২টা পোস্ট-কার্ডের একটি সেট করা হবে শিশুরা নবান্নের যে ছবি এঁকেছে তা থেকে নির্বাচিত ছবি নিয়ে। ২০ বছর ধরে নবান্ন উৎসবের সংগ্রাম নিয়ে জানালেন, সবচেয়ে বড় বিষয় অর্থ সংগ্রহ করা। এত বড় একটি উৎসবের আয়োজনেও অনেক কষ্ট করতে হয়। একবার আমার আদরের ছোট বোনকে বড় ভাই বাইরে থেকে এসে ১০০ ডলার উপহার দিয়ে ছিলেন। সে টাকাটা নিয়ে উৎসবে খরচ করেছি। সে টাকা এখনো দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়নি, দেওয়ার আর প্রয়োজনও নেই। আমার বোন এখন বিদেশে। প্রথম যারা এই উৎসবকে অবহেলা করেছে, তারাই এখন অনেক প্রশংসা করে। এটা খুব ভালো লাগে। এখন তো সারা দেশে নবান্ন উৎসব হচ্ছে। আমরা দেখেছি ৫০টির বেশি জায়গায় উৎসবের আয়োজন হয়। সেটাও খুব ভালো লাগে। এখান থেকে আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। এটা অনন্য প্রাপ্তি। প্রথম থেকেই আমরা গণমাধ্যমের সহযোগিতা পেয়েছি। এই উৎসব ছড়িয়ে যাওয়ার বড় একটি ভূমিকা নিয়েছিল গণমাধ্যম।

লেখা ও ছবি : মোহাম্মদ আসাদ



মন্তব্য