kalerkantho


'মুহাম্মদ' নামটি যেভাবে এলো

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান   

২৩ নভেম্বর, ২০১৭ ১৭:৫৬



'মুহাম্মদ' নামটি যেভাবে এলো

গর্ভে থাকাকালেই মা আমিনা স্বপ্নে দেখেন যে শিশু ভূমিষ্ঠ হবে, তাঁর নাম হবে মুহাম্মদ। এর অর্থ সর্বজন প্রশংসিত।

স্বপ্নে মা আমেনা আরো নির্দেশিত হলেন, ‘তুমি বলবে, আমার এই সন্তানকে সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এক আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। ’

সন্তান প্রসবের পর মা আমিনা সন্তানের দাদা আবদুল মুত্তালিবকে স্বপ্নের বৃত্তান্ত জানান। দাদা সে অনুযায়ী শিশুটির নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। একই সঙ্গে দাদা প্রার্থনা করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের এই সন্তানকে আমরা সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। ’

আবদুল মুত্তালিব নাতিকে কোলে নিয়ে পবিত্র কাবা শরিফে প্রবেশ করলেন এবং আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা-১৫৮)

নামকরণের বিষয়েও মতভিন্নতা পাওয়া যায়। ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে, ‘ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মাতা আমিনা স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী সন্তানের নাম রাখলেন আহমাদ। ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে এ নামের উল্লেখ আছে। পৌত্র সর্বকালে ও সর্বলোকে প্রশংসিত হোক, এই বাসনায় আবদুল মুত্তালিব তৎকালীন আরবে অশ্রুতপূর্ব নাম রাখলেন মুহাম্মদ।’ (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্বিতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা-২৯২)

ইবনে হিশামের কিতাবের অন্যত্র ইবনে ইসহাক থেকে উদ্ধৃত আছে যে হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে হজরত ঈসা (আ.)-এর বর্ণনা ও প্রতিশ্রুতি তাঁর সহচর ইয়ুহান্না কর্তৃক সংকলিত ইনজিলে বর্ণিত হয়েছে : হজরত ঈসা (আ.) বলেন, ... তবে যদি মুনহামান্না (মুহাম্মদ সা.-এর সুরিয়ানি নাম) আসতেন, যাঁকে আল্লাহ পবিত্র আত্মাসহ তোমাদের কাছে পাঠাবেন, তিনিই আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন...। (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা-২১১-১২)

ঈসা (আ.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি ইউহান্নাস ইনজিল কিতাবে মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত সম্পর্কে ঈসা (আ.) থেকে যে বর্ণনা করেন, তার আরেকটি বিবরণ : তবে মুনহামান্না, যাঁকে মহাপ্রভু আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে পাঠাবেন, যিনি মহাপ্রভু আল্লাহর নিকট থেকে আগত পবিত্র আত্মা, তবে তিনি অবশ্যই আমার পক্ষে সাক্ষী হবেন.। ... সুরিয়ানি ভাষায় মুনহামান্না অর্থ প্রশংসিত বা মুহাম্মদ। আর রোমান ভাষায় এর প্রতিশব্দ পারাকালিস্তিস।

জোহনের ইনজিলের বর্ণিত বাক্যাবলিতে হজরত ঈসা (আ.) বারবার সেই পয়গম্বরের আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁকে তিনি ফারকালিত বলে অভিহিত করেছেন। শব্দটি ইবয়ানি অথবা সুরয়ানি। এই শব্দের হুবহু আরবি অনুবাদ মুহাম্মদ এবং আহমদ—অর্থাৎ প্রশংসিত, পরম প্রশংসাকারী অথবা পরম প্রশংসিত। গ্রিক ভাষায় এ শব্দের অনুবাদ পাইরিকিলইউটাস। এর অর্থও অত্যন্ত প্রশংসাকারী বা প্রশংসিত (আহমদ)। পরে খ্রিস্টানরা শব্দটি পরিবর্তন করে ‘শান্তিদাতা’ অর্থে ব্যবহার করে। (ইবনে হিশাম : সীরাতুন নবী (সা.) গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পূর্বোক্ত গ্রন্থে এ তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পৃষ্ঠা : ২১২-২১৩। )

নবজাতক শিশুদের ‘মুহাম্মদ’ নামকরণে তৎকালীন আরবে একটা হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। অন্তত তিনজন শিশুর নাম জানা যায়, যাদের নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখা হয়েছিল : ১. মুহাম্মদ ইবনে সুফিয়ান, ২. মুহাম্মদ ইবনে উহায়হা ইবনে জিলাহ, ৩. মুহাম্মদ ইবনে হিমরান ইবনে রবিআহ। এই তিনজনের প্রত্যেকের পিতা আসমানি কিতাবের জ্ঞান রাখেন এমন এক বাদশাহর দরবারে গিয়ে জানতে পারেন, দুনিয়ায় একজন রাসুলের আবির্ভাব সমাগত। তিনি হিজাজে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন। ওই নবীর নাম হবে মুহাম্মদ। ওই সময় তাঁদের প্রত্যেকের স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা জন্মে যে তাঁরা এই রাসুলের পিতা হবেন।

লেখক : সাবেক সিনিয়র উপ-প্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর


মন্তব্য