kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

দেশে ফার্মেসি শিক্ষা ও পেশার অগ্রগতি

ড. মামুনুর রশীদ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশে ফার্মেসি শিক্ষা ও পেশার অগ্রগতি

প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস পালিত হয়। ফার্মেসি পেশার সঙ্গে জড়িত সবাইকে উৎসাহ প্রদান এবং এই পেশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ২০১০ সাল থেকে সারা বিশ্বে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবারের দিবসে ফার্মাসিস্টদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (এফআইপি) প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘Pharmacy united in action for a healthier world’—বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘বিশ্বে স্বাস্থ্যের জন্য ফার্মেসি পেশার সবাই একতাবদ্ধ। ’ এ ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যের ওপর ফার্মেসির ইতিবাচক প্রভাব প্রদর্শন করা এবং পেশার মধ্যে সংহতি আরো জোরদার করা।

বিজ্ঞাপন

সারা বিশ্বে ফার্মেসি পেশায় জড়িত সব ফার্মাসিস্ট উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

দেশে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে যে উদ্দেশ্যে ফার্মেসি শিক্ষা ও পেশার শুরু হয়েছিল, তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন না করায় স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এ পেশার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফলতা আসেনি। ফার্মাসিস্টদের কার্যপরিধি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেসির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এতে একদিকে যেমন দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নত বিশ্বের মতো হতে পারেনি, অন্যদিকে বর্তমানে দেশের মানুষ মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে।

ফার্মাসিস্টদের এ দেশে কোথায় কোথায় কাজ করার সুযোগ রয়েছে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। কাউন্সিলের নির্দেশনা অনুযায়ী ফার্মাসিস্টদের কর্মক্ষেত্রগুলো হচ্ছে—ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ওষুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিতরণ, ওষুধের তথ্য প্রদানে মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার, কমিউনিটি এবং হাসপাতালের ফার্মেসিতে একাডেমিক কার্যক্রম, প্রশিক্ষক, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজত টিম এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা।

কাগজে-কলমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের চাকরি করার সুযোগের কথা উল্লেখ থাকলেও ৯৫ শতাংশ ফার্মাসিস্টকে এ দেশে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরির জন্য ধরনা দিতে হয় এবং চাকরি করতে হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের চাকরির সুযোগ একেবারেই সীমিত। অন্য কথায় ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রগুলো এখনো এ দেশে সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারেনি।

ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশনের (এফআইপি) ‘ফার্মেসি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০১৫-২০১৭’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রায় ২৮ লাখের বেশি রেজিস্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন, যার প্রায় ৭৫.১ শতাংশ কাজ করেন কমিউনিটি ফার্মেসিতে, ১৩.২ শতাংশ হসপিটাল ফার্মেসিতে এবং বাকি প্রায় ১২.৭ শতাংশ কাজ করেন ওষুধ কম্পানিসহ বিভিন্ন শাখায়। এই রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়, উন্নত বিশ্বে, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় কমিউনিটি ফার্মেসিতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ফার্মাসিস্ট কাজ করে থাকেন এবং এর পরই রয়েছে হসপিটাল ফার্মেসি। এসব দেশে অল্পসংখ্যক ফার্মাসিস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেসিতে কাজ করেন। অথচ এই চিত্র আমাদের দেশে একেবারেই উল্টো। আমাদের দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নীতিমালার অভাবে উন্নত দেশের আদলে কমিউনিটি ফার্মেসি গড়ে উঠতে না পারায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের এ ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ২০১৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া শুধু বিজ্ঞাপনের মধ্যেই আটকে আছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসারে চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রণীত জাতীয় ওষুধনীতিতে ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এর সঙ্গে দেশে পর্যায়ক্রমে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্ত বিভাগ ও বহির্বিভাগে ‘হসপিটাল ফার্মেসি’ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি এবং হাসপাতাল ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টের অন্তর্ভুক্তি খুবই জরুরি।

স্বাস্থ্য ও সুচিকিৎসা পাওয়া মানুষের একটা মৌলিক অধিকার, যা আমাদের মতো দেশে মেটানো অনেকটাই সম্ভব হয় না। দেশে বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৭০ হাজারেরও বেশি ডাক্তার কর্মরত থাকলেও রোগীর উন্নত সেবাদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেকাংশে পিছিয়ে আছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই সেবা খাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট না থাকা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডাক্তার স্বাস্থ্য পেশায় যেভাবে জড়িত, তেমনিভাবে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা অগ্রগণ্য নয়। তাই চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে ফার্মাসিস্টের ভূমিকা অনন্য; কিন্তু আমাদের দেশে পর্যাপ্ত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকা সত্ত্বেও রোগীর স্বাস্থ্যসেবায় বা হাসপাতালে তাঁদের ভূমিকা দেখা যায় না বললেই চলে। অথচ তাঁরা রোগীর সার্বিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।

দেশে ফার্মেসি শিক্ষার কার্যক্রম ১৯৬৪ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল কর্তৃক ফার্মেসি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত যে স্বল্পসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি সম্মান বিষয়ে পাস করে বের হন তাঁদের বেশির ভাগই বিদেশে পাড়ি জমান। কারণ ওই সময়ে দেশে গুটিকয়েক বহুজাতিক ওষুধ কম্পানি ছাড়া দেশি ফার্মা কম্পানি ছিল অল্প এবং সেগুলো ছিল ক্রমবিকাশমান। এ ছাড়া উন্নত দেশে তখন ফার্মাসিস্টদের চাহিদা ছিল অনেক এবং লাইসেন্স ছাড়াই সরাসরি ফার্মেসি পেশায় কাজের সুযোগ ছিল। বর্তমানে দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ কম্পানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৭টি। অন্যদিকে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ৪১টি বিশ্ববিদ্যালয় (সরকারি ও বেসরকারি) থেকে পাস করে বের হন। হসপিটাল ফার্মেসি চালু না হওয়ায় এবং সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত থাকার ফলে এই বৃহত্সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের অনেকেই ওষুধ কম্পানিতে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে অনেককে বেকার থাকতে হচ্ছে।

দেশে চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার কারণে অনেক মেধাবী ফার্মাসিস্ট বাধ্য হয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাচ্ছেন। সেখানে ফার্মাসিস্টরা রেজিস্ট্রেশন পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে কমিউনিটি ফার্মেসি, হসপিটাল ফার্মেসি এবং ক্লিনিক্যাল ফার্মেসিতে ওই দেশের ফার্মাসিস্টের সঙ্গে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের দেশের অনেক রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশে কমিউনিটি ফার্মেসি এবং হসপিটাল ফার্মেসিতেও সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। অনেকে দেশে বি.ফার্ম সম্মান এবং এম.ফার্ম শেষ করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন এবং সেখানেই যোগ্য শিক্ষক অথবা গবেষক হিসেবে নিজের জায়গা করে নিচ্ছেন। অনেকেই নতুন ওষুধ উদ্ভাবন, জৈব প্রযুক্তিগত ওষুধ তৈরি, ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, বিভিন্ন রোগের কারণ জানার জন্য বিদেশের গবেষণাগারে রাত-দিন কাজ করে বিশ্ব দরবারে মেধার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। দেশ থেকে এভাবে মেধাবী ও দক্ষ ফার্মাসিস্ট বিদেশে চলে গেলে একসময় স্বাস্থ্যসেবার মান বজায় রাখা যেমন সম্ভব হবে না, তেমনি দেশের মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

আমাদের দেশে যত দিন কমিউনিটি এবং হাসপাতালে ফার্মেসিতে দক্ষ ও মেধাবী গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের কাজের সুযোগ তৈরি না হবে এবং স্নাতকোত্তর বিশেষজ্ঞ ফার্মাসিস্ট তৈরির জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সম্ভব না হবে এবং ফার্মাসিস্টদের রোগীর স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি যুক্ত করা না হবে, তত দিন আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে না। দেশের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নত পর্যায়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে এবং এর জন্য অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

 লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা