kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

সাদাকালো

করোনা আমাদের কী শেখাল, কতটুকু শেখাল

আহমদ রফিক

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা আমাদের কী শেখাল, কতটুকু শেখাল

জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ-দুর্ভোগ আমাদের জন্য কী বা কতটুকু শিক্ষণীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে তা হিসাব-নিকাশ করে দেখার মতো বিষয়। এটা সবার জন্য এক ধরনের বাধ্যতামূলক সাধারণ সূত্র। কেউ তাতে সাড়া দেন, কেউ দেন না। এটা নির্ভর করে সচেতনতা ও মননশীলতার ওপর।

এটা একদিকে যেমন ইতিবাচক, তেমনি বিপরীত বিচারে নেতিবাচক। সামাজিক দায়বদ্ধতার বিচারে তেমনটাই বাস্তব সত্য। আবার সুযোগ-সন্ধানীরা দুর্যোগ-দুর্ভোগের মতো পরিস্থিতিতেও স্বার্থপরতার সুযোগ নিতে ভুল করেন না, হোক তা যতই নীতিনৈতিকতা-বিরোধী। এমন সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রকাশ নিতান্ত কম দেখা যায় না।

সম্প্রতি বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দুর্যোগে এমন সব পরিস্থিতির প্রকাশ ঘটতে দেখেছি আমরা। করোনা সংক্রমণ একটা বৈশ্বিক ঘটনা। চীনে যখন এর প্রথম আত্মপ্রকাশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে এর বিস্তার এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিষয়টির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা কর্তব্য সে সম্পর্কে পরামর্শ রেখেছে, তখন আমরা এ সম্পর্কে তাত্ক্ষণিক উদাসীনতাই প্রকাশ করেছি।

হয়তো ভাবিনি, দক্ষিণ এশিয়ার দূরপ্রান্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এর সংক্রমণ দুর্যোগময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তাই স্বাস্থ্যবিধি-বিষয়ক ব্যবস্থাবলি গ্রহণের তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন উপলব্ধি করিনি। যাকে বলে আগাম প্রস্তুতি, সেদিকে আমাদের নজর ছিল না।

তবে বাঘ যখন সত্যই আত্মপ্রকাশ করল, তখন অবশ্য দেশজোড়া ‘লকডাউন’ ঘোষণা করে সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করেছে। সেই সঙ্গে নানা আনুষঙ্গিক দুর্ভোগের মোকাবেলার চেষ্টা—যেমন নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে খাদ্য ও ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থার বিশাল আর্থিক প্রণোদনা।

এই নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধারার দিনশ্রমিক, মেহনতি মানুষ, খণ্ডকালীন গৃহকর্মী থেকে শুরু করে পোশাক কারখানার শ্রমিক। করোনা উপলক্ষে দেখা গেল সমাজের বিত্তবান শ্রেণির বেশ কিছুসংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে নিম্নবর্গীয়দের জন্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণের প্রবণতা। এবং তা যেমন শহরে, তেমনি গ্রামাঞ্চলে। এককথায় মানবিক চেতনায় সহমর্মিতার প্রকাশে অনাহারক্লিষ্ট মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো।

তবে বিশাল পরিমাপের সরকারি ত্রাণ বিতরণের প্রক্রিয়ায় যথারীতি প্রকাশ পেয়েছে দুর্নীতি-অসাধুতার কালো হাত। এবং তা জনপ্রতিনিধি থেকে পাতি রাজনৈতিক নেতা-উপনেতার মধ্যে—মূলত চাল আত্মসাৎ—শত শত বস্তা—জেল-জরিমানা উপেক্ষা করে। দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে এদের এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, প্রধানমন্ত্রীর পুনঃ পুনঃ হুঁশিয়ারি ও ভয়-ভীতিমূলক নির্দেশ উপেক্ষা করে। এটা অবশ্য করোনার দান নয়, বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘকালীন বিরাজমান ব্যাপক দুর্নীতির একটি ছোটখাটো অংশ মাত্র।

ত্রাণ নিয়ে হুড়াহুড়ি দেখে করোনা একটু মুচকি হেসে জীবনানন্দীয় কাব্য ভাষায় হয়তো মনে মনে বলেছে : ‘চমৎকার, ধরা যাক আরো কয়েকটি মানুষ এবার।’ কারণ এক শ্রেণির মানুষ নিয়ম মানছে না—না স্বাস্থ্যবিধি সুরক্ষার, না যাতায়াতের বিধি-নিষেধ। সমাজের প্রধান উৎসব সামনে রেখে কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করেও প্রধানমন্ত্রীর নিষেধাজ্ঞা—না, এ ঈদে কেউ রাজধানী বা কর্মস্থল ছেড়ে গ্রামে বা বাড়িতে যাবে না।

কজন শুনেছে কথা। নিয়ম ভাঙা, বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করা বোধ হয় এ জাতির সামাজিক চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ঈদ উপলক্ষে কর্মস্থল ছাড়া মানুষ পথে পথে, নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশে। সংখ্যাটা কম নয়। না থাকুক গণপরিবহন, যেকোনোভাবে হোক গন্তব্যে পৌঁছাতেই হবে। এই বরাবরের অভ্যাস করোনা আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে, উদ্ঘাটিত করেছে আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য। এখন অর্থনীতি সচল করতে যখন অনেক কিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে, তখন এ অভ্যাসটির প্রকাশ ঘটতে পারে আরো ব্যাপকভাবে, তাহলে করোনার মস্ত সুবিধা।

দুই.

এবার পরিস্থিতির অন্য দিকটি দেখা যাক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তো সব দেশের জন্য করোনা মোকাবেলার সাধারণ বিধি-বিধান ও করণীয় প্রকাশ করেই খালাস, ত্রুটি-বিচ্যুতি নির্ধারণ সাধারণত তার কাজ নয়। তবে করোনা পরিস্থিতি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতিগুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রথম দফায় আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখে গ্রামীণ কৃষকের মতো সাবধান হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি।

তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঢিলেঢালা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা—সেখানে উন্নত দেশগুলোর মতো প্রতিরক্ষামূলক সুসংহত ব্যবস্থা নেই, যাতে কোনো রোগ-মারির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসাসেবার বাস্তব চিত্রটাও একই রকম। বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিক স্বার্থটাই বড়। বড় কোনো দুর্যোগ মোকাবেলার মতো কারিগরি ব্যবস্থা ও সংগতি নেই বললে চলে।

তাই করোনা আক্রমণে বেহাল যেমন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, তেমনি বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত। করোনা মোকাবেলায় জাতীয় কমিটিসহ বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটিগুলোর মধ্যে করণীয় ও কর্মোদ্যোগে সমন্বয়হীনতার অভাব স্পষ্ট। সাংবাদমাধ্যমে এই ‘সমন্বয়হীনতা’ ও ‘শিথিলতা’ শব্দ দুটি করোনা প্রসঙ্গে কতবার যে শিরোনাম হয়েছে বা বিশদ লেখা হয়েছে বিশেষ প্রতিবেদনে, তা পড়ে সত্যি অবাক হয়েছি।

করোনা আক্রমণের তীব্রতার মুখে দেখা গেছে আক্রান্তের শনাক্তকরণে অপ্রতুলতা। এ ব্যাপারে গণস্বাস্থ্য ‘কিট’ তৈরিতে এগিয়ে এলেও লক্ষণীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। তবু তাদের চেষ্টায় তৈরি হয়েছে মানসম্মত করোনা শনাক্তকরণ ‘কিট’—তা নিয়ে এখন চলছে এর যথার্থতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার টানাপড়েন। করোনার আক্রমণই এদিকে তাদের নজর টেনেছে।

যেমন টেনেছে অন্য একটি প্রযুক্তি সংস্থার মেধাবী তরুণ-তরুণী বিজ্ঞানীদের, যাঁদের চেষ্টায় উদ্ঘাটিত হয়েছে করোনাভাইরাসের অন্তর্নিহিত রূপ (জিনোম)। হয়তো তাঁদের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল এমনই : ‘করোনা, তোমার আদ্যোপান্ত রহস্য বের করে ছাড়ব।’ এ পথে আরো এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। অসম্ভব নয় করোনাবিরোধী ভ্যাকসিন তৈরি।

অন্যদিকে করোনা রোগীর চিকিৎসাসেবার ঘাটতি পূরণে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। তারা শুধু অভাবীদের জন্য ত্রাণ বিতরণে বা বিশেষ সাহায্য প্রকল্পে অনুদানে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে সিদ্ধান্ত মাফিক তৈরি করেছে বিশালায়তন করোনা চিকিৎসার বিশেষ হাসপাতাল। জানি না, এর সদ্ব্যবহারে দক্ষ জনশক্তি ও কারিগরি সরঞ্জাম আহরণ কতটা এগিয়েছে। করোনা এ ধরনের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাকে উসকে দিয়েছে।

তিন.

সত্যি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাসেবার ঘাটতিগুলো করোনাভাইরাসই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সরকারি বা বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক ঘাটতিগুলো সচেতন ও মননশীল কোনো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অস্বীকারের উপায় নেই যে রোগ ও মারিতাত্ত্বিক সংক্রমণের প্রতিরোধে আমাদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল।

যেমন চিকিৎসাসেবার দক্ষতায়, তেমনি এর কারিগরি ও গবেষণামূলক দিকে। বিশেষ করে রোগতাত্ত্বিক, মারিতাত্ত্বিক গবেষণা, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা এবং ওষুধশিল্পে গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের প্রবল ঘাটতি; কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এদিকে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের গভীর কোনো আগ্রহ এযাবৎ দেখা যায়নি। করোনা আক্রমণে তা প্রকট হয়ে উঠেছে।

তাই সময় হয়েছে এদিকে নজর দেওয়ার—বিশেষভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কর্তৃপক্ষের। দরকার সরকারি উদ্যোগে উল্লিখিত বিষয়ে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার। এদিক থেকে দেশে মেধা ও মস্তিষ্কের খুব একটা অভাব আছে বলে মনে হয় না। দরকার সদিচ্ছার এবং সেগুলো ব্যবহারের। ধান ও পাট গবেষণা সংস্থার সাফল্য একই কথা বলে। তাই পরিকল্পনা ও উদ্যোগ এখনই নেওয়া দরকার। করোনা তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

আর বাংলাদেশে যেহেতু একটি অতিধনিক শ্রেণির উত্থান ঘটেছে, তাদের কেউ কেউ এ পথে এগিয়ে আসুক, বিশেষত ভাইরাস গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনে, যেমন বসুন্ধরা গ্রুপ। কাগজে দেখেছি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র করোনা চিকিৎসায় ‘প্লাজমা সংগ্রহ কেন্দ্র’ স্থাপনে ইচ্ছুক। তারা এ ধরনের কারিগরি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাক। এ বিষয়ে আমাদের শেষ কথাটি হচ্ছে, স্বাস্থ্য দপ্তর দেশের সর্বোচ্চ পাঁচটি ওষুধ কম্পানিকে নির্দেশ দিক বিদেশি বহুজাতিক কম্পানিগুলোর মতো ওষুধের নানা দিক উদ্ভাবনে গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনে, প্রয়োজনে বিদেশি প্রযুক্তিবিদের সহায়তায় এবং স্বদেশি মেধার সদ্ব্যবহারে। এমনি উদ্ভাবন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য দপ্তরের সংগঠনও নিজেকে ঢেলে সাজাক। করোনা পর্ব থেকে নতুন স্বাস্থ্য-চিকিৎসা পর্বে পদার্পণ করুক বাংলাদেশ।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা