kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

এই সময়

করোনা, আম্ফান ও বিবিধ প্রসঙ্গ

তারেক শামসুর রেহমান

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনা, আম্ফান ও বিবিধ প্রসঙ্গ

বাংলাদেশ যখন করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, ঠিক তখনই গত ২০ মে আঘাত করেছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। করোনা অভিজ্ঞতা নতুন হলেও আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড় আমাদের নতুন নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই হচ্ছে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়, যার জন্য বাংলাদেশ আদৌ দায়ী নয়। অতীতেও বাংলাদেশ এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করেছে। সিডর, নারগিস, আইলা, বিজলি, পাইলিন, নিলোফার, তিতলির পর এবার আঘাত করল আম্ফান। প্রতিবার ঘূর্ণিঝড়ে যে ক্ষতি হয়, এবারও হয়েছে। প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি, ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে যাওয়া কিংবা এক লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে—১. এ অঞ্চলের মানুষগুলোকে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবেলা করেই বেঁচে থাকতে হবে; ২. সুন্দরবন আরো একবার বাংলাদেশকে রক্ষা করল। আমরা কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি স্মরণ করতে পারি। তাই সুন্দরবন ও তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে এবং সুন্দরবনকে বাঁচানোর কর্মসূচিও  হাতে নিতে হবে; ৩. এ অঞ্চলের মানুষের একটা বড় সমস্যা বেড়িবাঁধ—ঘূর্ণিঝড় হওয়া মানেই মাটির তৈরি বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়া, জলোচ্ছ্বাস ও বসতবাড়িতে পানি ঢুকে যাওয়া। বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি প্রমাণিত। এ জন্য এ অঞ্চলজুড়ে স্থায়ী ও উঁচু বাঁধ নির্মাণ জরুরি; ৪. এ অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব দীর্ঘদিনের। পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণ পানির সঙ্গেই তাদের বসবাস। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস হলেই ডিপ টিউবওয়েলগুলো অকার্যকর হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে এ এলাকার জন্য বড় ধরনের স্থায়ী পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট হাতে নেওয়া উচিত। সমুদ্রের পানি খাওয়ার উপযোগী করা সম্ভব, যা ভারত করতে পেরেছে। খরচও কম। যেহেতু এ অঞ্চলের মানুষজনকে আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবেলা করেই বসবাস করতে হব, সেহেতু এদের জন্য সুপেয় পানির বন্দোবস্ত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই; ৫. জলাবদ্ধতা এ অঞ্চলের মানুষের বড় সমস্যা। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সমুদ্রের লবণ পানি গ্রামে ঢুকে পড়ে, ওই পানি আর বের হতে পারে না। কয়রা-গারুয়ার মানুষ এই জলবদ্ধতার সঙ্গে নিত্যদিন ‘যুদ্ধ’ করে চলছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিয়ে এখানে ব্যাপক চিংড়ি চাষ করছে। ফলে নষ্ট হয়ে গেছে জমির উর্বরতা। এই জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী পরিত্রাণ পাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও এর গতি। বাংলাদেশের মতো সাগর পারের দেশগুলোকে এই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গেই যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হবে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সরকার হাতে নিতে যাচ্ছে। এখানে দুর্নীতি যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কয়রার ৫২ গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় বসবাসকারী একজন গ্রামবাসী যখন মিডিয়াকে বলেন, তাঁরা ত্রাণ চান না, চান স্থায়ী একটি বাঁধ, তখন এই সত্যটাই সামনে চলে আসে—একটি স্থায়ী বাঁধ দরকার। তথাকথিত বাঁধ নির্মাণের নামে শুধু মাটি ফেলে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত করে এই অঞ্চলের মানুষের সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। মৃত্যুর সংখ্যা ও সংক্রমণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। বাংলাদেশ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে করোনায় সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়া। বাংলাদেশ সম্ভবত ‘হার্ড ইমিউনিটির’ দিকে গেছে। কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে এই ধারণা কতটুকু প্রযোজ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ‘পিক’-এ পৌঁছে গেছে কি না, এ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। খুব দ্রুতই এই ভাইরাসটি বিশ্ব থেকে বিদায় নেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশকে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ‘ভাইরোলজি’ বিভাগকে শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্য সেক্টর থেকে দুর্নীতি কমানো, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও তার সদ্ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাইক্রো বায়োলজির মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সেখানে গবেষণার পরিসর বৃদ্ধি করা, হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড বৃদ্ধিতে পিপিই ধারণা কার্যকর করা, ভেন্টিলেটর তৈরিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা ইত্যাদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। করোনাভাইরাস ও আম্ফান—দুটিই আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই বিষয় দুটিকে গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া আমাদের বিকল্প নেই।

লেখক : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা