kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হোক আমাদের জীবন!

রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হোক আমাদের জীবন!

কাল ‘পুণ্য শুক্রবার’, যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুদিন। এই দিনে মানুষের পাপের পরিত্রাণের জন্য নিষ্পাপ ঈশ-মানব খ্রিস্ট অকাতরে তাঁর অমূল্য জীবন ক্রুশে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। খ্রিস্টানদের কাছে এ দিনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অসীম। আজ বিশ্বব্যাপী সব খ্রিস্টীয় মণ্ডলী  দিবসটি গভীর আত্মিক চেতনা-ভক্তিতে পবিত্র উপাসনা ও ধ্যানপূর্বক উদ্যাপন করছে।

খ্রিস্ট তাঁর মৃত্যর বিষয়ে বলেছিলেন, ‘পিতা আমাকে এই জন্য প্রেম করেন, কারণ আমি আপন প্রাণ সমর্পণ করি, যেন পুনরায় তাহা গ্রহণ করি। কেহ আমা হইতে তাহা হরণ করে না, বরং আমি আপনা হইতেই তাহা সমর্পণ করি। তাহা সমর্পণ করিতে আমার ক্ষমতা আছে; এবং পুনরায় তাহা গ্রহণ করিতেও আমার ক্ষমতা আছে; এই আদেশ আমি পিতা হইতে পাইয়াছি।’ (যোহন ১০:১৭-১৮)।

জগতের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনতত্ত্বের দ্বারা মানুষের বৈষয়িক উন্নতি হলেও পাপ ও তার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি হয় না। মানুষের যতই জাগতিক জ্ঞানের বৃদ্ধি, ততই যেন জ্ঞানপাপীর সংখ্যার বৃদ্ধি! এ জগতের জ্ঞানের দ্বারা মানুষের আত্মার মুক্তি হয় না বলেই ঈশ্বর জগতে তাঁর প্রেমে তাঁর একজাত পুত্রকে পাপের প্রায়শ্চিত্ত বলিরূপে প্রদান করলেন।

জগতের জ্ঞান দিয়ে শুধু যিশুখ্রিস্টের ক্রুশীয় মৃত্যুই নয়, তাঁর অলৌকিক জন্মসহ কোনো কিছুই বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন এক আধ্যাত্মিক চেতনা ও পিপাসার। খ্রিস্টে স্রষ্টা ঈশ্বর মানবরূপে তথা সৃষ্টিরূপে সৃষ্টির সঙ্গে নিজেকে শনাক্ত করেছেন তাঁকে শয়তানের রাজত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য। মানুষের দুঃখে ঈশ্বর দুঃখিত হন, মানুষের ক্রন্দন ঈশ্বরের ক্রন্দন। ক্রুশের মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর প্রেম, ধার্মিকতাকে ও ন্যায্যতাকে ব্যক্ত করেছেন।

ঈশ্বর পুরাকালে নবী যিহিস্কেলের মধ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘পাপীর মরণে আমার শান্তি নাই; বরং দুষ্টলোক যে আপন পথ হইতে ফিরিয়া বাঁচে ইহাতেই আমার সন্তোষ।’ (যিহিস্কেল ৩৩:১১)।

 খ্রিস্ট পাপী মানুষের হাতে হয়েছিলেন লাঞ্ছিত ও ক্রুশবিদ্ধ। ঈশ্বরের পবিত্রতা, ধার্মিকতা, প্রেম ও ক্ষমা তার হত হওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি তা প্রদর্শন করেছেন। আমাদের কাছে আজ স্বর্গের ঈশ্বরের আহ্বান ফিরে এসেছে, যেন আমরা আমাদের আত্মশুদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য তাঁরই আশ্চর্য প্রেমের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে চেষ্টা করি। মানুষের মহামুক্তির জন্য চাই ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ ও আমাদের মনের পরিবর্তন।

পবিত্র ও প্রেমময় ঈশ্বরেরই প্রয়োজন হয়েছিল মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ এক মুক্তিপণ দেওয়া। একমাত্র নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক খ্রিস্টই সে প্রয়োজন মেটাতে পেরেছেন। ঈশ্বরের প্রেম ও অনুগ্রহের শ্রেষ্ঠ দান খ্রিস্টের আত্মদানেই মানুষের পাপের ক্ষমা। সাধু যোহন তাই যিশুর বিষয়ে লিখেছেন, ‘ওই দেখো, ঈশ্বরের ঈশ্বর পরম পবিত্র, নির্মলচক্ষু ও ন্যায়বান। তিনি পাপ ও অপবিত্রতা দেখতে পারেন না; তাঁর ন্যায্যতায় তিনি পাপের দণ্ড অবশ্যই দেবেন যা হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা ও মৃত্যু; অন্যদিকে তিনি অনুগ্রহে পূর্ণ বলেই মানুষকে, অর্থাৎ তাঁর নৈতিক প্রতিমূর্তিকে তিনি রক্ষা করতে চান। সেহেতু মানুষের পাপের সম্পূর্ণ দণ্ড তাঁর একজাত পুত্র খ্রিস্টেতেই বর্তিয়েছেন। খিস্ট পিতা ঈশ্বরের প্রতি বাধ্যতায় সেই পৈশাচিক ক্রুশে হত হলেন, ঈশ্বর থেকে সেই বিচ্ছিন্নতা তথা মৃত্যু থেকে রক্ষা পায়, ঈশ্বরের ক্ষমায় পরিত্রাণ ও প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে। খ্রিস্ট মানুষের জন্য আত্মদান করলেন। তিনি ‘অন্য মানুষের জন্য একজন মানুষ’।” ‘যিনি পাপ জানেন নাই, ঈশ্বর তাঁকে আমাদের পক্ষে পাপস্বরূপ করলেন, যেন আমরা তাতে ঈশ্বরের ধার্মিকতাস্বরূপ হই।’ (২ করিন্থীয় ৫:২১ পদ)

তিনি অভিশপ্ত হয়েছেন যেন আমরা আশীর্বাদ পাই; তিনি আমাদের পাপ বহন করলেন যেন আমরা ধার্মিক হই; তিনি অপমানিত হয়েছেন যেন আমরা গৌরবান্বিত হই; তিনি ঘৃণিত ক্রুশে উঠে ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন যেন আমরা ঈশ্বরের কাছে যেতে পারি।

আমাদের জন্য তিনি মহান এক আদর্শ রেখেছেন। তা হলো ঈশ্বরের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস, ভক্তি ও বাধ্যতায় তাঁর কাছে জীবনকে সমর্পণ করা। আজ গোটা বিশ্ব্ব ও মানবজাতি এক মহামারির কবলে পড়েছে; এ এক প্রাণান্তকর মহাযুদ্ধ। মানুষকে তার সর্বশক্তি নিয়ে অতিশয় ক্ষুদ্র করোনা নামের এক কীটের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষের জীবন করোনা-কীট কেড়ে নিয়েছে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী এখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সে কীট মানুষকে ঠেলে দিয়েছে এক মৃত্যুচ্ছায়ার উপত্যকায়। জানি না আর কত মানুষের প্রাণ নিয়ে ওই যমদূত ক্ষান্ত হবে! এ কথাটা জানি যে মানুষের সব জরা-পীড়া, অশান্তি ও দুরবস্থার মূল কারণ স্বার্থপরতা, অহংকার ও দুর্দমনীয় লোভ। ওই সবের কারণে মানুষ প্রকৃতির সব কিছু আজ অপচয় ও অপব্যবহার করছে। যুদ্ধ ও মানুষ হত্যার জন্য মানুষের বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার ও পাউন্ডের বাজেট, কিন্তু মানুষের টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা-দীক্ষা ও গবেষণার তার শতাংশ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে না। এ জন্য প্রকৃতি আজ বিরূপ। মানুষের সব অনাচার ও অসংযমের বিরুদ্ধে আমাদের দুর্দশা যেন প্রকৃতির  প্রতিশোধ! সব মারি ও আঘাত যে মানুষের উদ্দেশে স্রষ্টার মাইক্রোফোন এবং তাঁর দিকে ফিরে আসার জন্য সেই সনাতন আহ্বান। এখন অনুতাপ সহকারে নম্রতায় ও সরলতায় প্রেমময় ঈশ্বরের কাছে আমাদের ফিরে আসতে হবে।  মানুষের এমন কোনো দুঃখ কিংবা ব্যথা নাই যা ঈশ্বর সেরে দিতে পারেন না।

যিশুখ্রিস্টের একটি পরিচয়, ‘তিনি অন্যের জন্য মানুষ।’ আমাদের কাছে তাঁর উদাত্ত আহ্বান, যেন আমরাও অন্যের জন্য মানুষ হই। কবি কামিনী রায় লিখেছিলেন : “পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও, তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও। পরের কারণে মরণেও সুখ। ‘সুখ, সুখ’ করিয়া  কেঁদো না আর, যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে, ততই বাড়িবে হৃদয়ভার। আপনারে ল’য়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে; সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”

আমাদের জন্য খ্রিস্টের আত্মদান ও তাঁর পবিত্র জীবন আমাদের নতুন এক জীবনবোধ ও নতুন আলোয় আলোকিত করুক!

 

লেখক : খ্রিস্টীয় ঈশতত্ত্বের শিক্ষক ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা