kalerkantho

শনিবার । ২১ চৈত্র ১৪২৬। ৪ এপ্রিল ২০২০। ৯ শাবান ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

ট্রাম্পের আসন্ন ভারত সফর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

জয়ন্ত ঘোষাল

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ট্রাম্পের আসন্ন ভারত সফর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে বড় খবর হলো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ দেশে আসছেন। শুধু ভারতের খবরই বা বলি কেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশই এ সফরের দিকে তাকিয়ে। শুধু দক্ষিণ এশিয়া কেন, চীনও তো এ সফরের দিকে কড়া নজর রাখছে।

মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের বেশ অল্প সময়ের মধ্যে অনেকবার বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প-মোদি একটা ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন যে তৈরি হয়েছে, তা-ও অস্বীকার করা যায় না। তবে এই যে বারবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, ট্রাম্পের এই সফরটি বিরল, স্ট্যান্ড-আল্যোন সফর, মানে ট্রাম্প শুধুই ভারতে আসছেন, তিনি পাকিস্তান যাচ্ছেন না, এটা কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সব প্রেসিডেন্টই ভারতে এলে পাকিস্তানেও আসেন। তা সে ক্লিনটন, বুশ, ওবামা যেই হোন না কেন। আর ট্রাম্প তো কখনো পাকিস্তানে যাননি।

আর মূল প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের এ ভারত সফরের তাৎপর্যটা কী? মানে ট্রাম্পের কী লাভ? তার চেয়েও বড় কথা হলো, ভারতের লাভ কী? এক কথায় এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া বেশ কঠিন। যদি বলি শূন্য, কোনো লাভই নেই ভারতের। একটাই লাভ, সেটা হলো ডাইভারশন। মানে, দেশের অর্থনীতির ভয়ংকর খারাপ অবস্থার মধ্যে ট্রাম্প আসায় আপাতত সংসদের বাজেট অধিবেশন ২ মার্চ শুরু হওয়ার আগে আমরা সবাই, মানে সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের সফর নিয়েই ব্যস্ত থাকব। অতএব মানুষও কিছুদিন অর্থনীতি নিয়ে ভুলে থাকবে। এই ধারণাটাও একটু বেশি সিনিক ধারণা বলে মনে হয়। আবার যদি বলি এই সফরের ফলে ট্রাম্প ভারতের আর্থিক চালচিত্রটাই বদলে দেবে, তবে ঢাকার রসিকতাই মনে পড়বে, ‘কত্তা, এ কথায় ঘোড়ায় হাসবে!’

সবচেয়ে প্রথমে মনে রাখতে হবে, আমেরিকা আর ভারতের আর্থিক সম্পর্ক খুবই অসম। এ সম্পর্ককে at per করা এত সহজ নয়। কারণ ভারত হলো মাথাপিছু দুই হাজার ডলারের দেশ আর আমেরিকা মাথাপিছু ৬০ হাজার ডলারের দেশ। সুতরাং আমরা যদি আমেরিকার পণ্যে ট্যাক্স না কমাই, তাহলে ট্রাম্প গোসসা প্রকাশ করলেও এর ফলে আমেরিকার অর্থনীতি বসে যাবে, মার্কিন ভোটে ট্রাম্পের প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যাবে এমন নয়; বরং আমার তো মনে হয়, মোদি স্নায়ুযুদ্ধে এ যাত্রা জিতেছেন। তিনি যে কিছুতেই বাণিজ্য চুক্তি করতে রাজি হননি, সেটা ভারতের জন্য, মানে আমাদের জন্য ভালো।

মনে রাখতে হবে, আমেরিকা পুঁজিবাদী দেশ। আর সব শেষে ট্রাম্প হলেন নিজেই একজন ব্যবসায়ী। তিনি তাঁর ভোটের আগে চাইছেন দেশের ব্যবসায়ীদের খুশি করতে। ভারতে আসা মার্কিন পণ্যের ওপর চাপানো বেশি কর কমাতে। আমি কয়েক মাস ধরে দেখছি, এ ব্যাপারে ইউরোপ ও পশ্চিমের অন্য দেশগুলোও সব আমেরিকাকে সমর্থন করছে। কারণ তারাও ভাবছে, এ কর কমলে তাদের পণ্যের ওপর চাপানো করও কমবে। বিশেষত মোবাইল-ইন্টারনেট-ল্যাপটপ ও তথ্য-প্রযুক্তি ডাটা ব্যবসা আর চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কিন্তু ভারতীয় শিল্প মার্কিন পণ্যের কর কমাতে চায় না। আরএসএস তথা সংঘ পরিবারেরও সাধারণ ধারণা হলো, আগে স্বদেশি পণ্যকে রক্ষা করতে হবে। তাকে যদি ভারতীয়  protectionism বলে সমালোচনা করেন ট্রাম সাহেব, তা তিনি করুন। চীন যখন এই কাজই করে, শুধু আমেরিকা নয়, আমাদের সঙ্গেও, তাঁর বেলায়? ইসরাইলের মতো বন্ধু দেশও আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তে করে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ‘গ্যাপ’ অনেকটাই। ট্রাম্প তো ভারতে আসার আগে টেলিভিশনে বাইট দিয়ে বলেছেন, ভারত আমাদের পণ্যের ওপর বড় করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে রেখেছে, তবু মোদিকে আমার পছন্দ।

কূটনীতি বড় মজার। এক রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ইতিহাস বলে, অনেক সময়ই তা হয়ে যায়। কিন্তু আসলে কখনোই তা ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থের ভিত্তিতেই এই সম্পর্ক নির্ধারিত হয়। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে ইন্দিরার আলিঙ্গনের ছবি তো পৃথিবী বিখ্যাত। এ কথাও সত্য যে ইন্দিরা গান্ধীর সৌন্দর্য ও কারিশমাও ছিল ভুবনজোড়া। কিন্তু তাই বলে কী কাস্ত্রো এমন কিছু করেছেন, যা শুধুই ভারতের স্বার্থে? কিউবার স্বার্থে নয়? এমনটা হয় না। মোদি ক্ষমতায় আসার পর ব্যক্তিগতভাবে শুধু ট্রাম নয়, জাপানের আবে, রাশিয়ার পুতিনসহ বহু রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তাই বলে কি ট্রাম্প তাঁর মার্কিন স্বার্থ রক্ষা ভুলে শুধুই মোদি ভজনা করবেন? কূটনীতিতে এই বিবিধ স্তরও তাই বড় চিত্তাকর্ষক।

 মোদি যে শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য চুক্তি করলেন না, তাতে ট্রাম্পের বিরাট ক্ষতি-বৃদ্ধি না হলেও তিনি খুশি হলেন না। এবার তাই ভারতে আসার সময় তিনি বাণিজ্যসচিবকে সঙ্গে নিয়েই এলেন না। আমেরিকার চীনের সঙ্গে একটা বাণিজ্য চুক্তি তো আছেই, এই সফরের পরেও আমেরিকা

WTO-র চুক্তির শর্ত মেনে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই থাকবে, সেটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। তাই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যতই গোসসা হোক, ট্রাম্প ভারতে এলেন। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও তিনি সরাসরি আহমেদাবাদ আসছেন। সাধারণত রাষ্ট্রপতিরা দিল্লিতে আসেন। তবু মুম্বাই বা ব্যাঙ্গালুরু আসেন, কিন্তু কখনোই এভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট গুজরাটে আসেননি। আসলে ভারতের জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। কূটনৈতিক সম্পর্কে এই স্নায়ুর লড়াই চলতেই থাকে। দর-কষাকষি, এসবের মধ্যেই ট্রাম্প আসছেন। আজ না হয় কাল বাণিজ্য চুক্তি হবে ধরে নিয়ে আমেরিকা এগোবে।

ভারতের এক বিশাল বাজার আছে। তা ছাড়া প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ভারতকে আমেরিকার দরকার। হেলিকপ্টার ভারত কিনছে আমেরিকার কাছ থেকে। তা ছাড়া ট্রাম্প কোনো দিন পাকিস্তানে যাননি। ইমরান খান এতবার নিমন্ত্রণ করা সত্ত্বেও ট্রাম্প এবারও পাকিস্তানে গেলেন না। এবারও ট্রাম্পের সফর হলো স্ট্যান্ড-অ্যালোন, এটাও কম কথা নয়। এ জন্য আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আসছেন, আমাদের অজিত ডোভালের সঙ্গেও তাঁর কথা হবে। পাকিস্তান ও চীনকে নিয়ে ভারতের অনেক নিরাপত্তার সমস্যা তো আছেই। তাই আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করাটা ভারতেরও প্রয়োজন।

হাউডি মোদির বদলে এবার গুজরাটে নবনির্মিত বিশাল স্টেডিয়ামের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আসলে হবে হাউডি মোদি, মানে নমস্তে ট্রাম্প। এসবই কূটনীতির ফিল গুড। কবে ওই ভিসা নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের জটিলতা কমবে, আমরা জানি না। আসলে কূটনীতি হলো গ্লাসের অর্ধেক জল। কূটনীতিতে একতরফা ভালো বা একতরফা খারাপ হয় না। কিছু ভালো আর কিছু মন্দ—এই সংমিশ্রণ নিয়েই সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিরূপিত হয়। আমরা সাংবাদিক। আমাদের একটা সমস্যা হলো, যাঁরা মোদিকে পছন্দ করেন না তাঁরা বলেন, মোদি এই কূটনীতিতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ, আবার যাঁরা প্রবলভাবে মোদি ভক্ত তাঁরা বলবেন, এই সফর হলো এক নব্য প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া। মোদির হাত ধরে ট্রাম্প ভারতে আসছেন। গুজরাটে লাখ লাখ মানুষ ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের শক্তি প্রদর্শন করবে। হুস্টনেও ৫৯ হাজার ভারতীয় আমেরিকান তাঁর নিজের দেশেই ট্রাম্পকে স্বাগত জানান, আর এখানে তো রাজ্যটার নাম গুজরাট। কাজেই এ হলো এক নতুন ধরনের পার্টনারশিপ বা বলা ভালো কৌশলগত শরিক সম্পর্ক। এই প্রথম স্থলসেনা, বায়ুসেনা ও নৌসেনা এই তিনটি ক্ষেত্রেই দুই দেশ যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ করছে। ন্যাটোর সদস্য না হয়েও যে এভাবে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা বেশ দেখার মতো ঘটনা।

অবশ্য হেনরি কিসিঞ্জার একদা বলেছিলেন, আমেরিকার শত্রু হওয়া বিপজ্জনক; কিন্তু আমেরিকার বন্ধু হওয়া অনেক সময় তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়ে যেতে পারে। ভারত তাই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক। বিশেষত্ব ট্রাম্প তো এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বুশ অথবা ওবামার সময় দক্ষিণপন্থী পপুলিস্ট নেতা কাকে বলে সেটাই আমরা জানতাম না, হুস্টনে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকার মতো বন্ধু ভারত আর পাবে না। আমরাও এই বন্ধুত্ব চাই। তবু মোদি যে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করছেন না তার প্রমাণও অনেক। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে যেভাবে আমেরিকা সমালোচনা করছে, তা থেকেই ভারতের এই দর-কষাকষির শক্তি টের পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেশ কিছু দেশীয় মাঝারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই চুক্তি করা হচ্ছে না দেশীয় কিছু পুঁজিপতির জন্য। দুগ্ধজাতপণ্য বহু ছোট ব্যবসায়ী বলছেন, এক পৃথক ভারতীয় দুগ্ধ ব্যবসার একচেটিয়া পুঁজিকে রক্ষা করার জন্যই আমেরিকার দুগ্ধ ব্যবসাকে ঢুকতে  দেওয়া হচ্ছে না। এই তর্কবিতর্ক চলুক। তবে এ কথা আপাতত স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে ভারত-মার্কিন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ভারতেরই স্বার্থে আজ প্রয়োজন। ঠাণ্ডা যুদ্ধের দিন শেষ হয়ে গেছে।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা