kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ঠিক পথে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ

আবদুল মান্নান

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ঠিক পথে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে কয়েক সপ্তাহ ধরে বলছে, বাংলাদেশ ঠিক পথেই আছে। অবশ্য তারা এই কাজ প্রতিবছরই করে থাকে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের কারণে এই বছরের এসব জরিপ একটু বাড়তি গুরুত্ব বহন করে। সর্বশেষ এমন মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘দি ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ সংক্ষেপে ‘আইআরআই’। এই জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক তাদের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টে’ বাংলাদেশের গত এক বছরে সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে ঠিক একই রকম মন্তব্য করেছে। এ মাসের শেষের দিকে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস ম্যাগাজিন লিখেছে, ‘এশিয়ার প্রবৃদ্ধির শীর্ষে থাকবে বাংলাদেশ।’ পাকিস্তানের জনপ্রিয় পত্রিকা দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণারত ড. সৈয়দ আখতার গত ১৫ জানুয়ারি লিখেছেন, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে কী শিখতে পারে?

(What can Pakistan learn from Bangladesh?)|’ এ তো গেল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথা। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষের কাছে জানতে চাইলে প্রায় সবাই বলবে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে তারা ভালো আছে। ব্যতিক্রম শুধু ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির মির্জা ফখরুল, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আর রিজভী আহমেদ। তাঁরা প্রতিদিন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে উত্খাত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত পলাতক চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ক্ষমতায় দেখতে চান। তাঁদের কথা অবশ্য আলাদা। কিছু একটা না বললে মিডিয়া থেকেও তাঁরা বিস্মৃত হয়ে পড়বেন।

ফিরে আসি বাংলাদেশ সম্পর্কে—সম্প্রতি প্রকাশিত দু-একটি প্রতিবেদনে। প্রথমে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশের ৪৯ বছর বয়সে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বমোট দেশ শাসন করেছে সাড়ে ২৯ বছর। এই সংখ্যা থেকে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছর বাদ দিতে হবে। কারণ ওই সাড়ে তিন বছর ছিল সার্বিক বিচারে একটি অস্বাভাবিক সময়। কারণ সেই সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে দাঁড় করানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সে সময়টা কেমন কঠিন ছিল, তা বর্তমান প্রজন্মকে বোঝানো সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়। তিনি যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটিকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ এই দুই মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। এই দুই মেয়াদে দেশের জন্য তাদের অবদান একেবারেই তলানিতে। তবে তারা দেশকে বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী দুর্নীতিতে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন করতে সক্ষম হয়েছিল। আর ২০০১-২০০৬ সময়ে তারা দেশে একটি দ্বৈত বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা চালু করার সংস্কৃতি চালু করেছিল। একটি খালেদা জিয়ার আর দ্বিতীয়টি তাঁর বর্তমানে পলাতক পুত্র তারেক রহমানের। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অনেকটা নিশ্চিত ছিল। এও নিশ্চিত ছিল যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে একটি পতনোন্মুখ বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ শেখ হাসিনা জাতির জনকের রক্তের উত্তরাধিকার। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনে কখনো মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেননি, ক্ষমতার রাজনীতি কখনো তাঁকে স্পর্শ করেনি। তাঁর কন্যা পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হবেন। তাই জনগণের প্রত্যাশা ছিল টানা তিন মেয়াদ, সর্বমোট চার মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার ফলে বদলে যাবে বাংলাদেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক চিত্র। শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে নিরাশ করেননি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের রোল মডেল। তবে বাংলাদেশ আরো যত দূর যেতে পারত তা সম্ভব হয়নি দুটি কারণে। একটি দুর্নীতি আর অন্যটি কিছু অথর্ব মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন, যাঁরা নিজের দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার প্রতি বেশি আগ্রহশীল।

বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, আগামী বছরগুলোতে বিশ্বে অর্থনীতির গতি শ্লথ থাকার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা চালু থাকবে। তবে দেশটির কিছু উন্নয়নবিষয়ক নীতি ও পরিকল্পনার পরিবর্তন করতে হবে আর জনসম্পদ উন্নয়নে আরো বিনিয়োগ করতে হবে। বিশ্বব্যাংক আরো বলছে, বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে থাকবে এবং দেশটির রপ্তানি আরো বৃদ্ধি পাবে। যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানের মতো স্থিতিশীল থাকে, উপরিকাঠামোর উন্নয়ন অব্যাহত থাকে, বাস্তবতার আলোকে কিছু অর্থনৈতিক নীতির পরিমার্জন হয়, তাহলে দেশের সার্বিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় না থাকার কোনো কারণ নেই। বিশ্বব্যাংক দেশের শ্রমিকদের তুলনামূলক উৎপাদনশীলতার ব্যাপরে কিছুটা চিন্তিত, যদিও তারা বলেছে, বিগত বছরে এই দিকে কিছুটা উন্নতি হলেও তা যথেষ্ট নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেশ দুর্বল। এই তিনটি দেশের জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ তরুণ। তাদের তারুণ্যের সুযোগ নিতে হলে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, বলছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের পরপরই ‘আইআরআই’ বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে সপ্তাহখানেক আগে। প্রতিবেদনটি জনমতের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের সহায়তা করেছে একটি স্থানীয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল রেডস্টার সায়েন্টিফিক। প্রতিবেদনের জন্য ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর দেশের আটটি বিভাগে দৈবচয়ন ভিত্তিতে চার হাজার ৯৯৩ জন প্রতিনিধিত্বমূলক স্যাম্পলের মতামত নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের অধীনে বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে। আগের বছর এই সংখ্যা ৬২ শতাংশ ছিল। লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, ২০১৩-১৪ সালের বিএনপি-জামায়াত জোটের পেট্রলবোমার সন্ত্রাস মোকাবেলা করে ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি, যখন শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেছিলেন তখন মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ বলেছিল দেশ সঠিক পথে আছে। ঠিক পরের বছর এই সংখ্যা ৫৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। গত এক দশকে বর্তমান সরকারের প্রতি জনসমর্থন কখনো ৫০ শতাংশের নিচে নামেনি। বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন হিসেবে যে কয়টি সূচক উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে আছে দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বস্তি, জননিরাপত্তা। সার্ভেতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ মনে করে, দেশ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে এবং কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে—ক. কৃষিপণ্যের সঠিক দাম না পাওয়া; খ. ক্রমবৃদ্ধি হারে দুর্নীতির প্রসার; গ. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি; ঘ. বেকারত্ব; ঙ. দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও চ. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উন্নত হবে। ৫৪ শতাংশের মতে, অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে আর ৪৯ শতাংশ মনে করে, জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা আরো উন্নত হবে। বিশ্বব্যাংক ও ‘আইআরআই’ উভয় সংস্থাই দেশের ধনী-দরিদ্রের মধ্যে আয়বৈষম্যকে উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখছে। সর্বশেষ যে বিষয়টির কারণে বাংলাদেশ উন্নয়নের যে জায়গায় অবস্থান করার কথা, সে জায়গায় পৌঁছতে না পারার অন্যতম কারণ এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারী ও ব্যবসায়ীর লাগামহীন দুর্নীতি। তাঁরা দেশের কোটি কোটি টাকা পাচার করে বিদেশে রংমহল বানাতে ব্যস্ত। যাঁরা দেশে ৫০ হাজার টাকার বেতনে অবসরে যাচ্ছেন, অবসরগ্রহণের মাস না ফুরাতেই তাঁরা কানাডা, দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লন্ডন বা অস্ট্রেলিয়ায় কয়েক কোটি ডলার ব্যয়ে হারামের পয়সায় বাড়ি কিনছেন। এই টাকা তো দেশের জনগণের টাকা। এই টাকা দিয়ে হতে পারত আরো একাধিক পদ্মা সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়েক শ স্কুল বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁদের অনেকেই আবার রাজনীতিতে সব সময় সক্রিয় থাকেন বা ছিলেন। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে অনেক কারণ আছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সৎ, যোগ্য ও সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় পদায়ন না করা; যার ফলে সরষের মধ্যে ভূত প্রবেশ করতে বেশি সময় লাগে না। দুর্নীতি দমনে প্রধানমন্ত্রীকে একজন নিঃসঙ্গ শেরপা মনে হয়। অনেক সময় এসব মানুষ তাঁকে শুধু বিভ্রান্তই করেন না, তাঁকে ভুল পরামর্শও দিয়ে থাকেন। তাঁর একার পক্ষে সব দিক সামাল দেওয়া তো সম্ভব নয়। তা যদি হতো, তাহলে এত সভাপারিষদ রেখে লাভ কী। এতে তো শুধু জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধ হচ্ছে। পর পর তিনবার বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় থাকার কারণে তাঁর চারপাশে একটা চাটুকারের বলয় সৃষ্টি হয়েছে বলে তাঁর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করেন। তাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝেন না। সরকারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে এই চাটুকার গোষ্ঠী, কোনো বিরোধী দল নয়।

সামনের মার্চ মাসের ১৭ তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী। এরই মধ্যে মাহেন্দ্রক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে। এটি তো প্রত্যাশা করাই যেতে পারে জাতির জনকের এই জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশের অগ্রগতির সব সূচক শুধু ভালো থেকে আরো ভালোই হবে না, তাঁর হাতে গড়া দল তাঁর কন্যার নেতৃত্বে সারা বিশ্বে একটি অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হবে। তবে এসব অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে, প্রথমে দেশ থেকে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করা আর যোগ্য মানুষকে সঠিক স্থানে পদায়ন করা ও তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা। আর তা করতে ব্যর্থ হলে ভেস্তে যেতে পারে অনেক অর্জন। এই মুহূর্তে সব কিছু ঠিকমতো চলছে, তবে তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ সব কিছু ঠিক রাখা।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা