kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নাম আমার ফকির সাহেব

রেডিও-টিভির তালিকাভূক্ত শিল্পী তিনি নন। আধুনিক যন্ত্রপাতি আর স্টুডিওতেও ধারণ করা হয়নি তাঁর গান। তারপরও মোবাইলে ধারণ করা তাঁর গান ইউটিউবে শুনছে লাখ লাখ মানুষ। তিনি ফকির সাহেব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। নিজের জীবনের গল্প শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



নাম আমার ফকির সাহেব

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

অনেকে কয় ফকির সাহেব, তোমার বংশপরিচয় কী? ফকির কি তোমার পদবি? আসলে তা নয়। আম্মার সন্তান হয় কিন্তু কোনোটা আর আটকে (বাঁচে) না। এভাবে চারজন মারা গেছে। পরে বড় আপু হলো। বুলবুলি। সবাই কাইলানি কইয়াই ডাকত। ছোট বোনটা অনেক সুন্দর ছিল। নাম বিউটি। এরপর আমি হইলাম। আমাকে সাত বাড়ি ভিক্ষা কইরা আইনা খাওয়াইত, যেন বাঁচি। তারপর আমার নাম হইছে ফকির। যখন একটু খাড়া হইলাম, হাতের লেখা সুন্দর, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হই, তখন মা আমারে একটা ফিলোসফির ভেতরে দাঁড় করাইছিল। মা বলছিল, ‘বাবা, তোর কিছু সাহেবি কর্মকাণ্ড আছে। তুই তো সাহেব।’ সেই থেকে আমি ফকির সাহেব। মূল নাম ওয়াজকুরুনী ফকির। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ভোতামারি ইউনিয়নে বাড়ি।

 

চিহ্ন তবু রয়ে গেছে

তখন এসএস হাই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি। পড়তে পড়তে একসময় হাওয়া। সীমান্তে তখন তারকাঁটার বেড়া ছিল না। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, মাথাভাঙা, দ্বীপহাটা—নানা জায়গায় গেলাম। সেখানে খোলটোল বাজাইতাম, গাইতাম।

শেষে শিলিগুড়ির রাজন হোটেলে মেসিয়ার হিসেবে কাজ নিলাম। ভালোই সময় কাটছিল। খালি একটা দাগ এখনো রয়ে গেছে পিঠে। একবার কাস্টমারের ভাষা বুঝিনি। এ জন্য আমার পিঠে গরম পানি ঢেলে দিছিল। ম্যালা দিন টাইম লাগছিল সারতে। ওইখান থেইক্যা বাড়িতে চইলা আইলাম। আবার স্কুলে গেলাম। স্কুল কামাই করতাম। এ জন্য একবার হেড স্যার পিডাইছিল ইচ্ছামতো। পরে তো কমার্স থেকে ৪.৬৩ (জিপিএ) পাইলাম। ভর্তি হইলাম আলীমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজে।

 

গুরুর নাম আশরাফ ভাণ্ডারী

আমার একজন শিক্ষাগুরু আছেন। আশরাফ ভাণ্ডারী। মোটা মোটা বই পড়েন; কিন্তু লোকটার কোনো সার্টিফিকেট নাই। তিনি শাকসবজির বীজ বিক্রি করতেন। কলেজে পড়ার সময় তাঁর বাসায় থাকতাম। ওইখানে গানবাজনা হইত। উনি আমাকে রাতের বেলায় সাইকেলে বিভিন্ন জায়গায় নিয়া যাইতেন গানবাজনা শোনার জন্য। কলেজে ভর্তি হইয়া আবার টাউটারি শুরু কইরা দিছি। পাতার বিড়ি খাইতাম খুব। যা হোক, কলেজে আর্টস থেকে ৪.০০ পাইলাম।

মায়ের সঙ্গে

এবার গার্মেন্টে

এইচএসসি পরীক্ষার পরে তো পোলাপাইন ভর্তি কোচিং করে। আমি কী করব? কোচিং করার জন্য টাকা থাকা লাগব না? তারপর গার্মেন্ট করতে আইলাম। সফিপুরে (গাজীপুর) ময়েজউদ্দিন গার্মেন্ট। গার্মেন্টে যাইয়া খাড়াই থাকি। মেজাজ খারাপ। এক মাস ছিলাম। কোয়ালিটিম্যান। বেতন পাঁচ হাজার টাকা।

 

আমার বন্ধু দিদার

আশরাফুজ্জামান দিদারের বাড়ি হাতীবান্ধার কালীবাড়িতে। আমাকে খুব পছন্দ করত। বলল, তোর জন্য নাট্যকলা পারফেক্ট। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা আছে তা-ও সে খুঁজে বের করল। সেকেন্ড টাইম ভর্তি পরীক্ষার সময় আমাকে নিয়ে এলো ঢাকায়। ২০১৩-১৪ সেশনে ভর্তি হলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। টাকা-পয়সা সব সে দিছে। ক্যাম্পাসে আইসা আবার থাকার জায়গা নাই। গাছের তলে ঘুমাই। পরে ঠিকানা হইলো শহীদ রফিক-জব্বার হল।

মোশাররফ করিমের সেলফিতে

ধুতরার গোটা খাইতাম

তখন একটা বাজে অভ্যাস ছিল—ধুতরার গোটা খাইতাম। ধুতরার গোটার নেশাটা ছাড়াইছে ইউসুফ (ইউসুফ হাসান অর্ক) স্যার। এখনো একটা ভালো গান লিখলে আমাকে ডাকেন। আরেকজন শিক্ষক আছেন—আফসার আহমেদ। ভালো কিছু লিখলে ফোন করেন। রায়হান রাইন স্যার তাঁর ‘নিক্রোপলিসের রাত’ বইটা আমাকে উৎসর্গ করেছেন। তখন গাঁজাও খাইছিলাম। অনেক কষ্টে এইটা থেকে মুক্তি লাভ করেছি। ফার্স্ট ইয়ারে একবার প্যারালিসিসে দুই পা অবশ হয়ে গিয়েছিল। আস্তে আস্তে ঠিক হইছে।

 

গ্যারেজে কাজ করতাম

মনে করেন, চার-পাঁচজন মিইল্যা খাইবার গেছি। প্রতিদিন আপনিই বিল দেন। কেমন লাগে না? এটা তো ইজ্জতের ব্যাপার। এদিকে টিউশনি পাওয়া যায় না। পকেটে টেকাটুকা থাকে না, বই কিনতে পারি না। কয়েক মাস রিকশা চালাইছি। তারপর বাইপাইলে একটা গ্যারেজে কাজে লাগি। মোটরসাইকেল ঠিক করি। যখনই টাকার শর্ট পড়ে, যাই। মোটরসাইকেলের কাম শিখছি ইন্ডিয়ায়। হোটেলে চাকরি করার ফাঁকে ফাঁকে বাইকে চড়ব দেখে এক ছেলের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক রাখছিলাম। ওর সঙ্গে বিভিন্ন গ্যারেজে যাইতাম। মধুসূদন নামে এক লোক ছিল গ্যারেজে। তার কাছ থেকেও শিখছি। লোকটা আমারে কইছিল, ‘তোর সঙ্গে আবার দেখা হবে রে। তার আগে তুই মরবি না।’

গ্যারেজে ফকির সাহেব

 

৫০০ টাকার জন্য ইনজেকশন দিতে পারি নাই

ভাই, ক্ষুধার কী যে কষ্ট, আমি বুঝি। ২০০০ সালে বাবা মারা গেল। বিশ্বাস করবেন না, তখন এমন অভাব আমাদের। বর্ষাকাল। তিন-চার দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি। ঘর থেকে বাইর হইতে পারি না। ঘরে খাবার নাই। মা একবার অসুখে পড়ছিল। ৫০০ টাকার জন্য একটা ইনজেকশন দিতে পারি নাই! আমি তো ফকির। আমার খারাপ লাগে। তখন থেকে মনে হইলো, হিউজ পরিমাণ টেকার দরকার। পড়াশোনা গোল্লায় গেল। ক্যাম্পাসে ফার্স্ট ইয়ারে পরীক্ষাগুলো ঠিকমতো দেওয়া হয় নাই। একটা মোটরসাইকেল বানাইছি। নাম দিছি ময়ূরপঙ্খী। লিটারে এক শ কিলোমিটার যায়। এইটা দিয়াই লালমনিরহাট যাই, আসি। মা এখন ভালো আছে।

 

কী বুইঝা কানতাছে ওরা?

বাড়ির পাশে বিশাল এক মন্দির ছিল। রাধাকৃষ্ণ মন্দির। রাসমেলা হয়। সেখানে গান গাইতাম। মন্দিরে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা পদাবলী কীর্তনসহ নানা গান হইত। একটা গানের কথা মনে আছে, ‘এইবার করুণা করো বৈষ্ণব গোসাই।’ বাবাও গান গাইতেন। নাম ভিক্ষু সাধু। সন্ন্যাসী ছিলেন। তিস্তার চরে বিভিন্ন ভাণ্ডারি অনুষ্ঠানে যাইতাম। মাঝরাতে যখন বিচ্ছেদের গান গাইত, মানুষ হু হু কইরা কানত। ভাবতাম, কী বুইঝা কানতাছে ওরা?

 

গানটা ভাইরাল হয়েছিল

রের্কড করা গান শুনি। আমার মোবাইলে যত গান দেখবেন, সব রেকর্ডিং। কোনো অনুষ্ঠানে রেকর্ড করেছি। যখন সময় পাইছি শিল্পীরে জিজ্ঞেস করেছি, আপনার গানের ফিলোসফিটা কী। মারফতি, বাউল, ফোক, দেহতত্ত্বের গান বেশি গাই। খালি গলায় গাইতে ভালো লাগে। ‘শহর থেকে দূরে’ নামে একটা অনুষ্ঠান হয় দুরন্ত টিভিতে। সেই অনুষ্ঠানের শুটিংয়ে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপে। সেখানে একটা গান করেছিলাম, ‘ভাব আছে যার গায়, দেখলে তারে চেনা যায়। সর্ব-অঙ্গ তাহার পোড়া রে।’ কে জানি রেকর্ড করে এটা ‘তারকাঁটা’ নামে পেজে (ফেসবুক) ছাড়ছে। এটা ভাইরাল হয়ে গেল। এতে একটা উপকার হলো—কয়েক হাজার বই উপহার পাইছি বাইরের দেশ থেকে। অনেকে মোবাইল, ল্যাপটপসহ নানা কিছু পাঠাইতে চাইছে। বলছি, বই দেন। ত্রিশ হাজারের মতো বই আছে।

 

সাপ নিয়া ডিপার্টমেন্টে যাইতাম

ভিক্ষু সাধুর এক শিষ্য আছে—নারায়ণ পাগলা। আসামে থাকে। মাঝেমধ্যে আসত। আমাকে কাঁধে নিয়ে বেড়াইছে। তার কাছ থেকে পাখির ভাষা, জীবজন্তুর ভাষা শিখছি। দীর্ঘদিন এটা প্র্যাকটিস করছি। আমি কিন্তু আগে সাপ নিয়া ডিপার্টমেন্টে যাইতাম। একটা সাপ পালতাম। লাউডগা। সবুজ রঙের। বান্দর (বানর) আর শিয়ালও ছিল। এদের নিয়ে গানবাজনা করতাম। বান্দরটা মরে গেছে। শিয়াল ছাইড়া দিছি।

 

আর কিছু চাই না গান ছাড়া

গানে আমি কোনো দিন বিজনেস পারপাসে যামু না। এ জন্য আলাদা করে টাকা জমাইছি। যেইটা দিয়া ইউনিভার্সিটি লাইফটা সিম্পল করে কাটাইতে পারি। ভিক্ষু সাধুর গানগুলো আমাকে খুব নাড়া দিছে। তাঁর প্রায় ২০০-৩০০ গান আমার কাছে আছে। বুলবুলী আপা সংগ্রহ করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গান গাইতে গেছি। আমার বেশ কয়েকটা গান এখন মানুষ জানে। যে গানগুলো প্রচার হয় নাই, সেগুলোই কালেক্ট করছি। ঠমক, একতারা, গাবগুবি, করতাল, ঘুঙুর—সব নিজের বানানো। হাই অ্যাম্বিশন নাই আমার। ডাইনিংয়ে দুই হাজার টাকায় মাস চলে যায়। এক লিটার তেল তুলি। ১০০ কিলোমিটার যাইতে পারি। সুন্দরমতো ঘুরি। কারো সঙ্গে কোনো প্যাঁচগোছ নাই। মাঝেমধ্যে গুরুদুয়ারা নানকশাহিতে যাই। আজীবন গানবাজনা করতে চাই।

 

অনেকে আসেন

সাহিত্যিক, শিক্ষক, ব্যাংকার থেকে শুরু করে অনেকে আসেন আমার কাছে। মা একটা কথা বলতেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে একটা সার্টিফিকেট দেবে। কিন্তু তুমি বিচার করে দেখো, আমার মাধ্যমেই তোমাকে আসতে হইছিল। আমার মাধ্যমে আসছ বলে তুমি এত মানুষের সঙ্গে কথা বলো, মিশতেছ।’ এই জিনিসটা ভুলি না কখনো। এ জন্য কখনো কোনো মানুষের সঙ্গে রাগ করি না। সারা দিনই মানুষ আসে। মোশাররফ করিমের কথা তো অনেকেই জানে। তাঁর বন্ধু আমার ডিপার্টমেন্টের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হাসান অর্ক। তাঁর মাধ্যমে প্রথম এসেছিনেল। এখন সময় পেলেই আসেন। রিসেন্ট কোরিয়া থেকে আসছিল পাঁচজন। এর আগে চীন ও স্পেন থেকেও আসছিল। বিপিএটিসিতে (বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র) সরকারি কর্মকর্তাদের ট্রেনিং হয়। একবার সেখান থেকে অনেক পুলিশ অফিসার এসেছিলেন। এক ভাই আসেন গুগলে চাকরি করেন। আমার গান শুনে তিনি একটা সফটওয়্যার দিয়েছেন, যেটা দিয়ে গান অনুবাদ করা যায়।

 

‘মজিয়াছি আপন পিরিতে’

আমাকে অনেকে ‘পাগল’ কয়। লালনের গানের এক জায়গায় আছে, ‘লালন বলে মজিয়াছি আপন পিরিতে।’ ক্লাস যখন থাকে না, তখন জঙ্গলে থাকি। হোন্ডা (মোটরসাইকেল) নিয়ে প্রচুর ঘুরি। মানুষের সঙ্গে থাকি না। যে জায়গায় আমাকে কেউ চেনে না, সেখানে গিয়ে বসে থাকি। প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের গান শোনাই। যেখানে প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের স্কুল আছে, সেখানে আমি আছি। ওদের কাছে যাই ওদের ভাষা বোঝার জন্য। ধরেন, একজন ঠোঁটকাটা। সে-ও হাসবার চায়; কিন্তু পারে না। তাগো কাছে যাই, হাসিঠাট্টা করি। আমার ফিলোসফি হইলো, জীবনটা উদ্‌যাপন করে যাইতে হবে। যাপন তো সবাই করে। বার্ট্রান্ড রাসেল, এস এম সুলতান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ এ রকম বড় লোকগুলো সম্পর্কে পড়েছি এই কারণে—শাহ আব্দুল করিম কইছে, মানুষ থুইয়া খোদা ভজে এই মন্ত্রণা কে দিছে? এই কথা ভালো লাগছে। গান টুকটাক লেখি। কয় দিন আগে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘আলফা’ সিনেমা দেখে একটা গান লিখেছি—সখী আমি কোন দেশে যাই/যে দেশে আমার কোনো ঠিকানা নাই! সম্প্রতি কাঠবিড়ালি নামে একটা সিনেমায় কণ্ঠ দিয়েছি, অভিনয়ও করেছি।

 

সংসার করার ইচ্ছা নাই

বাড়িতে ২০০০ লিচুগাছ লাগাইছি। মা-ও আছে। তাগো নিয়ে থাকব। আমার একটা গান আছে, ‘কূল ভাঙা এক নদীর তীরে বান্ধিয়াছি ঘর/ কুনসুম জানি যায় ভেসে যায় আশার বালুচর।’ তাই সংসার করার ইচ্ছা নাই। এক ইহুদি মেয়ের সঙ্গে রিলেশন ছিল বছর দুয়েক। পরে বাদ দিছি।

ছবি : সংগ্রহ

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা