kalerkantho

এডিস মশার বংশবৃদ্ধি, স্বভাব ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

ড. তাহসিন ফারজানা

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এডিস মশার বংশবৃদ্ধি, স্বভাব ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

সাম্প্রতিককালে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে একজন মশা গবেষক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই লিখছি। জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় এডিস মশার বংশবৃদ্ধি, বায়োলজি এবং ইকোলজি আমার গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ছিল। এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস দুই প্রজাতির মশা নিয়েই আমি কাজ করেছি। এডিস মশার বৃদ্ধির ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার তথা তাপমাত্রা ও খাদ্যের প্রভাব নিয়ে আমি বিস্তারিত গবেষণা করেছি। এ ছাড়া এডিস মশা একাধিকবার রক্ত খায় (Multiple blood feeding) কি না ও একাধিকবার পোষক খোঁজে (Host seeking) কি না—এ বিষয়গুলোও আমার কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই পরীক্ষাগুলো করার জন্য মশাগুলোকে আমার নিজের হাতের রক্ত খাওয়াতে হয়েছে। অবশ্য এর কারণও ছিল। নিজের হাতে রক্ত খেতে দিলে ঠিকমতো নিরীক্ষণ করা যায়, ওরা কত সময় নিয়ে কতটুকু রক্ত খায় এবং রক্ত খাওয়া শেষ হলে আরো পোষকের খোঁজ করে কি না? এই কাজে আমাকে সহযোগিতা করেছেন আমার পিএইচডি সুপারভাইজার প্রফেসর ড. নোবোকো সুনো। অনেক দিন আমরা দুজন একসঙ্গে মশাকে রক্ত খাইয়েছি। উল্লেখ্য যে মশাগুলো গবেষণাগারে আমিই উৎপাদন করেছি এবং এরা সংক্রমণমুক্ত ছিল।

ঢাকাসহ সারা দেশে বিপজ্জনক হারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে নতুন নতুন রোগী। ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত করা গেলেও এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হচ্ছে, এ বছর বৃষ্টিপাত একটু আগেই শুরু হওয়ায় হঠাৎ করে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার প্রজনন বেড়ে গেছে। আমরা সবাই জানি যে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়ায়। এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস নামের মশার দুটি প্রজাতি ডেঙ্গু রোগের বাহক। এর মধ্যে এডিস ইজিপ্টি হলো প্রাইমারি ভেক্টর বা প্রধান বাহক। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিক্টাস হলো দ্বিতীয় প্রধান বাহক। এডিস ইজিপ্টিকে বলা হয় ফড়সবংঃরপ বা গৃহপালিত মশা। এরা সাধারণত ঘরের ভেতর, বারান্দা বা ছাদে ফুলের টব, জমানো পানির পাত্র, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন বাড়ির পাশে রাখা চৌবাচ্চা বা ড্রাম, কনডেন্সড মিল্কের কৌটা, নারিকেলের খোল ইত্যাদি মানুষের তৈরি কৃত্রিম পানির পাত্রে বংশ বৃদ্ধি করে। এদের শহরের মশাও বলে। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিক্টাসকে গ্রাম মশা বা মফস্বলের মশা বলা হয়। কারণ এরা সাধারণত মফস্বল শহরে বা গ্রামে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বদ্ধ স্বচ্ছ পানির উৎস, যেমন—গাছের গর্ত, কাটা বাঁশের গুঁড়ি, ভাঙা রাস্তা, ডোবার স্বচ্ছ পানি ইত্যাদি স্থানে বংশ বৃদ্ধি করে। এদের Forest mosquito বা বন্য মশাও বলে। এডিস অ্যালবোপিক্টাসের আরেক নাম এশিয়ান টাইগার, কারণ এরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় মশা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এই দুই ধরনের মশাই একে অন্যের প্রজনন স্থানে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে।

সাধারণত বদ্ধ পরিষ্কার পানি এডিস মশার প্রজনন স্থান। তবে এডিস মশা সরাসরি পানিতে ডিম পাড়ে না। পানির স্পর্শে থাকে এ রকম জায়গায় অর্থাৎ পানির পাত্রের গায়ের ভেজা অংশে বা পানিতে ভাসমান পাতায় এডিস মশা ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলো শুকনা অবস্থায় ছয় থেকে ৯ মাস বেঁচে থাকতে পারে (এমনকি বিজ্ঞানীরা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এদের ডিমের বেঁচে থাকার প্রমাণ পেয়েছেন)। পরবর্তী সময়ে পানির স্পর্শে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয় এবং স্বচ্ছ পানিতে বৃদ্ধি লাভ করে। সাধারণত দেখা যায়, কোনো বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এডিস মশা যেসব পাত্র বা স্থানে ডিম দেয়, পরের বছরে এপ্রিল-মে মাসের বৃষ্টিপাতে সেসব পাত্র বা স্থানে পানির ওভারফ্লো বা আধিক্য হলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এ জন্য প্রতিবছর এপ্রিল-মে মাসে বৃষ্টি শুরু হলে মশার যে প্রজন্ম তৈরি হয়, সেগুলো জুন-জুলাই মাসে ডেঙ্গু ছড়ায়। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসেই বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার দরুন একটু আগেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এডিস মশার লার্ভা সাধারণত ঘোলা বা অপরিষ্কার পানিতে বাঁচতে পারে না, কারণ নোংরা পানিতে অতিরিক্ত মেটাপবোলাইটস জমা হয় এবং পানির উপরিভাগে একটি স্তর পড়ার দরুন লার্ভা বা পিউপা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। এডিস মশা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সর্বনিম্ন সাত থেকে ১০ দিনে জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে। পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। যদিও ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও তার ওপরের তাপমাত্রায় এডিস মশার বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং মৃত্যুহার বেড়ে যায়। কম তাপমাত্রায় বড় আকারের মশা জন্ম নেয় এবং বেশি তাপমাত্রায় ছোট আকারের মশা জন্ম নেয়। এই ছোট আকারের মশাগুলো তার প্রজনন চাহিদা পূরণে একাধিকবার রক্ত গ্রহণ (Multiple blood feeding) করে। যার ফলে ছোট আকারের মশাগুলো জীবাণু দ্বারা অধিক সংক্রামিত হয়।

পুরুষ মশা রক্ত খায় না, এরা সাধারণত ফুল ও ফলের রস বা যেকোনো শর্করার উৎস থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। স্ত্রী মশাও পুরুষ মশার মতো ফুল-ফলের রস বা শর্করার উৎস থেকে খাদ্য খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তবে স্ত্রী মশা তার ডিমের ক্রমবিকাশের জন্য রক্ত খেয়ে থাকে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। এরা সূর্যোদয়ের দুই ঘণ্টা পর এবং সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা আগে বেশি সচল থাকে। এ ছাড়া এরা উজ্জ্বল আলোতে রাতেও কামড়াতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার রোধ করতে হবে এবং মশা যেন কামড়াতে না পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এডিস মশা নিধনের জন্য সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে দুটি দিক অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে—এক. মশার প্রজনন স্থানগুলোকে ধ্বংস করতে হবে এবং দুই. পাশাপাশি বয়স্ক মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মশার প্রজনন স্থানগুলোকে ধ্বংস করতে হলে বাড়িতে এবং আশপাশে বদ্ধ বা জমানো পানির পাত্র দুই-এক দিন পর পর পরিষ্কার করতে হবে। ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোল, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে লার্ভানাশক ব্যবহার করতে হবে। অন্যদিকে বয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু রাস্তায় ফগিং বা ধোঁয়া ছড়ালে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে না। কারণ এডিস মশা সাধারণত ঘরের ভেতর জন্ম নেয় এবং বিশ্রাম নেয়। তাই ঘরের ভেতরে স্প্রে করতে হবে, যাতে ঘরের ভেতরের মশা মারা যায়। দেশের এই দুর্যোগময় সময়ে ঘরের ভেতরে এবং বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনবোধে বিশেষ ফোর্সের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

বিভিন্ন দেশে এডিসবাহিত রোগ প্রতিরোধে কিছু বায়োলজিক্যাল পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে একটি প্রাণঘাতী জিন পুরুষ মশায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এই পুরুষ মশাটির স্পার্ম বা শুক্রাণু প্রাণঘাতী জিন বহন করে। গবেষণাগারে সৃষ্ট এসব পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দেওয়া হলে প্রকৃতির স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়ে এরা যে প্রজন্ম সৃষ্টি করে, সেগুলো বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারে না। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পুরুষ মশা ক্রমাগত প্রকৃতিতে ছাড়তে হয় বলে এ পদ্ধতিটি ব্যয়বহুল।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের আরেকটি পদ্ধতি হলো উলবাচিয়া পদ্ধতি। উলবাচিয়া হচ্ছে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গের মধ্যে থাকে। প্রায় ৬০ শতাংশ কীটপতঙ্গের মধ্যে উলবাচিয়া থাকলেও এডিস মশার মধ্যে থাকে না। এডিস মশার শরীরে এই উলবাচিয়া ব্যাকটেরিয়া ঢুকিয়ে দেওয়া হলে সেই মশাগুলো ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া ছড়াতে পারে না। কারণ উলবাচিয়া ব্যাকটেরিয়া মশার ভেতরে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া ভাইরাসকে রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি তৈরি করতে দেয় না। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এই পদ্ধতিটি অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেই সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে। আমাদের দেশেও এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা সম্ভব।

ঢাকা ছাড়া দেশের বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে এডিস মশা ছড়িয়ে গেছে। সামনে কোরবানির ঈদে ঢাকা থেকে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ঈদ পালনের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করবে, যাদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী থাকাটাই স্বাভাবিক। এখন থেকেই প্রতিরোধের পদক্ষেপ না নিলে ঈদের পর দেশব্যাপী ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সময় বেঁধে দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমন্বয় প্রয়োজন। ডেঙ্গু মোকাবেলায় সর্বপ্রথম প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুরক্ষা। পরিবারের লোকজনকে যাতে মশা না কামড়ায় তার জন্য মশার কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করতে হবে। দিনের বেলায় ঘুমালে অবশ্যই মশারি টানিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে। শরীর কাপড় দিয়ে যথাসম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে যাতে কোনো মশা কামড়াতে না পারে সেদিকে অবশ্যই সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, কারণ আক্রান্ত রোগীই ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎস। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ন্যাশনাল গাইডলাইন থাকতে হবে। সরকারকে বিদেশ থেকে উলবাচিয়া আক্রান্ত বা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা আমদানি করা বা বিশেষ ফোর্স কাজে লাগানোর দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের এই দুর্যোগ মুহূর্তে বিচলিত না হয়ে সবাই একযোগে কাজ করলে অবশ্যই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

মন্তব্য