kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

আনাড়ি চালকরাও ভারী গাড়ির লাইসেন্স পাচ্ছেন

পরিবহন নেতাদের চাপে শর্ত শিথিল

পার্থ সারথি দাস   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আনাড়ি চালকরাও ভারী গাড়ির লাইসেন্স পাচ্ছেন

হালকা লাইসেন্সধারী চালক চালাতে পারবেন শুধু মোটরসাইকেল বা অটোরিকশার মতো যানবাহন। এতে অভিজ্ঞ হলে মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স পাওয়া যায়, যা দিয়ে চালানো যায় মিনিবাস, পিকআপ, হিউম্যান হলার, প্রাইভেট কার, জিপ ও ট্রাক্টরের মতো গাড়ি। বাস ও ট্রাকের মতো ভারী গাড়ি চালাতে হলে লাইসেন্সও হতে হবে ভারী, যা মধ্যম শ্রেণির গাড়ি সন্তোষজনক সময় পর্যন্ত চালানোর পরই পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভারী লাইসেন্স নেই, কিংবা থাকলেও তা নেওয়া হয়েছে সব শর্ত পূরণ না করে—এমন চালকের কারণে প্রায়ই বাস-ট্রাক দুর্ঘটনা ঘটছে। এ থেকে উত্তরণে যখন আইনকানুন আরো কঠোর করার দাবি উঠেছে, তখন উল্টো পরিবহন নেতাদের চাপের মুখে কর্তৃপক্ষ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রচলিত আইনের শর্ত শিথিল করেছে গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে। গতকাল বুধবার এই প্রতিবেদক এসংক্রান্ত নথি হাতে পান।

নতুন সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুসারে, হালকা মোটরযান চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার পর এক বছর পার হয়ে গেলেই মধ্যম শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার আবেদন করা যাবে, যা আগে ছিল তিন বছর। এ ছাড়া একইভাবে মধ্যম শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী লাইসেন্স

নেওয়ার কমপক্ষে এক বছর পর ভারী লাইসেন্স পেতে আবেদন করতে পারবেন, যা আগে ছিল তিন বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শর্ত শিথিল করায় সুপারিশে ও অনভিজ্ঞ চালকদের লাইসেন্স পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে, যা পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়াবে, বাড়বে সড়কে দুর্ঘটনাও।

মোটরযান অধ্যাদেশ অনুসারে, গ্রাহককে প্রথমে লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়। এটি হাতে পেলে আবেদনকারী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। দুই থেকে তিন মাস প্রশিক্ষণের পর শিক্ষানবিশ চালককে নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে নির্ধারিত কেন্দ্রে লিখিত, মৌখিক ও মাঠে গাড়ি চালনার পরীক্ষা দিতে হয়। উত্তীর্ণ হলে দেওয়া হবে লাইট বা হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স। পেশাদার লাইসেন্স তিন ধরনের। পেশাদার হালকা (গাড়ির ওজন আড়াই হাজার কেজির নিচে) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে। পেশাদার মধ্যম (মোটরযানের ওজন আড়াই থেকে সাড়ে ছয় হাজার কেজি) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৩ বছর হতে হবে ও পেশাদার হালকা ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবহার কমপক্ষে তিন বছর হতে হবে। পেশাদার ভারী (মোটরযানের ওজন ছয় হাজার ৫০০ কেজির বেশি) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৬ বছর হতে হবে এবং পেশাদার মধ্যম ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবহার কমপক্ষে তিন বছর হতে হবে।

জানা গেছে, নতুন সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুসারে, আগামী জুন পর্যন্ত এই শর্ত শিথিল থাকবে। সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিএ সংস্থাপন শাখা। হালকা ও মধ্যম শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েই চালকদের প্রায় ৪০ শতাংশ ভারী গাড়ি চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সড়কে পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিযানের ফলে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন জেলার অনেক ভারী গাড়ির অবৈধ চালকরা বিপদে রয়েছেন বলে জানা যায়। অভিযানের মধ্যে এসব চালক রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারছেন না। নয়তো আগের মামলার কাগজ দেখিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

গত জুলাই ও আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর যথাযথ শ্রেণির লাইসেন্স না থাকায় চালকদের বড় একটি অংশের এই ‘বিপদ’ কাটাতে পরিবহন নেতারা শর্ত শিথিল করার চাপ দিতে থাকেন। এর পরই কর্তৃপক্ষ নমনীয় হয় বলে জানা যায়।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারদের চাপে পড়ে শর্ত শিথিল করার দরকার পড়েছে এ কারণে যে আমাদের দেশে গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্য চালকই নেই। সারা দেশে গাড়ি আছে প্রায় ৩৫ লাখ, লাইসেন্স আছে প্রায় ২৩ লাখ। প্রায় ১২ লাখ চালকের লাইসেন্সই নেই। এর বাইরে যথাযথ শ্রেণির লাইসেন্সধারী চালকের সংকটও আছে। এ কারণে চালকদের রেহাই দেওয়া হচ্ছে। বিআরটিএর মধ্যে পদ্ধতিগত সমস্যা রয়েছে।’

বিভিন্ন পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, দেশে ভারী গাড়ি চালানোর জন্য প্রায় আড়াই লাখ বৈধ চালকের সংকট আছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, দেশে বাস-ট্রাক ও ট্যাংক লরি সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে আড়াই লাখ চালকেরই ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে সময়ক্ষেপণ ও হয়রানি এবং ঘুষ দাবির কারণে আবেদনকারী চালকরা হালকা বা মধ্যম থেকে ভারী শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে আবেদন করেও পাচ্ছেন না। এ কারণে আমরা শর্ত শিথিল করতে বলেছি মন্ত্রণালয়কে। না হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করার স্বাভাবিক পরিবেশে নষ্ট হবে।’ উল্লেখ্য, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বয়স কমপক্ষে ২০ বছর হতে হয়। তবে অপেশাদাররা ১৮ বছর বয়স হলেই লাইসেন্স নিতে পারেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা