kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

পারস্য যেভাবে আমাদের হলো

প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পারস্য যেভাবে আমাদের হলো

পারস্য সম্রাট মহানবী (সা.)-এর প্রেরিত চিঠি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলেছিল। এ ঘটনা শুনে মহানবী (সা.) মুসলমানদের হাতে পারস্য বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাঁর ওফাতের অল্প দিনের মাথায় এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়।

মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবিত থাকা অবস্থায়ই পারস্য সাম্রাজ্যের অধীন ইয়েমেনের শাসনকর্তা বাজান ও তাঁর লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ফলে ইয়েমেন মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের আওতায় চলে আসার মাধ্যমে পারস্য বিজয়ের সূচনা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে পারস্য সাম্রাজ্যের প্রভাবিত এলাকা বাহরাইনের শাসনকর্তা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় বাহরাইনও মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের অল্পকাল পরে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খিলাফতের সময় বাহরাইনের মুসলিম শাসনকর্তার মৃত্যু হলে ওই প্রদেশে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সেখানকার বনু আবুল কায়েস নামে একটি গোত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিল। আর বনু বকর গোত্রটি ইসলামবিরোধী ছিল। পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের এ দুটি গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। বনু আবুল কায়েসের গোত্র খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে সাহায্য চাইল। আর আবু বকর গোত্র পারস্য সম্রাটের কাছে সাহায্য চাইলে তারা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। বনু বকর ও পারস্যের এ সম্মিলিত বাহিনী মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যায়। ফলে বাহরাইনের শাসনক্ষমতা মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের হাতেই অটুট থেকে যায়।

যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পারস্য বাহিনী মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের সীমান্তে বিভিন্ন অমুসলিম গোত্রের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক তৎপরতা শুরু করে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে পারস্য সীমান্তে বিদ্রোহের আশঙ্কা দূর করতে খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতি মুসান্নার নেতৃত্বে আট হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী সংশ্লিষ্ট পারস্য সীমান্তে প্রেরণ করেন। মুসান্না ও খালিদের যৌথ বাহিনী উবান্ন্নার ৫০ মাইল দক্ষিণে হাফির নামক স্থানে পারস্যের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পারস্য বাহিনী পালাতে থাকে। মুসলিম বাহিনী তাদের ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত পশ্চাদ্ধাবন করে।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পারস্য সম্রাট খালিদ ও মুসান্নার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে সেনাপতি বাহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন বাহিনী প্রেরণ করেন। ওয়ালাজা নামক স্থানে এ বাহিনী মুসলিম বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এরপর সেনাপতি খালিদ অন্য একটি পারসিক বাহিনীকে উলিসের যুদ্ধে পরাজিত করে হীরা অধিকার করেন। হীরা বিজয়ের পর সেনাপতি খালিদ উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আনবার নামক স্থানটি অধিকার করেন। এরপর আনবার থেকে কিছু দূরে অবস্থিত আইনুত তামুর ও দুমা স্থান দুটিও দখল করেন।

হীরাসহ উপরোক্ত এলাকা মুসলমানদের অধিকারে চলে আসার পর খলিফা আবু বকর (রা.)-এর নির্দেশে মহাবীর খালিদ ইরাক থেকে সিরিয়ায় চলে যান। এ সময় হীরা উদ্ধারের জন্য পারস্য সম্রাট বিখ্যাত সেনাপতি রুস্তমের নেতৃত্বে এক বিরাট সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। এ সময় মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) ইন্তেকাল করেন।

এখানে উল্লেখ্য যে আবু বকর (রা.) মৃত্যুর আগে মাত্র দুই বছর তিন মাস খলিফার দায়িত্ব পালন করেন।

ওমর (রা.) মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের দ্বিতীয় খলিফা হয়ে আবু ওবায়দার নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী মুসান্নার সঙ্গে ইরাকে প্রেরণ করেন। আবু ওবায়দা ও মুসান্না সেনাবাহিনীসহ ইউফ্রেটিস অতিক্রম করে হীরা অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকলে পারস্য সেনাবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ রুস্তম দুটি স্বতন্ত্র বাহিনী গঠন করেন। একটি বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন জাবান। তাঁর নেতৃত্বে পারস্য বাহিনী হীরা অভিমুখে অগ্রসর হয়ে নামারক নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে পারস্য বাহিনী পরাজিত হয়। ফলে ‘হীরা’ মুসলমানদের অধীনে থাকে। এরপর কুফার কয়েক মাইল দূরে বুয়ায়েরের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের ফলে পারস্য সাম্রাজ্যের ইরাক অংশের মেসোপটেমিয়ার নিম্নাঞ্চলও টুকরা হয়ে মুসলমানদের অধীনে চলে আসে।

বুয়ায়েরের যুদ্ধের পর পারস্যের তৎকালীন সম্রাট ইয়াজদিজার্দ পারস্য সাম্রাজ্যের ইরাকস্থ যে এলাকা মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের দখলে চলে যায়, তা উদ্ধারের জন্য মহাবীর রুস্তমের তত্ত্বাবধানে এক লাখ ২০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন। খলিফা ওমর (রা.) পারস্যের এ সমর প্রস্তুতির খবর জানতে পেরে সাদকে সেনাপতি নিযুক্ত করে ৩০ হাজার সৈন্যসহ পারস্য অভিমুখে প্রেরণ করেন। সেনাপতি সাদ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে ইরাকের কুফার অদূরে কাদেসিয়া প্রান্তরে পারস্যের বিশাল সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করেন। পারস্য বাহিনী এ যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পারস্য বাহিনীর প্রধান সেনাপতি রুস্তম যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করতে গিয়ে নিহত হন। এ যুদ্ধ পারস্য সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর আট হাজার ৫০০ সৈন্য ও পারস্য বাহিনীর ৩৪ হাজার সৈন্য নিহত হয়।

কাদেসিয়ার যুদ্ধে বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী ব্যাবিলনের দিকে অগ্রসর হয়। ব্যাবিলনের দখল পেতে তাদের তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। খলিফা ওমর (রা.)-এর অনুমতিক্রমে এরপর সেনাপতি সাদ সেনাবাহিনী নিয়ে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েন অভিমুখে যাত্রা করেন। মাদায়েন শব্দের অর্থ দুই শহর। দজলা-ফোরাত নদীর মিলনস্থল থেকে ১৫ মাইল উজানে দজলার উভয় পারের ভূখণ্ডব্যাপী এ নগর অবস্থিত। সেনাপতি সাদ সেনাবাহিনী নিয়ে প্রথমে রাজধানী মাদায়েন নগরীর পশ্চিমাংশের দিকে অগ্রসর হন। পারস্য বাহিনী পথিমধ্যে মুসলিম বাহিনীকে বাধা দিয়ে পরাজিত হয়। মাদায়েন নগরীর পশ্চিমাংশ দখল করার পর সাদ বাহিনীসহ নদী অতিক্রম করে নগরীর পূর্বাংশে চলে আসেন। মুসলিম বাহিনীর আগমনের আগেই পারস্য সম্রাট সদলবলে উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকা হুলওয়ানে চলে যান। ফলে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েন এক প্রকার বিনা বাধায়ই মুসলমানরা ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে জয় করে। মুহাম্মদ (সা.)-এর ‘শিগগিরই পারস্যের রাজধানী ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হবে’ ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হওয়ায় মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে এবং সেই স্থানে শোকরানা নামাজ পড়ে। এ অভিযানে দজলা-ফোরাতের মধ্যবর্তী সমগ্র এলাকায় মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুসলিম বাহিনীর সামরিক অভিযান প্রতিহত করার জন্য পারস্য সম্রাট সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিয়ে এক লাখ ৫০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন। সেনাপতি নোমানের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর ৩০ হাজার সৈন্য ইরাকের হামদানের কাছে নিহাওয়ান্দ নামক স্থানে পারস্যের এ বিশাল বাহিনীকে মোকাবেলা করে। মুসলিম বাহিনীর সৈন্যরা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে পারস্য বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। যুদ্ধক্ষেত্রেই পারস্য বাহিনীর ৩০ হাজার সৈন্য মারা যায়। এরপর পারস্য সম্রাট আত্মরক্ষার জন্য স্থান হতে স্থানান্তরে পলায়ন করতে থাকেন।

কাদেসিয়ার যুদ্ধে যেখানে পারস্য সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল করে দিয়েছিল, নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে সেখানে শেষ আঘাত হানে। এ যুদ্ধের পর মাত্র দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পারস্য সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট এলাকা টুকরা টুকরা হয়ে যায়। যেমন—কিরমান, মাকরান, সিস্তান, খোরাসান, আজারবাইজান প্রভৃতি অঞ্চল একে একে মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। এভাবে মুসলমানদের পারস্য বিজয় সম্পর্কে মুহাম্মদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়।

     লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা