kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

সমন্বয় নেই, ঢিলেঢালা ভাব

► কঠোর হওয়ার আভাস
► সন্ধ্যার পর সব দোকান-বাজার বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সমন্বয় নেই, ঢিলেঢালা ভাব

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা আগের তুলনায় দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষ হিসাবের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৩৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু ঘটেছে তিনজনের। এমন অবনতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও ঢাকাসহ সারা দেশেই ঘরে থাকার নির্দেশনা মেনে চলতে দেখা দিয়েছে ঢিলেঢালা ভাব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে এই নির্দেশনা প্রতিপালন কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে। করোনা মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের কথাতেই উঠে এসেছে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি। তিনি গতকাল এক বৈঠকে বলেন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ছাড়া করোনা মোকাবেলায় আর যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেসব সম্পর্কে তাঁকে কিছুই জানানো হয় না। কবে কারখানা খোলা হবে, কিংবা খোলা রাখা হবে কি না, মসজিদে নামাজ কিভাবে হবে, কখন রাস্তা খুলে দেওয়া হবে বা বন্ধ রাখা হবে—এসব বিষয়ে কমিটির সঙ্গে আলোচনা করা হয় না।

সম্প্রতি সারা দেশে কার্যত লকডাউনের মাঝে গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগ দেখা হয়। এদিকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গাইবান্ধা পূর্ণাঙ্গ লকডাউন থাকবে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী গার্মেন্ট মালিকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা শুধু নিজেদের লাভের দিকটা চিন্তা করেন। তাঁরা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় না করে গার্মেন্ট খোলার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে শ্রমিকদের অনেকে ঢাকায় চলে এসে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়েছে। গতকাল বিকেলে পুলিশের পক্ষ থেকে সন্ধ্যার পর কাঁচাবাজার বা দোকান খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

গত রবিবার সকাল থেকে গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত মৃত তিনজনের মধ্যে একজন হচ্ছেন দুদকের পরিচালক জালাল সাইফুর। তিনি কুয়েত মৈত্রী বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দেশে ৭ মার্চ থেকে প্রায় এক মাসে মোট চার হাজার ১১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১২৩ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা গেছে। যাদের মধ্যে মোট মৃত্যু ঘটেছে ১২ জনের। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৩ জন, বাকি ৭৮ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

রাজধানীর মহাখালীর বিসিপিএস মিলনায়তনে গতকাল বেসরকারি বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের অংশগ্রহণে এক সভায় আগামী ১৫ দিন দেশে করোনাভাইরাস বিস্তারের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে আশঙ্কা তুলে ধরেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি সবার প্রতি আবারও জোরালো আহ্বান জানান, যাতে কেউ অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যায়। জরুরি প্রয়োজনে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরার অনুরোধ জানান তিনি। একপর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘করোনা ব্যবস্থাপনায় জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান আমাকে করা হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু ওই কমিটিতে যেসব সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা আমরা জানি না। কখন ফ্যাক্টরি খোলা হবে কি হবে না, মসজিদে নামাজ হবে কি না সেটা আমরা জানি না, কখন রাস্তা খুলবে বা বন্ধ করবে সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্বাস্থ্য বিষয় বাদে কোনো বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। আমি সাংবাদিকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি। কেবল দেশি নন, বিদেশি সাংবাদিকরাও ফোনে ইন্টারভিউ নেন। টেলিভিশনে যুক্ত হন। কিন্তু আমি তাঁদেরকে সদুত্তর দিতে পারি না। অনেক সময় দোষও দেন। তাঁরা বলেন, আপনি যদি সেই কমিটির হেড হয়ে থাকেন তবে সিদ্ধান্তগুলো আপনি জানেন না কেন? এটাও একটা সমস্যা। আমি সচিব সাহেবকে বলেছি—আমাদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত না নিলেও অন্ততপক্ষে আলোচনা তো করতে পারে। পরামর্শ তো দিতে পারি।’

পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, সারা দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়া ১২৩ জনের মধ্যে ৬৪ জনই ঢাকা মহানগরীর। পরের অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, সেখানে শনাক্তের সংখ্যা ২৩ জন। আর দেশের মোট ১৫ জেলার করোনা রোগী পাওয়া গেছে। অন্য জেলার মধ্যে মাদারীপুরে আক্রান্ত ১১, চট্টগ্রামে দুই, কুমিল্লায় এক, গাইবান্ধায় পাঁচ, চুয়াডাঙ্গায় এক, গাজীপুরে এক, জামালপুর তিন, শরীয়তপুরে এক, কক্সবাজারে এক, নরসিংদীতে এক, মৌলভীবাজারে এক, সিলেটে এক ও রংপুরে এক। ঢাকা মহানগরীর বাইরে ঢাকা জেলাধীন চার উপজেলায় চারজন করোনায় আক্রান্ত।

ব্রিফিংয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, নতুন শনাক্ত হওয়া ৩৫ জনের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ এবং পাঁচজন নারী। তাদের মধ্যে ৪১-৫০ বছরের ১১ জন এবং ২১-৩০ বছরের ছয়জন।

ড. সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, এক সপ্তাহ আগে দুদক পরিচালকের করোনা শনাক্ত করা হয়। তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়। বাকি দুজনকে হাসপাতালে আনার পর মারা যান।

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে রাজধানীর সব দোকান, সুপারশপ ও কাঁচাবাজার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ওষুধের দোকানসহ জরুরি সেবা খাতগুলো চালু থাকবে। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সবাই সহযোগিতা না করলে পুলিশের একার পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’ সারা দেশের জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও সন্ধ্যার পর থেকে ওষুধের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকান বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান জানান, ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সুপারশপ ও বড় বাজারগুলো খোলা রাখা যাবে। পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানগুলো খোলা থাকবে ভোর ৬টা থেকে দুপুরে ২টা পর্যন্ত। ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা যাবে শুধু ওষুধের দোকান। পুলিশ কমিশনার কার্যালয় থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গতকাল ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে সাধারণ নাগরিকদের প্রতি মসজিদসহ কোনো ধরনের ধর্মীয় উপাসনালয়ে না গিয়ে বাসায় থেকে নামাজ ও প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। এ আদেশ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।

বিশ্বজুড়ে মহামারির রূপ নেওয়া অতিসংক্রামক নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে সব কিছু বন্ধ করা হয়েছে। এ সময় থেকে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত, শপিং মল, কলকারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে সব ধরনের যান চলাচল। কিন্তু অনেকটাই ঢিলেঢালাভাবে মানুষ সরকারি নির্দেশনা পালন করছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করলেও অনেক সময়ই নিশ্চুপ থাকে। ফলে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

গত রবিবার রাজধানী ঢাকায় মানুষের ঢোকা ও বের হওয়া বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। গতকাল রাজধানীর সব প্রবেশমুখেই এই ঢোকা ও বের হওয়া বন্ধ করতে ছিল পুলিশের চেকপোস্ট। এসব চেকপোস্ট থেকে গাড়ি রাজধানীতে ঢুকতে বা বের হতে দেওয়া হয়নি।

গতকাল রাজধানীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই প্রধান সড়কে কিছুটা কম হলেও ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি। অলিগলিতে মানুষের চলাচলও ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। দোকানপাটও ছিল খোলা। রাজধানীর অনেক স্থানেই মুদি দোকান ছাড়াও স্টেশনারি, হার্ডওয়্যার, রিকশা-সাইকেল মেরামতের দোকান খোলা ছিল। মানুষকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাচল বা কেনাকাটা করতে দেখা যায়নি। আর প্রধান সড়কের মোড়ে মোড়ে ছিল ত্রাণের জন্য দরিদ্র মানুষের ভিড়।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় কালশীতে পুলিশের চেকপোস্টে দেখা গেল শতাধিক গাড়ির ভিড়। বেশির ভাগ আরোহীরা বলেছে, ব্যাংকে অথবা কাঁচাবাজার করতে যাবে। অনেকেই হাসপাতালে যাওয়া, ওষুধ কেনাসহ নানা কাজের কথা বলে চেকপোস্ট পার হয়ে যায়। রাজধানীর ভাষানটেকে দেখা যায়, স্টেশনারি, ফটোকপির দোকান খোলা রয়েছে। সেখানে অনেকের ভিড়।

মাগুরায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দোকান খোলা রাখায় গতকাল শহরের সাতটি হার্ডওয়্যার ও রড-সিমেন্টের দোকান মালিককে ১৮ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে শহরের ভায়নার মোড়সহ বিভিন্ন সড়কে এ জরিমানা আদায় করা হয়। আবু সুফিয়ান জানান, গত রবিবার থেকে সন্ধ্যা ৬টার পর সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার বন্ধ রেখে শুধু ওষুধের দোকান চালু রাখার নির্দেশনা দিয়ে সরকারি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গোপালগঞ্জে তাঁদের তৎপরতা বাড়িয়েছেন। গতকাল জেলা শহরের নতুনবাজার এলাকায় দুপুরের আগ থেকেই সাপ্তাহিক হাট বসে ও লোকসমাগম হয়। দুপুর সাড়ে ১২টায় হাটটি বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। কাশিয়ানী উপজেলায়ও গতকাল দুটি হাট ভেঙে দেয় উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে ৬৮ জনকে জরিমানা করা হয়।

পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে নির্দেশনা অমান্য করায় ২৪ জনকে ১০ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ রিয়াজ উদ্দিনের নেতৃত্বে উপজেলার পাড়েরহাট বাজার এবং ইন্দুরকানীর বিভিন্ন সড়কে এ আদালত পরিচালিত হয়। নির্দেশ অমান্য করে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা, হাট-বাজারে অহেতুক ঘোরাফেরা করায় এই জরিমানা করা হয়।

(তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা