kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

গুলি করে ফেলে দিই শত্রুপক্ষের দুই যুদ্ধবিমান

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গুলি করে ফেলে দিই শত্রুপক্ষের দুই যুদ্ধবিমান

মুক্তিযোদ্ধা, আবদুল মজিদ

“সমরাস্ত্র কারখানা দখল করব। কম্পানি কমান্ডার মো. হারুন জানতে চাইলেন সম্ভব কি না? আমি দায়িত্ব নিলাম। এটির অবস্থান বাড়ির কাছে, নির্মাণ হতে দেখেছি। সব কিছুই চেনাজানা। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হলো। আমরা ১২ ডিসেম্বর জানতে পারি যে সমরাস্ত্র কারখানা থেকে অনেক সেনা স্থানান্তর করা হয়েছে। কারখানা অনেকটাই ফাঁকা। সোর্সের মাধ্যমে এ খবর পেয়ে আমরা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

আমাদের ১৫-১৬ জনের দলটি ১২ ডিসেম্বর দিবাগত গভীর রাতে সমরাস্ত্র কারখানার পেছনে অবস্থান নিই। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন ১৩ ডিসেম্বর ভোরের দিকে আমি, নিজাম, সামাদ ও আতাউর কারখানার পানি বের হওয়ার সিমেন্টের পাইপ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ি। কাজটি দুঃসাহসিক তো বটেই, কষ্টসাধ্যও।

ফজলুল হকের নেতৃত্বে দলের অপর সদস্যরা বাইরে অপেক্ষা করছে। আমাদের কাজ ছিল ভেতরে ঢুকে গুলি করে গেট খুলে দেওয়া। ওয়াচ টাওয়ারে থাকা সেনাদের চোখ এড়িয়ে আমি ও নিজাম ধানক্ষেত দিয়ে ক্রল করে সকাল ৮টার দিকে ওয়াচ টাওয়ারের কাছে পৌঁছে ঝোপের ভেতর লুকিয়ে পড়ি। এরই মধ্যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে। তখন দুপুর ১টা কি দেড়টা। হঠাৎ দেখি ওয়াচ টাওয়ারের সেনারা চলে গেছে। আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে উঠে দাঁড়াই। অনুসরণ করতে বলি নিজামকে।

হঠাৎ শত্রুদের চারটি ফাইটার বিমান একেবারে নিচ দিয়ে সমরাস্ত্র কারখানার পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে উড়ে যায়। হঠাৎ দেখি বিমানগুলো গোলা ছুড়তে ছুড়তে এদিকে ফিরে আসছে। আমি আর নিজাম দাঁড়িয়ে যাই। হাতে ছিল রাশিয়ার তৈরি মার্ক ফোর মেশিনগান। আনুমানিক ১০০ গজ দূরে থাকতে বিমান লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপে ধরি। একটানে ম্যাগাজিনের সব বুলেট বেরিয়ে যায়। মনে হলো সামনে ও পেছনে থাকা দুটি ফাইটারে গুলি লেগেছে। তার পরই বিকট শব্দ। আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান ফিরলে দেখি একটি গাছের কাণ্ডের সঙ্গে মাটিচাপা অবস্থায় আটকে আছি। নিচে বিশাল গর্ত। আমার এলএমজিটা গাছের ভেতর গেঁথে আছে। পরে সেখান থেকে উদ্ধার করে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শুনেছি দুটি ফাইটার বিমান ধ্বংস হয়েছে। একটি গিয়ে পড়ে সদর উপজেলার সাকাশ্বরে, আরেকটি পিরোজালীতে। গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় নিজামের লাশও পাওয়া যায়নি। হাসপাতালে থেকেই ১৬ ডিসেম্বর জানতে পারি যে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে।”

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করে কথাগুলো বলছিলেন গাজীপুর মহানগরীর ভানুয়া এলাকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল মজিদ (৭০)। অসীম সাহসের কারণে যুদ্ধ চলাকালেই তিনি ‘টাইগার’ খেতাব পেয়েছিলেন। দলনেতা ও সহযোদ্ধারা তাঁকে ডাকতেন টাইগার মজিদ নামে। এলাকার মানুষ আজও তাঁকে টাইগার মজিদ নামেই চেনে।

১৯৭১ সালে আবদুল মজিদ ছিলেন গাজীপুরের রানী বিলাসমনি স্কুলের ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। যুদ্ধ করেছেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও বাঞ্ছারামপুর অঞ্চলে। শেষের দিকে গাজীপুরে। গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছেন বহু যুদ্ধে। সেসবের মধ্যে সমরাস্ত্র কারখানা ও ভাওয়াল গাজীপুর স্টেশনের কাছে ট্রেনসহ রেল সেতু উড়িয়ে দেওয়ার অপারেশন স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

গত শুক্রবার সকালে বাড়িতে গিয়ে কথা হয় অসীম সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। টাইগার মজিদ জানান, ১৯৭১ সালে ঢাকায় সভা-সমাবেশে নিয়মিত উপস্থিত হতেন। ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার পর প্রতিশোধ হিসেবে ২৬ মার্চ বন্ধুরা মিলে তৎকালীন জয়দেবপুর সেনানিবাসে হামলা চালিয়ে ছয়-সাতজনকে হত্যা করেন। পরে চাপুলিয়ার আসমত আলী, আনসার কমান্ডার আবদুল মোতালিব ও ভূরুলিয়ার নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে ভারতের মেঘালয়ের শিববাড়ী ক্যাম্পে চলে যান। উদ্দেশ্য ছিল ট্রেনিং নিয়ে দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার। কিন্তু তখনো ওই ক্যাম্পে ট্রেনিং শুরু না হওয়ায় দেশে ফিরে আসেন।

পরে আতাউর রহমান, আবদুস সামাদ, মোয়াজ্জেম ও তিনিসহ জয়দেবপুরের ২৫ জনের একটি দল ট্রেনিংয়ের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের আগরতলায় যায়। প্রথমে ২১ দিনের ট্রেনিং শেষ হলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় হেজামাড়া হেডকোয়ার্টারে। সেখানে তাদের অ্যান্টি ট্যাংক মাইন এক্সপ্লোসিভ বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়।

টাইগার বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর আমরা গাজীপুরের কালীগঞ্জের জাঙ্গালিয়ায় এসে ক্যাম্প করি। আমাদের ২৫ জনকে পাঠানো হয় সমরাস্ত্র কারখানার সর্বশেষ অবস্থা দেখে আসতে। এলাকায় এসে খবর পাই, রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১১ ডিসেম্বর অস্ত্রভর্তি একটি ট্রেন ঢাকায় যাবে। এটি রুখতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাওয়াল গাজীপুর স্টেশনের দক্ষিণের রেল সেতুর নিচে ডিনামাইট সেট করা হয়। সন্ধ্যায় ট্রেনটি সেতুতে ওঠামাত্র বিস্ফোরণ ঘটালে ইঞ্জিন ছাড়া সব বগি পড়ে যায়। পাকিস্তানি সেনারা কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করে পালিয়ে যেতে শুরু করলে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।’

টাইগার মজিদ জানান, সমরাস্ত্র কারখানা দখল করতে গিয়ে বিমান থেকে ছোড়া গোলায় তাঁর দুই পায়ের হাড় গুঁড়ো হয়ে যায়। স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয় হাত, মাথা ও মুখে। কিছুটা সুস্থ হলে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে গাড়িচালকের চাকরি পান। পায়ের সমস্যার কারণে সেই চাকরি ছেড়ে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় সেখানেও সুবিধা করতে পারেননি। দেশে ফিরে আসেন। চার বছর আগে তাঁর পা বেঁকে যায়। অবশ হয়ে যায় হাতও। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারেন না। হাতেও শক্তি পান না। এখন হুইলচেয়ারেই তাঁর দিন কাটে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা