kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন সুরক্ষার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও খুলনা   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন সুরক্ষার তাগিদ

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে উপকূলীয় জেলাগুলোতে যতটা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল তা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ঢাল হয়ে উপকূলবাসীকে এবারও রক্ষা করেছে সুন্দরবন। এ বিষয়ে একমত গবেষক ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ এনামুর রহমান ও আবহাওয়া অফিসের উপপরিচালক আয়শা খাতুন স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনের কারণে এবারও বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেছে বাংলাদেশ। সিডর-আইলা থেকে যেভাবে বাঁচিয়েছিল এবারও তেমনি উপকূলবাসীকে রক্ষা করেছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বন।

ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল থেকে উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় সুন্দরবন যে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পরিবেশবিদ ড. এ কিউ এম মাহবুব বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘মনে করেন আপনার বাড়ির সামনে একটা দেয়াল আছে। সেটার কারণে বন্যার পানি, দমকা বাতাস আপনার ঘরে ঢুকতে পারবে না। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য সুন্দরবন ঠিক সেই দেয়ালের কাজটাই করে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ এনামুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘যে সুন্দরবন আমাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচিয়েছে, আমাদের সবার উচিত একসঙ্গে সুন্দরবনের জন্য কিছু করা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গতকাল সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সুন্দরবন একটাই। বুলবুলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষায় নিজেদের স্বার্থেই সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। টিআইবি বলেছে, সুন্দরবনের কারণেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের শক্তি অনেকটা কমে গেছে এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম হয়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বন বাঁচাতে এটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ এবং সুন্দরবন ঘিরে যে শিল্পায়নপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

গত শনিবার রাতে বাংলাদেশের সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরা উপজেলায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এরপর এটি সুন্দরবনের খুলনা ও বাগেরহাট অংশের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। পরিবেশবিদ ড. মাহবুব বলেন, তবে প্রবল শক্তির এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সেভাবে পড়তে পারেনি বনের গাছপালায় বাধা পাওয়ার কারণে। ভূখণ্ডে আঘাত হানার সময় এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার, কিন্তু সুন্দরবনের গাছপালার কারণে সেটির প্রভাব ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের মতো অনুভূত হয়। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বনাঞ্চলের ওপর দিয়ে দুই ধরনের ধাক্কা যায়। প্রথমে ক্ষিপ্রগতির বাতাস, এরপর জলোচ্ছ্বাস। সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত কম গতি নিয়ে খুলনা আর বাগেরহাটে লোকালয়ে পৌঁছে।

বনে ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ যেখানে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ছিল, সেটা বন পার হয়ে লোকালয়ে যেতে যেতে শক্তি হারিয়ে দমকা বাতাসে রূপ নেয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, জলোচ্ছ্বাস লোকালয়ে পৌঁছার আগে সুন্দরবনে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় ঢেউয়ের উচ্চতা অনেক কমে যায়। এ কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি বা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তেমন থাকে না।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে ক্ষয়ক্ষতি দেখতে তাঁদের কর্মীরা কাজ করছেন। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে এর বাইরে তাঁদের ১৭টি টহল ফাঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুন্দরবনের ভেতরেও ক্ষতি হয়েছে। তবে কী পরিমাণ তা এখনো বলা সম্ভব হচ্ছে না।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের (বাগেরহাটের সুন্দরবন অংশ) বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয়টি। অনাবাসিক ১৭টি। জেটি নষ্ট হয়েছে ১০টি। পন্টুন ও বাউন্ডারি দেয়াল ধসে পড়েছে ১৯টি। পানিতে ট্রলার ভেসে গেছে তিনটি। তবে বনের ভেতরে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের জন্য কর্মীরা কাজ করছেন বলে জানান তিনি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সুদৃঢ় বর্ম হয়ে এই অঞ্চলকে রক্ষায় সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য। নিশ্ছিদ্র সুরক্ষা বেষ্টনী হয়ে সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল বাংলাদেশের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করে আসছে। বাংলাদেশে আঘাত হানার আগেই প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের শক্তি কমিয়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে দিয়েছে সুন্দরবন। এর আগেও প্রলয়ংকরী সিডর, আইলাসহ বহু মহাদুর্যোগে ক্ষতি ব্যাপকতর হতে দেয়নি প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টি। শুধু দুর্যোগ থেকে রক্ষায় নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবেই নয়, সুন্দরবন এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম রক্ষাকবচ। তাই সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশকেই সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সুন্দরবনের পরিবেশগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন গবেষক কুশল রায়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বুলবুলের ঝাপটায় সুন্দরবনের কিছু ক্ষতি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ক্ষতির পরিমাণ পেতে সময় লাগবে। এমনকি এসংক্রান্ত স্যাটেলাইট ইমেজ পেতেও সময় লাগবে। তবে ক্ষতি গাছপালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। উপড়ে যাওয়া ছাড়া সামান্য ডালপালা ভেঙে যাওয়া গাছগুলো টিকে যাবে। ম্যানগ্রোভের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণেই আঘাতপ্রাপ্ত অনেক গাছ টিকে যাবে।

সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে প্রাণী ও প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার স্বার্থে সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন বিভাগ। গতকাল বিকেলে খুলনা রেঞ্জের বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মাইনুদ্দিন খান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুসন্ধানে বন বিভাগের ৬৩টি দল কাজ করছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা