kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির সুপারিশ আবার যাচাই

আজিজুল পারভেজ   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির সুপারিশ আবার যাচাই

মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আবার শুরু হচ্ছে। প্রায় আড়াই বছর বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাইকালে যাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল, সেই সুপারিশগুলো আবার যাচাই করা হবে। এ জন্য উপজেলা, জেলা, মহানগর পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁদের নাম সুপারিশ করা হয়নি তাঁদের দাখিল করা আপিল আবেদনও যাচাই-বাছাই শুরু হচ্ছে।

জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৪ জন এবং সরাসরি ১০ হাজার ৯০০ জন আবেদন করেছিলেন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা)। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৪৭০টি উপজেলা/জেলা/মহানগর কমিটি গঠন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু করেছিল জামুকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত ৪৭০টি কমিটির মধ্যে ৩৮৫টি তাদের প্রতিবেদন দেয়। ৮৫টি কমিটি কাজ করতে পারেনি সদস্যদের দ্বন্দ্ব এবং কমিটি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায়।

জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে যে যাচাই-বাছাই হয়েছে, তাতে উপজেলা, জেলা কিংবা মহানগর কমিটি তিন ধরনের খসড়া তালিকা তৈরি করে। ‘ক’ তালিকা হচ্ছে যাচাই-বাছাই কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত তালিকা। ‘খ’ হচ্ছে কমিটির দ্বিধাবিভক্ত মতের ভিত্তিতে করা তালিকা। ‘গ’ হচ্ছে কমিটির নামঞ্জুর করা তালিকা।

সূত্র মতে, যাচাই-বাছাই কমিটিগুলোর ‘ক’ তালিকায় মোট ২৬ হাজার ৯৪২ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ যথার্থভাবে সম্পন্ন না হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন জায়গায় কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিও পালন করা হয়। জামুকার কাছে যেসব প্রস্তাব আসে, তা-ও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই তারা সুপারিশগুলো আবার যাচাইয়ের প্রস্তাব করে।

এ বিষয়ে জামুকার পরিচালক মো. সলিমুল্লাহ কালের কণ্ঠকে জানান, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির সব সুপারিশ দুই প্রক্রিয়ায় আবার যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে জামুকার ৬১তম সভায়। যে কমিটি নতুন তালিকাভুক্তির জন্য ওই এলাকার বর্তমান ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার ১০ শতাংশের কম নাম সুপারিশ করেছে, সেই কমিটির সুপারিশ জামুকার সদস্যদের তত্ত্বাবধানে যাচাই করা হবে। আর যে কমিটি বর্তমান ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি নাম সুপারিশ করেছে, সেই কমিটির সুপারিশ ওই এলাকায় ফেরত পাঠিয়ে আবার যাচাই-বাছাই করা হবে।

জামুকা সূত্রে জানা যায়, আবার যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উপজেলা বা জেলা বা মহানগরে তিন সদস্যের কমিটি পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুসারে, সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপি মুক্তিযোদ্ধা হলে তিনিই হবেন কমিটির সভাপতি। এমপি মুক্তিযোদ্ধা না হলে মুক্তিযোদ্ধার ভারতীয় তালিকা ও লাল মুক্তিবার্তায় নাম থাকা একজন যুদ্ধকালীন কমান্ডারকে সভাপতি করা হবে জেলা প্রশাসকের সুপারিশে। মুক্তিযোদ্ধার ভারতীয় তালিকা ও লাল মুক্তিবার্তায় নাম থাকা একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাকে জেলা প্রশাসকের সুপারিশে সদস্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিংবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

সূত্র মতে, উপজেলা বা জেলা বা মহানগর কমিটির ‘ক’ তালিকাভুক্ত সুপারিশ আবার যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নির্দেশিকা করা হয়েছে। অনুসরণীয় ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘পুনঃ যাচাই-বাছাই কার্যক্রম উপজেলার হলরুমে সকাল ৯টা-১০টার মধ্যে সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে শুরু করতে হবে। পুনঃ যাচাই-বাছাইকালে উপজেলার লাল মুক্তিবার্তা, মুক্তিযোদ্ধার ভারতীয় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত আছে এমন মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন। ইউএনও/এডিসি পুনঃ যাচাই-বাছাইয়ের নির্ধারিত তারিখ সাত দিন আগেই সবাইকে জানিয়ে দেবেন। সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের সেদিন উপস্থিত থাকতে হবে।’

সম্প্রতি এই নির্দেশিকাসহ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশসংবলিত নথি ফেরত পাঠানো হয়েছে উপজেলা বা জেলা বা মহানগরের পুনর্গঠিত কমিটির কাছে। অক্টোবরের মধ্যে এই কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আবার যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে—এমন খবরে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জামুকায় আগত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, এটা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার জন্য অবমাননাকর। কারণ কেউ মুক্তিযোদ্ধা কি না, সেটা তথ্য-প্রমাণের ব্যাপার। বর্তমানে কতজন আছেন, তা দিয়ে নতুন কতজনকে দেওয়া হবে, সেটা নির্ধারণ করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, আবার যাচাই-বাছাই মানে আবার শুরু হবে কেনাবেচা। আগেরবার যাঁরা কমিটিকে ‘ম্যানেজ’ করতে পেরেছেন তাঁরা সফল হয়েছেন। এবারও যে এমনটা হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়, সেই প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ।

মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়াকে ভ্রান্ত আখ্যায়িত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মুর্শেদ খান (বীর বিক্রম)। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, পাঁচ বছরের বেশি সময় লাগিয়ে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করে মুক্তিযোদ্ধার একটি তালিকা তৈরি করতে না পারা একটি চূড়ান্ত অদক্ষতা। এখন জোড়াতালি দেওয়ার জন্য আবার যাচাই-বাছাইয়ের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার জন্য আরো বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। কারণ কাউকে বাদ দিলে তিনি আবার আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।

বিভিন্ন কমিটি তালিকাভুক্তির জন্য যাদের নাম সুপারিশ করেছে তাদের পুনঃ যাচাইয়ের মাধ্যমে বাদ দেওয়া সম্ভব হবে কি না জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গত বৃহস্পতিবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, যে সব কমিটি নিয়ম না মেনে তালিকাভুক্তির প্রস্তাব করেছে, যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাদের বাদ দেওয়ায় কোন সমস্যা হবে না। সব যাচাইবাছাই শেষে আগামী ডিসেম্বর মাসেই  মুক্তিযোদ্ধার সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে যাচাই-বাছাইকালে যাঁদের ‘খ’ ও ‘গ’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাঁদের খসড়া তালিকা প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সে অনুসারে ৩৫ হাজার ২৮০টি আবেদন জমা পড়েছে জামুকায়। ওই সব আপিল আবেদন নিষ্পত্তিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত জামুকার ৬৪তম সভায় আপিল নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আট বিভাগের জন্য আটটি কমিটি করা হয়েছে। তিন সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে জামুকার একজন সদস্যকে। কমিটির আহ্বায়করা হলেন ঢাকা বিভাগে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, চট্টগ্রাম বিভাগে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, বরিশালে সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সিলেটে সাবেক চিফ হুইপ আব্দুস শহীদ, রংপুরে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, রাজশাহীতে শহীদুজ্জামান সরকার, খুলনায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব রশিদুল আলম এবং ময়মনসিংহে মুক্তিযোদ্ধা ওয়াকার হাসান বীরপ্রতীক।

দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে সদস্য করা হয়েছে, যাঁরা ‘যুদ্ধকালীন কমান্ডার/ভারতীয় তালিকাভুক্ত/লাল মুক্তিবার্তাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’। কমিটির আহ্বায়কই ওই দুই সদস্যকে মনোনয়ন দেবেন। অক্টোবর মাসেই এই আপিল শুনানি শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায়ই এই শুনানি হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করা হয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রায় ৪৫ হাজার ‘অমুক্তিযোদ্ধাকে’ মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাঁদের বাদ দেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়। মূলত সে লক্ষ্যেই সর্বশেষ যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু এখন কাউকে বাদ দেওয়া তো যাচ্ছেই না, বরং মুক্তিযোদ্ধার তালিকা আরো দীর্ঘ হচ্ছে। বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা দুই লাখের বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা