kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

স্কুল নেই! শিশুরা কী করবে

শিশুরা স্কুলে নেই দুই বছর হতে চলল। কবে স্কুল খুলবে, তাও জানা নেই। এতে তাদের মনোজগতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। উত্তরণে করণীয় কী—শিক্ষক ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আতিফ আতাউর

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্কুল নেই! শিশুরা কী করবে

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

যে শিশুদের প্রতিদিনের সকাল শুরু হতো স্কুলের ব্যস্ততা দিয়ে, তারা আজ স্কুল ছাড়া প্রায় দুই বছর। যে শিশুদের দিনের বড় একটা সময় কাটত স্কুল, কোচিং, পাঠ প্রস্তুতি ও খেলাধুলায়, আজ তাদের অখণ্ড অবসর। সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই, স্কুলের পড়া তৈরির তাগিদ নেই। শুধু বসে থাকা আর স্কুল খোলার অপেক্ষায় দিন গোনা। অপেক্ষা করোনা শেষ হওয়ার।
কভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও চলছে জোড়াতালির পড়াশোনা। অনলাইনে ক্লাস, আসাইনমেন্ট ও পরীক্ষা নিয়ে দেওয়া হচ্ছে রেজাল্ট। অটো পাসের [পরীক্ষা ছাড়া পাস] মতো অভিজ্ঞতাও হয়ে গেছে তাদের। মাঝখানে করোনা সংক্রমণ কমার পর স্কুল খোলার অপেক্ষায় দিন গুনছিল তারা। মরণঘাতী ভাইরাসটির দ্বিতীয় ঢেউয়ে সে আশার গুড়েও বালি। এমন অবস্থায় সবচেয়ে সংকটে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। শিশুরা সারা দিন ঘরে বসে থাকার দরুন নানা ধরনের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন জানান, শিশুরা সারা দিন বসে থাকলে তাদের মধ্যে অবসাদ চলে আসে। তৈরি হয় মোটা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। অশান্ত আচরণ দেখা দিতে পারে তাদের মধ্যে। তৈরি হতে পারে কথা না শোনার প্রবণতা। জেদি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার শিশুর কোনো কথায় ভ্রুক্ষেপ না করলে তৈরি হতে পারে চুপ করে থাকার প্রবণতাও। এ জন্য শিশুদের কর্মচঞ্চল রাখতে হবে। তারা যাতে ব্যস্ত সময় কাটাতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে অভিভাবকদের।
ঘরবন্দি সময়ে শিশুদের জন্য কোয়ালিটি টাইম কাটানোর কিছু পরামর্শ দিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ।

দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক রুটিন করে দিন
শিশুর জন্য দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক তিন ক্যাটাগরির রুটিন করে দিন। শিশুকে সঙ্গে নিয়ে রঙিন কাগজ ও কলম দিয়ে বড় করে কাজগুলোর তালিকা এবং সম্পাদনের সময়সূচি তৈরি করুন। শিশুর ঘরের দেয়ালে টানিয়ে দিন। প্রতিদিন ঘুমানো, ঘুম থেকে ওঠা, অনলাইন ক্লাসের সময়সূচি, গোসল, খেলাধুলা, টিভি দেখাসহ যাবতীয় কাজের সময় নির্ধারণ করে দিন। রুটিন মেনে চলতে শিশুকে উত্সাহিত করুন।

পুরস্কৃত করুন শিশুকে
হোক সে শিশু কিংবা বড় কেউ—কাজের স্বীকৃতি পেতে সবাই ভালোবাসে। শিশু রুটিন মেনে কোনো কাজ শেষ করতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করুন। যেমন সপ্তাহের ছয় দিন একই সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার কাজটি করতে পারলে চকোলেট, খেলনা বা প্রিয় কোনো আইসক্রিম উপহার দিন। অনলাইনের অ্যাসাইনমেন্টগুলোতে ভলো করলেও উপহার দিতে পারেন। মোট কথা, শিশুর যেকোনো ভালো অর্জনেই তাকে পুরস্কৃত ও উত্সাহিত করুন।

ছবি আঁকা, গান ও কবিতা শিখতে বলুন
অখণ্ড সময় কাটাতে সন্তানকে প্রিয় জিনিসের ছবি আঁকতে দিন। শিশুরা সাধারণত ছবি আঁকতে খুবই পছন্দ করে। যেটাই আকুক না কেন তাকে বাহবা দিন। সন্তানের আঁকা ছবি ফেসবুকে শেয়ার দিন। বন্ধুদের থেকে পাওয়া মন্তব্যগুলো তাকে পড়ে শোনান। খুশি হবে। পাশাপাশি গান ও কবিতা মুখস্থ করতে উত্সাহ দিন। সপ্তাহে দুটি গান, দুটি কবিতা মুখস্থ করতে দিন। শেখা শেষে শিশুর কাছে শুনতে চান। ভুল হলে বকা না দিয়ে শুধরে দিন।

বাসার ছোট ছোট কাজের দায়িত্ব দিন
শিশুরাও কিন্তু দায়িত্ব নিতে পছন্দ করে। বিশেষ করে ছোট কোনো কাজ পেলে তারা নিজেদের বড় ভাবতে ভালোবাসে। ওদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করতে সাহায্য করুন। বাড়ির পোষা প্রাণী বা পাখিকে খাবার খাওয়ানো, বাগানের বিশেষ কয়েকটি গাছের যত্ন নেওয়া, নিজের থালা নিজে ধোয়া, নিজের কাপড় নিজে গুছিয়ে রাখার কাজ শিশুদের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারেন।

শখ গড়ে তুলতে সাহায্য করুন
শিশুর মধ্যে সৃজনশীল শখ গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। নৃত্য, সাঁতার কাটা, বই পড়া, সিনেমা বানানো, ঘুড়ি ওড়ানো, পোষা প্রাণী পালন, বাগান করা, ছবি আঁকা, ছবি তোলার মতো শখগুলো থেকে পছন্দের শখ বেছে নিতে বলুন। জোর করবেন না। শিশু নিজের ইচ্ছায় যেগুলো করতে পছন্দ করে সেগুলোকে প্রাধান্য দিন। শখ পূরণে শিশুকে সাহায্য করুন। শিশুর মধ্যে ভিন্ন একটি সৃজনশীল জগত্ গড়ে উঠবে।

শিশুকে নিয়ে সময় কাটান
মনে রাখুন, এখন সময় ভিন্ন। শিশুদের স্কুলের সময়টাও কাটাতে হচ্ছে বাড়িতে। নেই কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ। পরিবর্তিত এই সময়ে শিশুর সঙ্গে করোনা নিয়ে নেতিবাচক আলাপ না করাই ভালো। বরং করোনার দরকারি বিষয়গুলো নিয়েই শুধু শিশুর সঙ্গে গল্প করুন। অবসর সময়ের যতটা পারেন শিশুর সঙ্গে কাটান। তার ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করুন। কিছু দরকার কি না জানতে চান। শিশুকে চমকে দেওয়ার জন্য হঠাত্ ওর প্রিয় খাবার রান্না করতে পারেন।

শিশুতোষ আর্টিকেল পড়ুন
ভালো বাবা-মা হতে চাইলে শিশুতোষ ওয়েবসাইট, পত্রিকায় ছাপা হওয়া শিশুদের জন্য উপকারী ফিচারগুলোতে চোখ রাখতে পারেন। শিশুতোষ আর্টিকল থেকেও এই সময় শিশুর জন্য করণীয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। ইউনেসকো তাদের ফেসবুক পেজে এই সময়ে শিশুদের সুস্থ থাকা এবং তাদের সঙ্গে অভিভাবকদের করণীয় কী সে সম্পর্কে প্রতিনিয়ত আপডেট দিচ্ছে। এগুলোও অনুসরণ করতে পারেন ।

মনে রাখুন, শিশুর ভালো-মন্দের পুরো দায়দায়িত্ব কিন্তু মা-বাবার। সচেতন মা-বাবা হিসেবে শিশুকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আপনাদের। এ জন্য করোনার এই মহামারি সময়ে সচেতন থাকুন। নিজেরাও নিয়মিত মেডিটেশন, এক্সারসাইজসহ ভালো থাকার চেষ্টা করুন। কেননা মা-বাবার ছবিই কিন্তু প্রতিফলিত হয় সন্তানদের মধ্যে। সুতরাং শিশুকে ভালো রাখতে নিজেদের ভালো থাকাকেও গুরুত্ব দিন।

 

 



সাতদিনের সেরা