kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ভারতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে পি কের ফেরতের সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ মে, ২০২২ ০৩:৪৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভারতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে পি কের ফেরতের সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের মামলার প্রধান আসামি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে ভারত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, বাংলাদেশি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পি কে হালদারকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ইডি)।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের অপরাধীদের মোকাবেলার জন্য পারস্পরিক আইনি সহায়তাসহ নানা ধরনের কাঠামো রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সরকার ভারতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তথ্য দিয়েছে। ভারতীয় সংস্থা ওই তথ্য যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং অপরাধীদের দমনের জন্য সহযোগিতা রয়েছে।

পি কে হালদারকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ অনুরোধ করেছে কি না জানতে চাইলে হাইকমিশনার বলেন, ‘দেখুন, এটি একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। আমাদের কাছে যা তথ্য আছে, তার ভিত্তিতে একটা সময় বাংলাদেশকে জানানো হবে। ’ তিনি বলেন, ‘বুঝতে হবে এটি কিন্তু বড়দিনের কার্ড বিনিময় নয়। আমি মনে করি, এ ধরনের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, সেটি আস্তে আস্তে হতে দিন। এ নিয়ে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছি। ’

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘এটি সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে ভিন্ন। ভারতের আইনের আলোকে তারা প্রথমে প্রক্রিয়াটি শেষ করবে। এর পরে আমাদের যে অনুরোধগুলো আছে, সেগুলো বিবেচনায় নেবে। ’

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘তাঁকে ফেরত না দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

এখানে বন্দি বিনিময় হবে কি না বা পি কে হালদার বন্দি অবস্থায় আছেন কি না—এগুলো আইনি প্রশ্ন। এগুলোর উত্তর দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু আমি মনে করি, তারা তাদের প্রক্রিয়া শেষ করে তাঁকে ফেরত দেবে। ’

ভারতীয় হাইকমিশনারকে নির্দিষ্টভাবে কী অনুরোধ করা হয়েছে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমরা সহযোগিতা চেয়েছি। তাঁকে দেশে ফেরত আনা প্রয়োজন, সেটাই আমরা তাদের বলেছি। তারা বলেছে, তাদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে তারা আমাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে। ’

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘ভারতে যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে, সেটির বিচারকাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু পি কে হালদারের বিষয়টি অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে সব সময় যে আইনি কাঠামোর প্রয়োজন হয়, বিষয়টি সে রকম নয়। এর আগে আমরা দেখেছি, এ রকমভাবে তাদের আমরা বিভিন্ন সহযোগিতা করেছি। তারাও আমাদের সহযোগিতা করেছে। ’

আবার ১০ দিনের রিমান্ড

পি কে হালদারকে কলকাতার নগর দায়রা আদালত দ্বিতীয় দফায় সে দেশের করা অর্থপাচার মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) তাঁর ১৪ দিন রিমান্ড আবেদন করেছিল। এর আগে পি কে হালদারকে আদালতের নির্দেশে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় ইডি।

ইডির কর্মকর্তারা বলেছেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অর্থপাচারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনো রাজনীতিক জড়িত আছেন কি না, সে বিষয়ে পি কে হালদার এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য দেননি।

ভারতে অঢেল সম্পদ

গতকাল মামলার অগ্রগতির বিষয়ে আদালতকে অবগত করেছেন ইডির আইনজীবীরা। তাঁরা আদালতকে বলেছেন, পি কে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদে ভারতে তাঁর ১৫০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পি কে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থপাচারের মাধ্যমে ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি।

ইডি বলছে, তারা এরই মধ্যে পি কে হালদারের কাছ থেকে বেশ কিছু নথি উদ্ধার করেছে। এসব নথিতে প্রাথমিকভাবে ভারতে তাঁর ২০ থেকে ২৫টির মতো বাড়ির মালিকানার তথ্য মিলেছে।

এদিকে হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা বলছে, পি কে হালদারসহ বাংলাদেশি নাগরিকরা প্রতারণার মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে ব্যাবসায়িক কম্পানি চালু করেন। কম্পানি পরিচালনার পাশাপাশি কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন তাঁরা।

ভারতীয় সংস্থার করা তদন্ত প্রতিবেদন চাইবে দুদক

পি কে হালদারকে নিয়ে যে তদন্ত হচ্ছে, সেই তদন্ত সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ জানাবে। দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘ভারতের তদন্তে যেসব তথ্য পাওয়া যাবে, সেই তথ্য দেওয়ার জন্য দুদক অনুরোধ করবে। ভারতে তাঁর যে সম্পদ আছে, সেটা তো আমাদের জানা ছিল না। এখন প্রকাশ হচ্ছে। ওই তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করব আমরা। ’

পি কে সিন্ডিকেট সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের হিসাব বিবরণী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাখিল না করার অভিযোগে আনান কেমিক্যালের পরিচালক এবং আরবি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রতন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। গতকাল দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি তাঁর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পাঁচ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ২৬৪ টাকার সম্পদ অর্জন করেন এবং উক্ত অবৈধ সম্পদ নিজ ভোগদখলে রেখে দুদক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেন।

মামলাগুলোর হালনাগাদ তথ্য চেয়েছেন হাইকোর্ট

পি কে হালদারকে দেশে ফেরাতে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা রুলের শুনানির তারিখ ঠিক করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ১২ জুন শুনানির তারিখ রেখেছেন। এ সময়ের মধ্যে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে করা মামলার হালনাগাদ তথ্য জানাতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

ভারতে পি কে হালদারের গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, পি কে হালদারের গ্রেপ্তারের বিষয়টি ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।



সাতদিনের সেরা