kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

বিশ্ব বাবা দিবস আজ

সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বাবার পরীক্ষা

তৈমুর ফারুক তুষার   

২০ জুন, ২০২১ ০৩:৩১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বাবার পরীক্ষা

বাবা শফিকুল ইসলাম তাঁর শিশুকন্যা শিমুকে বাইসাইকেলের সামনে দাঁড় করিয়ে এভাবেই বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়।

বাবা। শক্তিধর ছোট্ট শব্দটির বাঁকে বাঁকে বিশাল আবেদন, বিরামহীন ভালোবাসা। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার মিশেল। সন্তানকে দুনিয়ার আলো দেখানো কিংবা তার ভরণ-পোষণের ব্যয় মেটানোর মধ্যে একজন বাবার দায়িত্বের সীমানায় দাঁড়ি টানা যায় না। একজন বাবাকে দিতে হয় হাসি-বেদনার বহু পরীক্ষা। পাড়ি দিতে হয় ত্যাগ, কর্তব্য পালনের বন্ধুর পথ। একদিকে যত্ন, ভালোবাসা ও পরম মমতায় আগলে রেখে সন্তানকে বড় করতে হয়; মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সন্তানের পেছনে দিতে হয় প্রচুর সময়। অন্যদিকে কঠোরতা, অসীম ধৈর্য দিয়ে সন্তানকে খারাপ পথ থেকে ফেরাতে হয়। দীর্ঘ পথের চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে, কঠিন পরীক্ষা জয়ের নিশান উড়িয়ে হয়ে উঠতে হয় বাবা।

দেশের খ্যাতিমান শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী, মনোরোগবিশারদ, সমাজবিদদের মতে, মানবিক মানুষ, আনন্দময় পরিবার ও সমাজ গঠনে বাবাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে, আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবারা রাখতে পারেন অনুকরণীয় ভূমিকা। একজন সন্তান তার বাবাকে অনুকরণ করেই বেড়ে ওঠে। ফলে সন্তানের সামনে নিজেকে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি বাবার জন্যই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার অনেক দায়িত্ব। বিশেষ করে সন্তানদের প্রতি ও তাদের মায়ের প্রতি। মায়ের যদি অযত্ন-অবহেলা হয়, মায়েদের প্রতি যদি অতিরিক্ত আধিপত্য বিস্তার করা হয়, সেটা কিন্তু সন্তানদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। ফলে বাবাকে দেখতে হবে যেন সন্তানদের মা তাদের কাছে সম্মানের, শ্রদ্ধার পাত্র হয়। ফলে বাবাদের কর্তব্য হয় দ্বিমুখী। একটি সন্তানদের প্রতি, আরেকটি তাদের মায়ের প্রতি। দুটিই পালন করা খুব সহজ নয়। সে জন্য দরকার হলো একটি গণতান্ত্রিক পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা; যেখানে ছেলে-মেয়েরা সবাই কথা বলতে পারবে, মত প্রকাশ করতে পারবে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ বা একনায়কতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন। সহনশীলতা, অন্যের সমস্যা দেখা—এ ধরনের পারিবারিক পরিবেশ থাকলে এটা সমাজের মধ্যে ছড়াবে। এগুলো নিশ্চিত করেই একজনকে বাবা হয়ে উঠতে হয়।’

প্রবীণ এই শিক্ষক বলেন, ‘পরিবার খুব ছোট হয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা চাচা ফুপু খালাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সমাজে যেমন বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, পরিবারেও বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে মানবিক গুণাবলির চর্চা করতে হবে। পরিবারে একটি সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করতে পারলে, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নানা বিষয়ের চর্চা করতে পারলে সন্তানরা কিন্তু সামাজিক হয়ে বেড়ে উঠবে। এটা অত্যন্ত জরুরি। মানুষের মননশীলতা কিন্তু সামাজিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠে। ফলে পরিবারে একটা আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করা প্রত্যেক বাবার কর্তব্য।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘অন্য প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের কিছু মিল যেমন আছে, তেমনি অনেক ফারাকও আছে। মানুষ চিন্তা করতে পারে, ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে। মানুষ সুদীর্ঘকাল ধরে পরিবার নিয়ে বাস করে আসছে। এই পরিবার উঠে যাবে বলে মনে হয় না। কয়েক দশক ধরে পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। পরিবারসংক্রান্ত তেমন আলোচনা লেখালেখিও দেখা যায় না। আমি মনে করি, মানুষের সভ্যতার একটা বড় অবলম্বন পরিবার। আর এই পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ হলেন মা-বাবা। তাঁদের গুরুত্ব অস্বীকার করে যদি কোনো পরিবার চলতে চায়, তাহলে সেই পরিবার উচ্ছৃঙ্খলার মুখে পড়ে। পরিবার রক্ষা করা উচিত, পরিবার সম্পর্কে এখন যে ঢিলেঢালা মনোভাব আছে সেগুলো পরিবর্তন হওয়া দরকার। পরিবার যে দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, এই অবস্থায় আমাদের জাতি আর দুই-তিন পুরুষ গেলে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়বে। ফলে বাবাদের এসব নিয়ে সচেষ্ট হতে হবে।’

বাবাদের করণীয় প্রসঙ্গে আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘যারা সৃষ্টিশীল মানুষ আছে। তাদের জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। কী করলে ভালো হবে, কী করলে খারাপ হবে—এসব বিষয় নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সৃষ্টিশীল মানুষেরা যদি শুভচিন্তার কথা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন, তাহলে তারা খারাপের দিকে না গিয়ে কল্যাণের দিকে ধাবিত হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য আখতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সমাজ বাস্তবতায় বাবাদের ভূমিকা সর্বব্যাপী। কারণ এখানে সমাজ দায়িত্ব নেয় না, রাষ্ট্রেরও তেমন ভূমিকা নেই। ফলে পরিবারপ্রধান হিসেবে সব দায়িত্ব বাবাকেই নিতে হয়। সন্তানকে বড় করা, যথাযোগ্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা, পরবর্তীকালে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বাবাকেই করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘পরিবার থেকেই বাচ্চারা মূল্যবোধ পেয়ে থাকে। মা-বাবার দায়িত্ব থাকে সন্তানকে যথাযোগ্য মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সততা, নিষ্ঠা, মানুষকে ভালোবাসা, দায়িত্ব-কর্তব্য—এসব গুণ পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে। সন্তানরা বাবাকে দেখেই জীবনকে গড়ার চেষ্টা করে। সন্তানের সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা একজন বাবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক মূল্যবোধ, সততা, নিষ্ঠাসহ নানা মানবীয় গুণ বাবাকে দেখে সন্তানরা শেখে। বাবাকে একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন বাবাকে তার সন্তানদের সুস্থ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তার ভালো ও খারাপ আচরণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ভালো আচরণ ধরে রাখা ও বাড়ানোর জন্য যা যা করণীয়, সেগুলো করতে হবে। ভালো কাজগুলোকে বাহবা দিতে হবে। আবার খারাপ আচরণ কমানোর জন্যও চেষ্টা করতে হবে। তাকে বোঝানো, নিরুৎসাহ করা, শাস্তি দেওয়া ইত্যাদির মধ্য দিয়ে খারাপ আচরণ কমাতে হবে। নৈতিক কোনো শিক্ষার দরকার থাকলে সেটা ধর্মীয় কিংবা মানবিক হোক, তা দিতে হবে।’



সাতদিনের সেরা