<p>দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু কষ্টে ফলানো ধান ঘরে তুলতে না তুলতেই কৃষকের মুখের হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে। বাজারে গিয়ে তারা দেখছেন, ধান উৎপাদনে তাদের যে খরচ হয়েছে, বিক্রি করতে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম দামে। সরকার নির্ধারিত মূল্যও তারা পাচ্ছেন না। দৈনিক সমকাল এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।</p> <p>প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বেশি দরে সার কিনে, বাড়তি খরচে সেচ ঠিক রেখে, ধার করে টাকা নিয়ে ফসল ফলিয়েছিলেন কৃষক। কাটার পর যথাযথ দাম না পেয়ে তারা হতাশ। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ হাওরাঞ্চলে ইতোমধ্যে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষেত থেকে সরাসরি বিক্রি করলে প্রতি মণ ধানের দাম পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা। কিছুটা শুকনো ধান বিক্রি করলে মিলছে ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা। </p> <p>কৃষি মন্ত্রণালয়  গত বছর (২০২৫ সাল) এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ হিসাব করেছিল ৩২ টাকা ৯৬ পয়সা। তাতে এক মণ (৪০ কেজি হিসাবে) ধানের খরচ দাঁড়ায় এক হাজার ৩১৮ টাকা। এবারও তারা খাদ্য মন্ত্রণালয়কে ধানের উৎপাদন খরচের একই রকম হিসাব দিয়েছে। সে অনুযায়ী সরকার চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য প্রতি কেজি ৩৬ টাকা নির্ধারণ করে। যদিও সার ও সেচে কৃষককে এ মৌসুমে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে। তবে কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যেও ধান বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বড় লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষক।</p> <p>খরচ বেশি, দামে ধস</p> <p>সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, সেচ খরচ, সার-বীজ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে অনুপাতে সরকারি সংগ্রহ মূল্য বাড়েনি। ফলে লোকসানের আশঙ্কায় প্রান্তিক কৃষক উদ্বিগ্ন।</p> <p>কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার মজলিশপুর গ্রামের কৃষক নবী হোসেন বলেন, ‘এবারের মৌসুমে উৎপাদন খরচ ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে। বর্গা চাষ করলে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৭ টাকার বেশি। অথচ সরকার ধান কিনতে চাচ্ছে ৩৬ টাকা দরে। এ দরে ধান বিক্রি করলে আমাদের লোকসান হবেই।’</p> <p>এমন উদ্বেগ শুধু নবী হোসেনের নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে একই শঙ্কা। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে সেচ, যান্ত্রিক চাষাবাদ এবং ধান কাটা-মাড়াইয়ের ওপর। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সেচযন্ত্র চালাতে ডিজেল ও বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি সার, কীটনাশক ও বীজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি। সব মিলিয়ে ধান উৎপাদন ব্যয় গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।</p> <p>গাইবান্ধা সদর উপজেলার কৃষক আবদুর রহমান বলেন, গত বছর এক বিঘা জমিতে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এবার সে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ, প্রতি বিঘায় বাড়তি খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা।</p> <p>কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কৃষক জুলহাস মিয়া বলেন, এক মণ ধানের দামে এখন একজন শ্রমিকের এক দিনের মজুরিও ওঠে না। ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে এক হাজার ৩০০ টাকার বেশি। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, খরচই ঠিকমতো উঠছে না।</p> <p>হাওরাঞ্চলেও একই চিত্র। সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্য সংকট। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে প্রায় ৩০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ধান কাটা ও পরিবহনে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার খরচও হচ্ছে কয়েক গুণ।</p> <p>কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে কৃষি খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। আগে যেখানে বছরে ডিজেলে খরচ হতো ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ছয় কোটি টাকায়।</p> <p>ঋণের চাপে তাৎক্ষণিক বিক্রি</p> <p>সমকালের তথ্য মতে, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বড় একটি অংশ ঋণনির্ভর। মৌসুমের শুরুতে তারা ধার করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ খরচ জোগান। ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঋণ শোধের চাপ আসে। ফলে বাজারদর কম হলেও অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। ধান কাটার দিনই অনেক কৃষক তা বিক্রি করে দেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, দিরাই, অষ্টগ্রাম, খালিয়াজুরি– প্রায় সব এলাকাতে একই চিত্র।</p> <p>অনেক কৃষক জানাচ্ছেন, তারা জানেন, দাম কম, তবু বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ হাতে নগদ টাকা না থাকলে পরবর্তী মৌসুম চালানো সম্ভব নয়। এই বাধ্য বিক্রিই বাজারে দামের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে।</p> <p>হাওরাঞ্চলের ধান বাণিজ্যের অন্যতম বড় কেন্দ্র ভৈরব। এই মোকাম দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ধানের বাজারদরের ওপরও প্রভাব ফেলে। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন ধান আসার পর দামের বড় পতন হয়েছে। প্রতি মণ নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায়। যেখানে মাত্র এক মাস আগেও পুরোনো ধান বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায়। </p> <p>সুনামগঞ্জের শাল্লার বড় কৃষক ছাত্তার মিয়া বলেন, ‘সরকার ধানের মূল্য ১৪৪০ টাকা মণ নির্ধারণ করলেও কৃষকরা ৬৮৫ থেকে থেকে ৭০০ টাকা দরে এখনও ধান বিক্রি করছে। সরকার তো ধান কেনে একেবারে কম। ধান কম কিনে; চাল কিনে বেশি। চাল কিনলে কৃষকের কোনো লাভ হয় না। এতে ফড়িয়া বা মিলারের লাভ। আগের সরকারের সময়ও আমরা বারবার বলেছি; সরকার গুরুত্ব দেয় না। খাদ্য বিভাগের লোকজনের ফায়দা হয় চাল কিনলে। কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে কর্তাদের খুব একটা লাভ হয় না। মিলারদের কাছ থেকে শত শত টন চাল কিনলে মিলালেরও লাভ। খাদ্য বিভাগের কর্তাদের পকেটও ভারী হয়। এ জন্য সরকারকে তারা সেভাবেই বোঝায়।’</p> <p>নেত্রকোণার খালিয়াজুরি উপজেলার হাওরের কৃষক দীপ্র চৌধুরী বলেন, ক্ষেত থেকেই প্রতিমণ ৭০০ টাকায় ধান বিক্রি করেছি। স্বাভাবিক সময়ে এটি ৮০০ টাকার বেশি থাকে। কিন্তু এবার দাম কম। জমিতে পানি উঠে গেছে, টানা বৃষ্টি হয়েছে। ডিজেলের খরচও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন কমবে, খরচ বাড়বে। এই দামে ধান বিক্রি করলে কৃষকদের বড় ধরনের লোকসান হবে।</p> <p>পুরোনো ধানের প্রভাব</p> <p>কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আমন মৌসুমে ১ কোটি ৮১ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরেও ১১ লাখ ১৯ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে।</p> <p>বাংলাদেশ অটো রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও মালিক দেওয়ান মো. তানবীর বলেন, ঈদের পর থেকে ধানের দাম কমছে। মিলগুলোতে এখনও আমন ধানের মজুত রয়েছে। কৃষকদের কাছেও পুরোনো ধান আছে। কয়েক মৌসুম ধরে ভালো উৎপাদন এবং বেশি আমদানির কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে।</p> <p>তিনি আরো বলেন, বর্তমান দামে চাল বিক্রি করলে লোকসান হওয়ায় মিলগুলো ধান কিনতে আগ্রহী নয়। ফলে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।</p> <p>নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রণচণ্ডী ইউনিয়নের কৃষক তোফায়েল আহমেদ স্বপন বলেন, ঈদের পর গত এক মাসে প্রতিমণ ধানে প্রায় ২০০ টাকা কমেছে। মিলগুলো এখন ধান কিনছে না। কৃষকদের কাছে আমনের অনেক ধান পড়ে আছে। বোরোতে প্রায় ৪৫০ মণ ধান উঠবে। তখন আমন ধান বিক্রি করা আরও কঠিন হবে। গত বছর এ সময় প্রতিমণে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি ছিল।</p> <p>বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ধান ও চাল কেনে দুটি কারণে। একটি সরকারের প্রয়োজনীয় মজুত তৈরি, অন্যটি হচ্ছে কৃষক যাতে দাম পায়। কিন্তু এই কেনাকাটার সময় নির্ধারণের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে প্রতিবছর কৃষক ঠকে যান। ফলে সরকারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বেশির ভাগ সময়ই সফল হয় না। একদিকে বাজারে কৃষক ঠকছেন, অন্যদিকে কঠিন শর্তের বেড়াজালে সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও সরকারিভাবে খাদ্যশস্য ধান ও গম কেনা হয়। এই শস্যগুলোর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করা হয় ফসল কাটার আগেই। যেখানে ফসল তোলার আগেই বাজারে মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকের দরকষাকষির একটা সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো।</p> <p>প্রতিবছর বড় একটা অংশ ধান কাটার পর গিয়ে সরকার কেনাকাটার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার আরও ১৫ থেকে ২০ দিন পর গিয়ে সরকার কেনাকাটা পুরোদমে শুরু করে। এই সময়ের মধ্যেই লাখ লাখ কৃষক বাজারে ধানের দাম হারায় এবং উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আবার এই দাম যখন বাড়তে শুরু করে তখন বেশির ভাগ ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে আর বিক্রির উপযোগী ধান থাকে না। কারণ সাধারণ কৃষক দ্রুত ধান বিক্রি করে দেন। তবে এ পরিস্থিতি বছরের পর বছর চললেও সরকারের সেভাবে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বারবারই কৃষক দেশকে ভালো ফলন দিলেও নিজেরা মূল্য পান না। এ কারণে ইতোমধ্যে রেকর্ড সংখ্যক কৃষক ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং ক্যাশ ক্রপ হিসেবে পরিচিত ভুট্টা ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। অথচ এই কৃষকরাই দিনের পর দিন দেশে ভালো উৎপাদন দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখেন।</p> <p>কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে বলেন, সরকারি কেনাকাটায় যে মূল্য নির্ধারণ করা হয় সেটা যদি শস্য কাটার আগে করা হয় তবে কৃষক বাজারে যাওয়ার আগেই একটি দামের ধারণা পাবেন। ফলে ক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ তৈরি হবে। দামও ভালো পাবেন। এ জন্য এই দামটা মৌসুমের একদম শুরুর দিকে ঘোষণা করা উচিত। নিয়মটা দ্রুতই পরিবর্তন না করলে কৃষক উপকৃত হওয়ার বদলে বঞ্চিত হতে থাকবেন।</p> <p>তিনি বলেন, একদিকে আমাদের সক্ষমতার ঘাটতির কারণে ধান কেনা হয় কম; চাল কেনা হয় বেশি। যদিও ধান কেনার পরিমাণ বাড়ানো উচিত এবং এটাকে এমনভাবে সহজ করতে হবে যাতে সাধারণ কৃষক সরকারের কাছে জটিলতা ছাড়াই ধান বিক্রি করতে পারেন।</p> <p>খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতার সঙ্গে ধান-চাল সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে কৃষক তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান পুরোপুরি শুরু হলে চাষিদের আর কম দামে ধান বিক্রি করতে হবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হলে কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে পারবেন।</p>