kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস আজ

উদ্ধত দাঁড়িয়ে সেই 'রক্তগৌরব'

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

২৮ মার্চ, ২০২০ ১১:০২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উদ্ধত দাঁড়িয়ে সেই 'রক্তগৌরব'

আজ ঐতিহাসিক ২৮ মার্চ রংপুরবাসীর কাছে অবিস্মরণীয় দিন। ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর  মাত্র একদিন পরই রংপুরবাসী ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, সে পথ ধরেই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম।

স্বাধীনতাপ্রিয় রংপুরবাসী ৭১'র এই দিনে লাঠিসোঁটা, তীর-ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে। জন্ম দেয় এক অনন্য ইতিহাস।

একাত্তরের ৩ মার্চ। মিছিল আর শ্লোগনে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে গোটা রংপুর। মানুষের মিছিলে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। শহীদ হন কিশোর শংকু এবং আরো তিনজন। রংপুর অঞ্চলে তাঁরাই স্বাধীনতার প্রথম শহীদ। তাঁদের রক্তদানের মধ্য দিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর। স্বাধীনতাকামী মানুষ সংগঠিত হতে থাকে। প্রস্তুতি গ্রহণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের। এরই অংশ হিসেবে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হয়। দিনক্ষণ ঠিক হয় ২৮ মার্চ।

ঘেরাও অভিযানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রংপুরের বিভিন্ন হাটে-বাজারে ঢোল পেটানো হয়। অভূতপূর্ব সাড়া  মেলে। সাজ সাজ রব পড়ে যায় চারদিকে। যার যা আছে তাই নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের প্রস্তুতি চলে। এ অঞ্চলের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ছাত্র, কৃষক, দিনমজুরসহ সংগ্রামী মানুষ যোগ দেয় তাতে। রংপুরের আদিবাসীরাও তীর-ধনুক নিয়ে প্রস্তুতি নেয়। এক্ষেত্রে মিঠাপুকুর উপজেলার ওরাঁও সম্প্রদায়ের তীরন্দাজ সাঁওতালদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তীর-ধনুক, বল্লম, দা, বর্শা নিয়ে তারা যোগ দেয় ঘেরাও অভিযানে।

২৮ মার্চ ৭১ রবিবার। সকাল থেকে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সংগঠিত হতে থাকে। সময় যত এগিয়ে আসে উত্তাপ আর উত্তেজনা বাড়তে থাকে তত। সকাল ১১টা বাজতে না বাজতেই রব ওঠে। জেলার মিঠাপুকুর, বলদীপুকুর, মানজাই, রানীপুকুর, তামপাট, পালিচড়া, বুড়িরহাট, গঙ্গাচড়া, শ্যামপুর, দমদমা, লালবাগ, গনেশপুর, দামোদরপুর, পাগলাপীর, সাহেবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হতে থাকে। সবার হাতে দেশি অস্ত্র।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ওই সময় রংপুর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ২৯ ক্যাভেলরি রেজিমেন্টের মেজর নাসির উদ্দিন তার 'যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা' গ্রন্থে সে দিনের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, যে দৃশ্য আমি দেখলাম তা চমকে যাবার মতোই।

দক্ষিণ দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে সেনা ছাউনির দিকে। সারি বাঁধা মানুষ পিঁপড়ের মতো ক্রমেই এগিয়ে আসছে ক্যান্টনমেন্টের দিকে। এ সময় ক্যান্টনমেন্ট থেকে গোটা দশেক জিপ বেরিয়ে আসে। মিছিল লক্ষ্য করে শুরু হয় টানা মেশিনগানের গুলিবর্ষণ। মাত্র পাঁচ  মিনিটে চারিদিক নিস্তব্ধ। হাজার হাজার লাশ পড়ে থাকে মাঠে। মাঠের ভেতর ছড়িয়ে থাকা গুলিবিদ্ধ মানুষগুলোকে টেনে হিঁচড়ে এক জায়গায় জড়ো করা হয়। লক্ষ্য পুড়িয়ে ফেলা। তখনো যারা বেঁচে ছিল তাদের গোঙ্গানিতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল পাঞ্জাবি জান্তারা। এ অবস্থাকে আয়ত্বে আনতে  বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে চিরতরে তাদের থামিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল তারা।

মেজর নাসির উদ্দিনের বর্ণনায় আরো এসেছে 'সেদিন সন্ধ্যার আগেই নির্দেশমতো পাঁচ থেকে ৬০০ মৃতদেহ পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। এ আগুন অন্য যে  কোনো আগুনের চেয়ে অনেক বেশি লাল। অনেক বেশি দহন করে এই বহিঃশিখা। আমি খুব কাছ থেকেই আগুন দেখছি, কেমন করে জ্বলছে স্বাধীনতাপ্রিয় মানব সন্তান।

রংপুর মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সদরুল আলম দুলুর সেদিনের স্মৃতিচারণ করেন। বলেন, মূলত রংপুরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ৩ মার্চ। ওইদিন বঙ্গবন্ধু সারা দেশে হরতাল ডাকেন। হরতাল সফল করতে দল-মত নির্বিশেষে সবাই শহরের জিরো পয়েন্ট কাচারিবাজারে জমায়েত হন। তখনো অল্পসংখ্যক মানুষ। কিন্তু মিছিলটি বের হওয়ার পরই ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় বিশাল মিছিলে। সেই মিছিলে ছিলেন রফিকুল ইসলাম গোলাপ, মমতাজ জাকির আহমেদ সাবু, সিদ্দিক হোসেন, শেখ আমজাদ হোসেন, ইছাহাক চৌধুরী, হারেস উদ্দিন সরকার, নুরুল হক, মুকুল মোস্তাফিজ, অলক সরকার, ইলিয়াস আহমেদ, আবুল মনসুর আহমেদ, খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল, তৈয়বুর রহমান বাবু, মুসলিম উদ্দিন কমিশনার, মাহবুবুল বারী, জায়েদুল আলম, মোফাজ্জল হোসেনসহ হাজারো বীর জনতা।

মিছিলটি তৎকালীন তেঁতুলতলায় (বর্তমান শাপলা চত্বর) পৌঁছলে সেখানে শহীদ মুখতার ইলাহী, শহীদ রনী রহমান ও জিয়াউল হক সেবুর নেতৃত্বে কারমাইকেল কলেজ থেকে আরেকটি মিছিল যোগ দেয়।  সেদিনের ওই মিছিল রংপুর রেলস্টেশন হয়ে ফিরে আসার পথে বর্তমান ঘোড়াপীর মাজারের সামনের তৎকালীন অবাঙালি সরফরাজ খানের বাসার ওপর উর্দুতে লেখা একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ে মিছিলকারীদের।

তাৎক্ষণিক ওই সাইনবোর্ড নামাতে এগিয়ে যান মিছিলকারী সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শংকু সমাজদার, মকবুল হোসেন, শফিকুলসহ অনেকেই। আর ঠিক তখনই ওই বাসা থেকে চালানো হয় গুলি। গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন শংকু ও তৎকালীন কারমাইকেল কলেজের ছাত্রলীগ কর্মী শফিকুল।

সহযোদ্ধারা আহত শংকু ও শফিকুলকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু পথেই ১২ বছরের বিপ্লবী কিশোর শংকু মৃত্যুবরণ করেন। সেদিনই রংপুরের প্রথম শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জিত হয় ছোট্ট ছেলে শংকুর। আর দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসাধীন থেকে মারা যান শফিকুল।

সদরুল আলম দুলু বলেন, শংকুর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে এক ভয়াল শহরে রূপ নেয় রংপুর। উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে শহরে। বাঙালির ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে থাকে অবাঙালিদের বাড়িঘর, দোকান ও প্রতিষ্ঠান। সেদিনের সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই রংপুরে সূচনা হয় মুক্তিযুদ্ধের।

এরপর আসে ভয়াল ২৫ মার্চ। ওইদিন দুপুরের পরপরই শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অপহরণ করা হয় শান্তি চাকী, খুররম, মহররম, জররেজ, দুলাল, গোপাল চন্দ্র, উত্তম কুমার অধিকারী, সতীশ হাওলাদার, দুর্গা দাসসহ ১১ জনকে। এরপর ৩ এপ্রিল দখিগঞ্জ শশ্মানে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।

২৮ মার্চ রংপুরের মানুষ জেগে ওঠে নবচেতনায়। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চল হতে লাঠিসোটা, তীর ধনুক, বল্ল¬ম নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঁশের লাঠি আর তীর-ধনুক নিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এমনি এক ঘটনাই সেদিন ঘটিয়েছিলেন রংপুরের বীর জনতা।

স্বাধীনতাকামী রংপুরের মানুষ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের মধ্যদিয়ে শুরু করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৮ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ তথা পাক হানাদার বাহিনীর সাথে এটাই তাদের মুখোমুখি প্রথম যুদ্ধ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেদিনের সেই ত্যাগের স্বীকৃতি জাতীয়ভাবে আজো মেলেনি। তবে যেখানে আত্মত্যাগী মানুষগুলো শেষবারের মতো একত্রিত হয়েছিল,  সেই ঐতিহাসিক নিসবেতগঞ্জ এলাকায় ২০০৩ সালে নির্মিত হয় 'রক্ত গৌরব' নামের স্মৃতিস্তম্ভ। আজো উদ্ধত দাঁড়িয়ে আছে তা। প্রতিবছর এই দিনে স্থানীয়দের উদ্যোগে নানা আয়োজন হয়, পালিত হয় দিবসটি। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা