<p>নীতিগত সহায়তার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পোশাকখাত বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। জরুরি সংস্কার ও কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান চাপে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।</p> <p>তারা বলছে, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) খাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুযোগের পরিমাণ বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বাজারগুলোর নতুন আইন অনুযায়ী পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং পরিবেশবান্ধব সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হবে।</p> <p>সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে সার্কুলার রূপান্তর ত্বরান্বিত করা: সুইচটুসিই পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।</p> <p>বিজিএমইএর পরিচালক ও কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ বলেন, বৈশ্বিক আইন ও নীতিগত পরিবর্তন পোশাক শিল্পকে এখন অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ও টেকসই উৎপাদনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।</p> <p>পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রিন ডিল এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্টের (ডিপিপি) মতো উদ্যোগের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চক্রাকার পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে প্রস্তুতকারকদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বাড়াতে, নতুন কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে পদক্ষেপ নিতে হবে।</p> <p>মোস্তাফিজ জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখ টন টেক্সটাইল বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে পুনঃব্যবহার বা প্রক্রিয়াজাত করা হলেও এখনো তা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আসেনি। তবে এই খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলে একদিকে অগ্নিকাণ্ডের মতো স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে আরও সংগঠিত ও নিরাপদ শিল্পভিত্তি গড়ে উঠবে।</p> <p>তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে ১০০ শতাংশ তুলাভিত্তিক বর্জ্য যান্ত্রিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হলেও রাসায়নিক পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা এখনো সীমিত। বিশেষ করে মিশ্র কাপড় ও মানবসৃষ্ট তন্তু (এমএমএফ) পুনর্ব্যবহারে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কাঁচামালের চাহিদা বাড়বে এবং সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়বে। ফলে তুলাসহ প্রাকৃতিক বস্তুর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিকল্পের দিকে যেতে হবে। ২০২২-২৩ সাল থেকে চক্রাকার অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ নীতি ও আইনি কাঠামোর অভাবে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।</p> <p>এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি বিদিয়া আম্মৃত খান বলেন, তৈরি পোশাক খাতের পুরো বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা গেলে প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারের সার্কুলার অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশ তুলাভিত্তিক পোশাক কারখানার বর্জ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করতে সক্ষম। তবে এই বর্জ্যের বড় অংশ ভারত ও পাকিস্তানে রপ্তানি হয়ে পরে পুনর্ব্যবহৃত সুতা হিসেবে দেশে ফিরে আসে।</p> <p>তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৭টি কারখানায় পরীক্ষামূলক এই প্রকল্প চালু রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার।</p> <p>অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, এলডিসি উত্তরণের পথে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।</p> <p>তিনি জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্কভাবে আলোচনা করছে। তবে এলডিসি উত্তরণ যেকোনো সময়েই হোক না কেন, বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, চক্রাকার অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।</p> <p>মিলার বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রবৃদ্ধি কৌশলের কেন্দ্রেই রয়েছে চক্রাকার অর্থনীতি, যার লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন। ইউরোপে প্রতিবছর ৫০ লাখ টনের বেশি টেক্সটাইল বর্জ্য তৈরি হয়, যেখানে বাংলাদেশে এ পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ টন। সামাজিক পরিস্থিতি, ফাস্ট ফ্যাশন এবং বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন নীতি গ্রহণ করেছে।</p> <p>২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন টেকসই ও চক্রাকার টেক্সটাইল নীতি চালু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে পরিবেশবান্ধব নকশা, উৎপাদকদের দায়বদ্ধতা, ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট এবং বিভ্রান্তিকর পরিবেশবান্ধব প্রচারণা ঠেকাতে কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।</p> <p>মিলার বলেন, ইউরোপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং তৈরি পোশাক খাত দেশের জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ অবদান রাখে ও প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।</p> <p>তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘সুইচ টু সার্কুলার ইকোনমি’ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের রূপান্তরে সহায়তা দিচ্ছে। এই প্রকল্পে এইচঅ্যান্ডএম ও বেস্টসেলারের মতো ব্র্যান্ড পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য ট্রেসেবিলিটি নিয়ে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ইউনিডো ও চ্যাথাম হাউস নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে।</p> <p>এ ছাড়া ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে চক্রাকার বিনিয়োগে সহায়তার জন্য ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে ৬ কোটি ইউরোর ঋণচুক্তি করেছে বলেও জানান তিনি। <em>সূত্র : দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস</em></p>