kalerkantho


পিসিতেই খেলুন কনসোলের গেইম

কিছু কিছু গেইম আছে, যা শুধু কনসোলের জন্যই বানানো হয়। শুধু বিশেষ একটি গেইম খেলার জন্য কি আর আস্ত একটা কনসোল কেনা সম্ভব? আর কিনলেও আলাদা আলাদা প্ল্যাটফর্মের কয়টা কনসোলই বা কিনতে পারবেন আপনি? তবে পিসি আর স্মার্টফোনে কনসোল গেইম খেলার সুবিধা দিতে পারে ইমুলেটর। বিস্তারিত এস এম তাহমিদ

২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পিসিতেই খেলুন কনসোলের গেইম

পিসিতে ‘শ্যাডো অব রোম’ খেলছেন সাকিব। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই গেইমটা শুধু ‘প্লেস্টেশন ২’-এর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

ইমুলেটর কী

 

এটি এমন এক সফটওয়্যার, যা পিসি বা মোবাইলের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে কনসোলের হার্ডওয়্যারকে ভার্চুয়ালভাবে তৈরি করে। বেশির ভাগ ইমুলেটর একদম সর্বাধুনিক নয়, বরং পুরনো কনসোলগুলোকেই ভার্চুয়ালভাবে তৈরি করার জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে। যেহেতু সেসব হার্ডওয়্যারের সঙ্গে পিসি বা ফোনের হার্ডওয়্যারে কোনো মিল নেই, তাই ইমুলেটরকে খাটতে হয় প্রচুর। সে জন্য প্রয়োজন হয় শক্তিশালী সিস্টেমের। তাই বলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। বেশির ভাগ পুরনো কনসোলের হার্ডওয়্যার এতটাই দুর্বল ছিল, এখনকার প্রায় সব পিসি বা ফোনই সেগুলো সহজে চালাতে পারবে। ইমুলেটর ব্যবহারে সহজেই হারানো দিনের প্রচুর গেইম খেলা যাবে কোনো ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই।

কনসোল গেইমিংয়ের শুরু মূলত আশির দশকে। এ পর্যন্ত বাজারে আসা কনসোলের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিছু জনপ্রিয় কনসোল, তার জনপ্রিয় গেইম, ইমুলেটর আর প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার তুলে ধরা হলো।

 

নিনটেন্ডো এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম

প্রতিটি গেইমারের চিরচেনা সুপার মারিওর জনপ্রিয়তার শুরু এখানেই। সর্বপ্রথম কনসোলটি বাজারে ছাড়া হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। সে সময়ের প্রযুক্তিগত বাধার কারণে গ্রাফিকস, মাল্টিপ্লেয়ারের বদলে গেইম নির্মাতাদের নজর দিতে হয়েছে মজার গেইম প্লে আর কাহিনির দিকে। এনইএস সহজেই পিসি, অ্যানড্রয়েড, জেইলব্রেক করা আইফোন বা আইপ্যাডে ইমুলেট করা সম্ভব। ইমুলেট করে খেলা যেতে পারে ‘সুপার মারিও ব্রোস’, ‘কনট্রা’, ‘দ্য লেজেন্ড অব জেলডা’, ‘মেগা ম্যান’, ‘ক্যাসলভেনিয়া’র মতো জনপ্রিয় সব গেইম। গেইম খেলার জন্য প্রায় সব ডিভাইসের জন্যই আছে রেট্রো আর্চ ইমুলেটর, তবে অন্যান্য এনইএস ইমুলেটরেও বেশ কাজের। এসবের জন্য পিসির তেমন শক্তিশালী হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন নেই।

 

সেগা মেগাড্রাইভ

একসময় দেশে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সেগা মেগাড্রাইভ। টিভির সঙ্গে সংযোগ দিয়ে মেগাড্রাইভে গেইম খেলার দিনগুলো আবারও ফিরিয়ে আনা খুবই সহজ। এনইএসের মতো টু-ডি গ্রাফিকসনির্ভর এই কনসোলটি বাজারে এসেছিল ১৯৮৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য এটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জেনেসিস’। ‘সনিক দ্য হেজহগ’, ‘কনট্রা হার্ড অপস’, ‘আলাদিন’, ‘অ্যানিম্যানিয়াকসে’র মতো জনপ্রিয় সব গেইম এই কনসোলের জন্য প্রকাশিত হয়েছিল। মেগাড্রাইভ ইমুলেট বা চালানোর জন্য প্রচুর প্রগ্রাম রয়েছে—রেট্রো আর্চ, জেন, জেনিসিসের মতো সব ইমুলেটরের মাধ্যমে পিসি, অ্যানড্রয়েড বা এক্সবক্সেও মেগাড্রাইভ গেইমগুলো খেলা যাবে।

 

নিও জিও ও মেইম

জয়স্টিক-সংবলিত বড় বড় আর্কেড মেশিনে ‘ভিডিও গেইম’ খেলেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এসব মেশিন বিশ্ব চেনে ‘আর্কেড’ নামে আর এসবের মধ্যে আছে ‘নিও জিও’ আর ‘এমএএমই’ বা ‘মেইম’ নামের দুটি কনসোল। ‘মেটাল স্লাগ’, ‘কিং অফ ফাইটারস’, ‘সেগা ভার্সেস ক্যাপকম’, ‘মর্টাল কমব্যাট’ থেকে শুরু করে অনেক প্রিয় গেইম আছে এ দুটি কনসোলে। দেশে ‘মোস্তফা’ নামে পরিচিত গেইম ‘ক্যাডিল্যাকস অ্যান্ড ডাইনোসরস’ও এই ইমুলেটরে খেলা যাবে। রেট্রো আর্চ, নিওরেজ আর মেইমের মাধ্যমে পিসি, অ্যানড্রয়েড আর জেইলব্রেক করা আইফোনে গেইমগুলো খেলা যাবে।

 

নিনটেন্ডো গেইম বয়/কালার/অ্যাডভান্স

বহনযোগ্য গেইমিং কনসোলের মধ্যে নিনটেন্ডোর গেইমবয় সিরিজ অন্যতম। বিশেষ করে পকেমন গেইমগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল গেইমবয় সিরিজের কারণেই। প্রথম কনসোলটি বাজারে এসেছিল ১৯৮৯ সালে। এ ছাড়া বেশ কিছু জনপ্রিয় গেইমের পকেট সংস্করণও গেইমবয়তে চরম জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এর মধ্যে আছে ‘সুপার মারিও অ্যাডভান্স ৪’, ‘দ্য লেজেন্ড অব জেলডা দ্য মিনিশ ক্যাপ’, ‘মেট্রয়েড ফিউশন’। তবে আজও গেইমবয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গেইম পকেমন। পিসি, অ্যানড্রয়েড থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ডিভাইসের জন্যই আছে গেইমবয় ইমুলেটর। 

 

সনি প্লেস্টেশন ১ (পিএসএক্স)

প্রথম জনপ্রিয় থ্রিডি গ্রাফিকস-সমৃদ্ধ কনসোল এটি। প্রথম বাজারে আসে ১৯৯১ সালে। বেশ কিছু জনপ্রিয় গেইমিং সিরিজের সূত্রপাত হয়েছিল এই পিএসএক্সের থেকেই। এর মধ্যে আছে ‘গ্র্যান টুরিজমো’, ‘সাইলেন্ট হিল’, ‘রেসিডেন্ট ইভিল’, ‘ফাইনাল ফ্যান্টাসি’র বড়সড় গেইমগুলো। গেইমগুলো পাওয়া যেত সিডি রমে, থ্রিডি গ্রাফিকস সুন্দর সাউন্ড সে সময় সবার মন কেড়ে নিয়েছিল। এটিও ইমুলেট করতে তেমন বেগ পেতে হবে না। বেশির ভাগ পিসি বা অ্যানড্রয়েডে বা জেইলব্রেক করা আইফোনে পিএসএক্স ইমুলেট করা যাবে। প্রায় প্রতিটি ডিভাইসের জন্যই ব্যবহার করা যেতে পারে পিসিএসএক্স ইমুলেটর।

 

নিনটেন্ডো উই এবং গেইমকিউব

মোশন কন্ট্রোলের দিকে নজর রেখে বাজারে এসেছিল ‘নিনটেন্ডো উই’। তার আগে বাজারে এসেছে গেইমকিউব, তবে সেটি আর উইয়ের মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। হার্ডওয়্যারগত দিক থেকে দুটি কনসোল খুব কাছাকাছি হওয়ায় একটি ইমুলেটর দিয়েই দুটি কনসোলের গেইম খেলা যাবে। উই আর গেইমকিউবের উল্লেখযোগ্য ‘গেইম রেসিডেন্ট ইভিল ৪’, ‘লেজেন্ড অফ জেলডা দ্য উইন্ড ওয়েকার’, ‘সুপার মারিও গ্যালাক্সি’। কনসোলগুলো ইমুলেট করা যাবে ডলফিন ইমুলেটরের মাধ্যমে। এর জন্য প্রয়োজন হবে অন্তত কোর আই৩ প্রসেসর, ৪ গিগাবাইট র‌্যাম আর ভালো মানের ১ গিগাবাইট গ্রাফিকস কার্ড। গত দুই বছরে বাজারে আসা সব ফ্ল্যাগশিপ অ্যানড্রয়েড ফোনেও ডলফিনের মাধ্যমে গেইমগুলো খেলা যাবে।

 

নিনটেন্ডো ডিএস

গেইমবয়ের পর বহনযোগ্য কনসোল যুদ্ধে আবারও নিনটেন্ডো জিতেছিল ‘ডিএস’-এর মাধ্যমে। মূলত পকেমন গেইমগুলো একের পর এক ডিএসের জন্য প্রকাশিত হওয়ায় সনির প্লেস্টেশন পোর্টেবল বা ভিটাকে একেবারে বাজার ধরতে দেয়নি নিনটেন্ডো। কনসোলটি প্রথম বাজারে এসেছে ২০০৪ সালে। দুটি স্ক্রিন, যার একটি টাচস্ক্রিনসমৃদ্ধ কনসোল বাজারে আর একটিও নেই। ডিএস গেইম খেলতে চাইলে পিসিতে আছে ডেসুমি ইমুলেটর, অ্যানড্রয়েডের জন্য আছে ড্রাস্টিক। তবে ডিএসের পরবর্তী সংস্করণ থ্রিডিএস অবশ্য এখনো ইমুলেট করা যায় না।

 

সনি প্লেস্টেশন২

হাই ডেফিনিশন গেইম বাজারে আসার আগ পর্যন্ত তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ‘সনি প্লেস্টেশন২’ বা ‘পিএস২’। প্রথম বাজারে এসেছিল ২০০০ সালে। বেশ কিছু দুনিয়া কাঁপানো গেইম। যেমন—‘জিটিএ ভাইস সিটি’, ‘ফাইনাল ফ্যান্টাসি ১০’, ‘রেসিডেন্ট ইভিল ৪’, ‘গড অফ ওয়ার’, ‘মেটাল গিয়ার সলিড২’ সবই প্রকাশিত হয়েছিল পিএস২ কনসোলের জন্য। ‘নিড ফর স্পিড আন্ডারগ্রাউন্ড’ সিরিজ থেকে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ও প্লেস্টেশন২-তে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এটি ইমুলেট করা যাবে মূলত পিসিতে, প্রয়োজন হবে অন্তত ডুয়ালকোর প্রসেসর, ১ গিগাবাইট গ্রাফিকস আর ৪ গিগাবাইট র‌্যাম। তবে এসব গেইম স্মার্টফোনে খেলা যাবে না। কেননা ফোনের হার্ডওয়্যার এসব গেইম খেলার মতো এখনো এত শক্তিশালী হয়নি।

 

নিনটিন্ডো উইইউ

নিনটেন্ডোর এই কনসোলটি তেমন জনপ্রিয়তা কখনোই পায়নি। শুধু ‘লেজেন্ড অফ জেলডা’ সিরিজের তিনটি গেইম, ‘টোয়াইলাইট প্রিন্সেস’, ‘স্কাইওয়ার্ড সোর্ড’ আর সর্বশেষ ‘ব্রেথ অব দি ওয়াইল্ড’-এর জন্যই এই কনসোলটি কিছুটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু এই তিনটি গেইম যাঁরা খেলতে চান তাঁদের জন্য উইইউ ইমুলেটর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিএমই ইমুলেটরের মাধ্যমে পিসিতে উইইউ ইমুলেট করা যাবে, কিন্তু প্রয়োজন হবে খুবই শক্তিশালী পিসির, অন্তত কোয়াডকোর কোরআই ৫ বা সমমানের প্রসেসর, এনভিডিয়া বা এএমডি ২ গিগাবাইট বা আরো শক্তিশালী জিপিউ, আর ৮ গিগাবাইট র‌্যাম লাগবেই।

 

সনি প্লেস্টেশন পোর্টেবল

প্রথম সম্পূর্ণ থ্রিডি গ্রাফিকসের গেইম বহনযোগ্য কনসোলে প্রথম এনেছিল সনি প্লেস্টেশন পোর্টেবল। ২০০৪ সালে কনসোলটি বাজারে আসে। তবে সেটা শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ ছিল। গেইমগুলো পাওয়া যেত ক্ষুদ্রাকৃতির ডিভিডিতে, যার নাম ছিল ‘ইউএমডি’। তুমুল জনপ্রিয় সব গেইম। যেমন—‘জিটিএ’, ‘গড অফ ওয়ার’, ‘টেকেন’, ‘কিংডম হার্টস’, ‘অ্যাসাসিন্স ক্রিড’, ‘নিড ফর স্পিড’। শুধু তাই নয়, মেটাল গিয়ার সলিডেরও বড়সড় সব গেইমও এই কনসোলের জন্য প্রকাশিত হয়েছিল। এই কনসোল ইমুলেট করার জন্য আছে ‘পিপিএসএসপিপি ইমুলেটর’। ব্যবহার করা যাবে পিসি ও অ্যানড্রয়েডে। তবে সমস্যা একটিই, অ্যানড্রয়েডে শক্তিশালী প্রসেসরের প্রয়োজন। পিসিতে অন্তত ডুয়ালকোর প্রসেসর, ২ গিগাবাইট র‌্যাম আর ১ গিগাবাইট গ্রাফিকস লাগবে। 

 

আছে আরো কিছু কনসোল

এই তালিকায় হালের জনপ্রিয় কিছু কনসোল নেই। এর মধ্যে আছে মাইক্রোসফট এক্সবক্স সিরিজ, সনি প্লেস্টেশন ৩ ও ৪ এবং নিনটেন্ডো সুইচ। এক্সবক্স নিয়ে কাজ করা খুবই কঠিন। কারণ মাইক্রোসফটের পুরো সিস্টেমের কোড কোথাও নেই। প্রয়োজনীয় কোড না থাকায় এক্সবক্স নিয়ে ইমুলেটর তৈরির কাজ এগোচ্ছে খুবই ধীরে। সনি প্লেস্টেশন ৩-এর প্রসেসর প্রযুক্তি এতটাই আলাদা যে তার ইমুলেটর তৈরির কাজ পিছিয়ে ছিল অনেক দিন। তবে আরপিসিএস৩ ব্যবহার করে প্রায় ৩৩ শতাংশ পিএস৩ গেইমই পিসিতে খেলা যাবে। প্লেস্টেশন ৪ ইমুলেটর তৈরির কাজ এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। একই অবস্থা নিনটেন্ডো সুইচের ক্ষেত্রেও। অতএব না জেনে-শুনে ইমুলেটর ডাউনলোড করলে ম্যালওয়্যার হামলার শিকার হওয়া অসম্ভব নয়।

 

নজরে রাখতে হবে

সঠিক হার্ডওয়্যার আর ইমুলেটর জোগাড়ের পর প্রয়োজন গেইম আর সঠিক কন্ট্রোলার। যদিও পিসিতে কি-বোর্ড মাউস আর ফোনে টাচস্ক্রিনেই গেইম খেলা সম্ভব, এর পরও একটি ভালো কন্ট্রোলার থাকলে খেলার আনন্দ অনেক গুণ বেড়ে যাবে। গেইম ডাউনলোড করার জন্য বেশ কিছু জনপ্রিয় সাইট রয়েছে। যেমন—এমুপ্যারাডাইস, রমসম্যানিয়া, পোর্টাল রমস এবং লাভরমস।



মন্তব্য